জীবিকার নিশ্চয়তা নেই /শেরপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে ঝুলছে তালা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, শেরপুর
শেরপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে ঝুলছে তালা
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে ঝুলছে তালা, বারান্দায় পশু পালন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও মেলেনি কর্মসংস্থানের সুযোগ। ফলে জীবিকার তাগিদে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পাওয়া স্থায়ী ঠিকানা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন শেরপুরের অনেক সুবিধাভোগী। এতে জেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের অসংখ্য ঘর দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খালি ঘরের তালিকা তৈরি করে তা প্রকৃত অসচ্ছলদের মাঝে পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নিচ্ছে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরে তিন ধাপে দুই শতক জমিসহ পাকা ঘর পেয়েছে ১ হাজার ৬৪৬টি পরিবার। এছাড়া চরাঞ্চলে আরও ১২৬টি পরিবারকে টিনশেড ঘর দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অনেক পরিবার স্থায়ী আবাসন, শিশুদের শিক্ষা ও নারীদের নিরাপত্তার সুযোগ পেলেও বিপুলসংখ্যক ঘর খালি থাকায় পুরো প্রকল্পের সামগ্রিক সফলতা এখন প্রশ্নের মুখে।

সরেজমিনে শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা বাজার সংলগ্ন একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর নির্মিত ১৫টি পাকা ঘরের বেশ কয়েকটি তালাবদ্ধ। বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকেই উপকারভোগীদের অনেকে এখানে থাকছেন না। একই চিত্র উপজেলার ঝুলগাঁও এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পেও। সেখানে দীর্ঘদিন মানুষ না থাকায় ঘরগুলোর চারপাশে ময়লা-আবর্জনা জমে এক নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু শ্রীবরদী নয়, জেলার অধিকাংশ আশ্রয়ণ প্রকল্পেই গড়ে পাঁচ থেকে সাতটি এবং কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১৫টিরও বেশি ঘর খালি পড়ে আছে। এর মধ্যে নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই নদীর তীরে নির্মিত মরিচপুরান ইউনিয়নের ভোগাইপাড় আশ্রয়ণ প্রকল্পের চিত্র আরও উদ্বেগজনক; সেখানকার অন্তত ৩০টি ঘরে ঝুলছে তালা। উপকারভোগীরা কেবল ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবে এখানে আসেন।

রাণীশিমুল আশ্রয়ণ প্রকল্পের এক উপকারভোগী লাল চান বলেন, ‘আমার ওইহানে থাকার ইচ্ছা আছিল, কিন্তু কাম-কাজের কোনো ব্যবস্থা নাই। তাই পেটের দায়ে শেরপুর শহরে গিয়া কাম করি। এহন শহরে ভাড়া বাসায় থাকি, আর সরকার থেইকা পাওয়া ঘরডা তালা দিয়া রাইখা আইছি।’

একই প্রকল্পের উপকারভোগী মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ঘর পাইয়া শুরুতে অনেক খুশি হইছিলাম। কিন্তু ওইহানে রোজগারের কোনো রাস্তা নাই। সংসার চালাইতে অন্য জায়গায় গিয়া কাম করতে অয়। তাই ঘর থাকলেও বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকতে হয়।’

ঝুলগাঁও এলাকার প্রকল্পের বাসিন্দা আছমত আলী বলেন, ‘অনেক ঘরই বহু দিন ধইরা খালি পইড়া আছে। কিন্তু আমাগো এলাকায় এখনও অনেক ভূমিহীন আর গরিব মানুষ আছে, যাগো থাকার মতো কোনো জায়গা নাই। প্রশাসন যদি ঠিকমতো খোঁজখবর লইয়া এই খালি ঘরগুলা প্রকৃত অসহায় মানুষগোরে দিয়া দেয়, তাইলে ভালো অইত।’

একই প্রকল্পের আরেক উপকারভোগী ফজল মিয়া বলেন, ‘যে ঘরগুলা মানুষ ব্যবহার করে না, ওইগুলা তাড়াতাড়ি অন্য গরিব মানুষগোরে দেওয়া দরকার। অনেক দিন খালি পইড়া থাকার কারণে অনেক ঘরে ফাটল ধরছে, নানা রকম ক্ষতিও অইতাছে।’

নালিতাবাড়ীর প্রকল্পের বাসিন্দা চাম্পা বেগম বলেন, ‘সরকার আমাগো এই ঘরডা দিছে, এইডা ঠিক আছে। কিন্তু খালি ঘর দিয়া তো আর সংসার চলে না। কাম-কাজের কোনো ব্যবস্থা করে নাই। পেটের দায়ে মানুষ কী করব? খামু কী? তাই আমাগো মধ্যে অনেকেই জীবিকার লাইগা বাইরের জায়গায় গিয়া কাম করে। কেউ শহরে যায়, কেউ ইটভাটায় যায়, আবার কেউ দিনমজুরির কাম করে। মাঝেমধ্যে কাম থাইকা ছুটি পাইলে এইহানে আইয়া থাকে।’

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

ওই প্রকল্পের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এইহানের বেশিরভাগ ঘর যেগুলা বরাদ্দ দেওয়া হইছে, সেগুলার মধ্যে অনেকগুলা এমন লোকের নামে গেছে যাগো আগেই নিজের বসতবাড়ি আছিল। রাজনৈতিক প্রভাব আর পরিচয়ের জোরে তাদের নাম তালিকায় উঠাইছে। গরিবরা অনেকেই ঘর পাই নাই। কেউ কেউ মাসে একবার বা দুই-এক দিনের লাইগা আসে, পরে আবার চইলা যায়। আর প্রায় সময়ই ঘরগুলা খালি থাকে।’

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, অনেক সুবিধাভোগী কাজের সন্ধানে ঢাকা বা দেশের অন্য এলাকায় চলে যাওয়ায় তাদের বরাদ্দকৃত ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে। এতে ঘরগুলো ব্যবহার না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তিনি জানান, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে খালি পড়ে থাকা ঘরের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে যেসব পরিবার সেখানে বসবাস করছে না এবং যেসব এলাকায় প্রকৃত গৃহহীন মানুষ রয়েছে, তাদের মধ্যে এসব ঘর পুনর্বণ্টনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় :শেরপুর