logo

মধ্যরাত থেকে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা/‘ধার করে জাল বানিয়েছি, এখন মাছ ধরাই বন্ধ’

মনজু শেখ
রাজবাড়ী
‘ধার করে জাল বানিয়েছি, এখন মাছ ধরাই বন্ধ’
রাজবাড়ীর পদ্মার ঘাটে বাঁধা সারি সারি মাছ ধরার নৌকা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আজ মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে রাজবাড়ীর নদ-নদী ও মোহনায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ বন্ধ থাকবে।

মা ইলিশ সংরক্ষণে প্রতিবছরই এ উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে নিষেধাজ্ঞার আগে থেকেই পদ্মায় মাছের সংকট, ঋণের বোঝা এবং পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় রাজবাড়ীর পদ্মাপাড়ের জেলেদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ। তাদের অনেকেই মাছ ধরার আশায় দাদন ও বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে জাল-নৌকা প্রস্তুত করেছেন। এখন মাছ ধরার মৌসুমেই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় কীভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন, কীভাবে সংসার চালাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

সরেজমিনে পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অনেক জেলে মাছ ধরার জন্য আগেই আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়েছেন। কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে ধার করে জাল তৈরি ও নৌকা প্রস্তুত করেছেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল নদীতে মাছ ধরে সেই টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নদীতে মাছের সংকটের মধ্যে হঠাৎ ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা তাদের সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।

জৌকুড়া এলাকার জেলে নিজাই মন্ডল বলেন, ২০ হাজার টাকা ধার নিয়ে জাল বানিয়েছি। মাছ ধরে সেই টাকা পরিশোধ করার চিন্তা করেছি। কিন্তু এখন মাছও নেই, আবার ২২ দিনের জন্য নদীতে নামাও বন্ধ। এই সময়ে সংসার চালাব কীভাবে, আর ধার করা টাকা কীভাবে পরিশোধ করববুঝতে পারছি না।

আরেক জেলে পিয়ারুল বলেন, আমরা চারজন মিলে টাকা দিয়ে জাল বানিয়েছি মাছ ধরার জন্য। সবারই আশা ছিল মাছ ধরে সংসার চালাব এবং ধার-দেনা পরিশোধ করব। এখন নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে আমাদের আয় বন্ধ হয়ে যাবে।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ইলিশ মৌসুমকে কেন্দ্র করে নতুন করে অনেকেই জেলে পেশায় যুক্ত হয়েছেন। মাছ ধরাকে আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়ে কেউ ঋণ করে জাল কিনেছেন, কেউ নৌকা প্রস্তুত করেছেন। তাদের অনেকেরই নদীতে নামার আগেই ঋণের কিস্তি বা ধার করা টাকা পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের সেই আয়ের পথও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

রাজবাড়ীর পদ্মাপাড়ের জেলেদের জীবন নদীকেন্দ্রিক। সাধারণত একটি নৌকার মালিক থাকেন একজন। তার সঙ্গে মাছ ধরার কাজে থাকেন আরও চার থেকে পাঁচজন সহযোগী জেলে। প্রত্যেক সহযোগী জেলের রয়েছে আলাদা পরিবার।

ফলে একটি নৌকা নদীতে মাছ ধরতে না পারলে শুধু নৌকার মালিকের আয়ই বন্ধ হয় না; একই সঙ্গে ওই নৌকার সঙ্গে যুক্ত চার-পাঁচজন জেলে এবং তাদের পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ একটি নৌকার ওপর নির্ভর করে থাকা একাধিক পরিবারের সংসারেই নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়ে।

ধাওয়াপাড়া ফেরিঘাটের জেলে ফরিদ শেখ, মোরশেদ, মোজাহার ও সঞ্জয় হলদারসহ কয়েকজন বলেন, প্রায় দুই মাস ধরে পদ্মা নদীতে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই ধার-দেনা করে দিন পার করছেন। কেউ জাল তৈরি করেছেন, কেউ সংসারের খরচ চালাতে পারছেন না। তাদের দাবি, সরকার থেকে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হলেও এত কম সহায়তায় একটি পরিবারের পুরো মাস চলা সম্ভব নয়। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক জেলে আর্থিক সংকটে পড়ে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামতে বাধ্য হতে পারেন।

ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে শুধু পদ্মা নদীতে ইলিশ ধরা নয়, রাজবাড়ীর নদ-নদী ও মোহনায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ বন্ধ থাকবে। ফলে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন জেলেরা বিকল্প কোনো মাছ ধরেও আয় করতে পারবেন না।

জেলেদের ভাষ্য, বছরের এই সময়টিতে মাছ ধরাই তাদের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু ইলিশের পাশাপাশি সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকায় তাদের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এর মধ্যে যেসব জেলে ঋণ করে জাল ও নৌকা প্রস্তুত করেছেন, তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৪ জন।

কিন্তু এবারের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ এসেছে ৫ হাজার ৫৯২ জন জেলের জন্য। ফলে কার্ডধারী হয়েও ৭১২ জন জেলে সরকারি খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ অবস্থায় জেলেদের প্রশ্ন যাদের মাছ ধরার ওপর পুরো সংসার নির্ভরশীল, তাদের একটি অংশ যদি সরকারি সহায়তার বাইরে থাকে, তাহলে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন তারা কীভাবে সংসার চালাবেন?

জৌকুড়া এলাকার জেলে রশিদ বলেন, সারা বছর মাছ ধরে সংসার চালাই। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইনি। আমার কোনো জেলে কার্ডও নেই। অভিযান চলাকালে কীভাবে সংসার চালাব, সেটাই বুঝতে পারছি না। বাধ্য হয়ে হয়তো ঝুঁকি নিয়ে নদীতে নামতে হবে।

এবারের ইলিশ মৌসুমে নতুন করে অনেকেই জেলে পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাদের কেউ ঋণ নিয়ে জাল বানিয়েছেন, কেউ নৌকা প্রস্তুত করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল ইলিশের মৌসুমে মাছ ধরে আয় করা এবং সেই আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা।

কিন্তু নদীতে মাছের সংকট এবং তার পরপরই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় নতুন এসব জেলেও বিপাকে পড়েছেন। তাদের অনেকেরই এখন মাছ ধরার আগেই ঋণের চাপ তৈরি হয়েছে।

মৎস্য বিভাগের বক্তব্য

রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, মা ইলিশের প্রজননের জন্য এই ২২ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া গেলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। নিষেধাজ্ঞা সফল করতে জেলে ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলে পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলেরা যাতে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন, সে জন্য মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের সচেতন করা হচ্ছে।

জেলেদের কার্ড না পাওয়া এবং অমৎস্যজীবীদের কার্ড পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, প্রতি বছর জেলে কার্ড হালনাগাদ করা হচ্ছে। অতীতে নিবন্ধিত কোনো জেলে মারা গেলে, পেশা পরিবর্তন করলে বা কোনো কারণে অমৎস্যজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন কোনো জেলে নিবন্ধন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় যোগাযোগ করতে হবে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত জেলে হলে তাকে কার্ড দেওয়া হবে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময় মা ইলিশ সংরক্ষণে নদ-নদী ও মোহনায় নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চালানো হবে।