logo

ইতালির স্বপ্নে লিবিয়ায় নিখোঁজ সাইদুল, দালালের খপ্পরে নিঃস্ব পরিবার

রাকিব হাসান
মাদারীপুর
ইতালির স্বপ্নে লিবিয়ায় নিখোঁজ সাইদুল, দালালের খপ্পরে নিঃস্ব পরিবার
ছেলে সাইদুলের অপেক্ষায় মা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ছেলে কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি না- এই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে সূর্যবান বেগমের। দুই মাস আগে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়া তার ছেলে সাইদুল বেপারী (৩২) এখন লিবিয়ায় নিখোঁজ।

মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার এই পরিবারের দিন কাটছে উৎকণ্ঠায়। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।

এ ঘটনায় সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে দালাল আনোয়ার ফরাজীসহ সাতজনকে আসামি করে মাদারীপুরে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন।

সাইদুলের মা সূর্যবান বেগম জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পরিবারের জমিজমা বিক্রি করেছে, ধারসহ সুদের ওপর টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়া হলেও ছেলের কোনো সন্ধান মিলছে না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানি না। প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি আমার ছেলে এসে ডাকবে। আমি আমার ছেলেকে বুকের মধ্যে ফিরে পেতে চাই।’

সাইদুলের অপেক্ষায় শুধু মা নন, পথ চেয়ে আছে তার স্ত্রী, ছোট দুই সন্তান ও দুই ভাই। চার বছরের মেয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলবে বলে মায়ের হাতে মোবাইল তুলে দেয়। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো কণ্ঠ ভেসে আসে না। বাবার কথা মনে পড়লেই কেঁদে ওঠে শিশুটি। আর ১১ মাসের ছেলেটি বোঝেই না কেন তার বাবা কাছে নেই।

কোলে ছোট সন্তানকে নিয়ে স্বামী সাইদুলের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন স্ত্রী মেরি আক্তারও। মেরি আক্তার বলেন, ‘আমার মেয়েটা প্রতিদিন আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে চায়। মোবাইল সামনে এনে বলে, আব্বুর সঙ্গে কথা বলব। কিন্তু আব্বু তো আর ফোনের ওপাশে নেই। আমি কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব, বুঝতে পারছি না।’

আত্মীয় জলিল বেপারিসহ বেশ কয়েকজনের জানান, বিদেশ যাওয়ার পর সাইদুলের পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ থাকায় প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা মাঝে মাঝে সাহায্য দেই। তাই দিয়েই তারা চলে। দালালদের বিচার এবং আমার ভাইয়ের সন্ধান চাই।

তবে নিখোঁজ সাইদুলের ভাই মাহিদুল বেপারী বলেন, দালাল আমাদের প্রলোভন দেখিয়ে আমার ভাইকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়া নিয়ে বিক্রি করে দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ৩৯ লাখ টাকা নিয়েছে। আমাদের ঘরবাড়ি জায়গার সম্পত্তি সব বিক্রি করে দিয়েছি এখন আমাদের থাকার মতো ঘর নেই। সব টাকা-পয়সা নিয়ে এখন আর ভাইয়ের খোঁজ দেয় না। আমরা দালালের বিচার চাই।

স্থানীয় বাসিন্দা রুমিচা বেগম বলেন, সাইদুলের পরিবারের স্থানীয়দের সহায়তায় কোনো দিন খাবার জোটে, আবার কোনো দিন সহায়তা না মিললে শিশুদের নিয়ে অনাহারে থাকতে হয়। এভাবে মানুষ তাদের কতদিন দেবে। সরকারের কাছে দালালদের বিচার এবং সাইদুলের সন্ধান চাই।

পরিবারের অভিযোগ, ঘটকচর এলাকার মৃত বাদশা ফরাজির ছেলে আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকার চুক্তিতে সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখান। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে একই বছরের ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে সাইদুলকে ইতালির কথা বলে নেওয়া হলেও তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। এরপর থেকে সাইদুলের সঙ্গে তার পরিবারের যোগাযোগ নেই।

স্বজনদের দাবি, লিবিয়ায় নেওয়ার পর সাইদুলকে স্থানীয় একটি চক্র জিম্মি করে। তাকে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেওয়ার পরও গত দুই মাস ধরে সাইদুলের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। স্থানীয় সালিশিদের কাছে গিয়েও সমাধান পায়নি তারা। সাইদুলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে দালাল আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তার, বাদল জমাদ্দার, সাহেব আলী জমাদ্দার, মামুন বেপারী, ইভা বেগম ও ছলে বেগমসহ সাতজনকে আসামি করে মাদারীপুরে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।

তবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নেইনি।’ অভিযুক্ত আনোয়ারের স্ত্রী শিল্পী আক্তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা টাকার পরিমাণ নিয়েও আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।’

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার আদালতে মামলা করেছে বলে জানতে পেরেছি। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে বিষয়টি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।