সরকারি হাসপাতালের ৩০০ গজের মধ্যেই ২২ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক

এশিয়া পোস্ট নিউজ, যশোর
সরকারি হাসপাতালের ৩০০ গজের মধ্যেই ২২ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক
নিয়মের তোয়াক্ক না করেই গড়ে উঠেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটকের মাত্র ৩০০ গজের ভেতরেই গড়ে উঠেছে ২২টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে আবার ২০টি প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ কাগজপত্র বা হালনাগাদ লাইসেন্সও নেই। অথচ ১৯৮২ সালের দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের ৩০০ গজের মধ্যে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ল্যাবরেটরি স্থাপন কিংবা পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

Advertisement

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া সড়কের একটি বহুতল ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পরিচালিত হচ্ছে ইউনিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। হাসপাতালের প্রধান ফটকের ঠিক সামনে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২৫০ বর্গফুটের প্রতিটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে পাঁচ থেকে ছয়টি শয্যা। একই ভবনের নিচতলায় রয়েছে কমটেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যা স্থানীয়ভাবে দালালনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটে অর্থোপেডিক ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং অন্য অংশে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। নিচতলায় রয়েছে ল্যাবজোন স্পেশালাইজড হাসপাতাল।

পাশাপাশি অন্যান্য ভবনের নিচতলায় ডক্টরস ল্যাব অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার এবং বিপরীতে ইসলামী ডায়াগনস্টিক সেন্টার সচল রয়েছে। আরেকটি ভবনের নিচতলায় প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ওপরের তলায় আল্ট্রাভিশন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সংলগ্ন ভবনের নিচতলায় পিয়ারলেস ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ওপরের তলায় ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু রয়েছে। একই স্থানে এভাবে একাধিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে ওঠায় প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগী ও স্বজনরা।

যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালের মেডিকেল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অধ্যাদেশ অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের ৩০০ গজের মধ্যে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনার সুযোগ নেই। কিন্তু যশোর জেনারেল হাসপাতালের সামনে সেই বিধান পুরোপুরি উপেক্ষিত। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অজুহাতে এসব প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী যশোর সদরের আবদুলপুর গ্রামের হাশেম আলী এবং দৌগাছিয়া গ্রামের আমজাদ হোসেনসহ একাধিক রোগী অভিযোগ করেন, জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগীদের ঘিরে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকে। উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের হাসপাতালের সামনের এসব নিম্নমানের ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। কোনো রোগী যেতে অস্বীকৃতি জানালে দালালদের হাতে মারধরের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং এই হয়রানি বন্ধে তারা দ্রুত অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার দাবি জানান।

হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, হাসপাতালে দালাল রয়েছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তারা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রতিটি জেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তারপরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চিকিৎসক হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে পরিচালিত এবং বৈধ কাগজপত্রবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করা হবে। খুব শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মানহীন ও অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় :যশোর