বিষাক্ত হয়ে উঠছে রূপসা-ভৈরব নদী, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও পয়োনিষ্কাশনের ময়লায় খুলনার দুই প্রধান নদী রূপসা ও ভৈরব এখন অস্তিত্ব সংকটে।ল শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশনের ময়লা, বাজারের আবর্জনা ও প্লাস্টিক বর্জ্যে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। এর প্রভাবে কমে যাচ্ছে মাছের উৎপাদন, হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন খুলনার মানুষ।
রূপসা উপজেলার বাগমারা এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় জেলে শহিদুল ইসলাম বলেন, একসময় ভৈরব নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। নদী থেকে মাছ ধরে সহজেই জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমানে নদীতে মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নদীর দূষণ ও অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে।
রূপসা নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা রুবি বেগম বলেন, একসময় রূপসা নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ ও ব্যবহারোপযোগী। স্থানীয় মানুষ দৈনন্দিন নানা কাজে, এমনকি পান করার জন্যও নদীর পানি ব্যবহার করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূষণের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। নদীর পানি এখন খুবই দুর্গন্ধ, যা অনেক সময় সহ্য করা যায় না।
রূপসা উপজেলার নৈহাটি এলাকার বাসিন্দা শামীম হাওলাদার বলেন, স্থানীয় বাজারে নদীর মাছের চাহিদা এখনও অনেক বেশি। তবে নদীতে মাছের সংকট দিন দিন বাড়ছে, ফলে জেলেরা আগের মতো মাছ ধরতে পারছেন না।ময়লা-আবর্জনায় নদী দূষণের ফলে মাছ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব পড়ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান বলেন, মানুষের পয়ঃনিষ্কাশন, হাটবাজারের বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন এবং বিভিন্ন ধরনের পচনশীল ও অপচনশীল আবর্জনা সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে ভৈরব ও রূপসা নদীর দূষণ ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া খুলনা অঞ্চলের শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং কৃষিজমিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানি ও ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে মিশছে, যা নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, নদীর পানিতে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও ভারী ধাতু মাছের দেহে জমা হয়। পরবর্তীতে সেই মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হলে এসব দূষক মানবদেহেও প্রবেশ করে। এর ফলে ক্যানসার, বন্ধ্যাত্বসহ নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন বলেন, রূপসা ও ভৈরব নদীর দুই তীরে অসংখ্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সরাসরি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে শিল্পকারখানার দূষিত পানি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। এছাড়া বড়বাজারসহ বিভিন্ন বাজারের ময়লা-আবর্জনাও অনেক সময় নদীতে ফেলা হয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে এখনও ঘাটতি রয়েছে।
তিনি জানান, খুলনা মাস্টারপ্ল্যানে ৪৯টি খাল চিহ্নিত করা হলেও এর অধিকাংশের অবস্থাই বর্তমানে সংকটাপন্ন। বিভিন্ন স্থানে নদী ও খাল ভরাট করে দখল করা হয়েছে। কোথাও কোথাও অবৈধভাবে মাছ চাষও করা হচ্ছে। দখলকারীদের মধ্যে বস্তিবাসী, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নদী ও খাল রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা টেকসই ফল বয়ে আনতে পারছে না। কারণ উচ্ছেদের পর দখলমুক্ত স্থান সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী কাজী মাহফুজুর রহমান (মুকুল) বলেন, নদী দূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্পকারখানার বর্জ্য, শহর ও লোকালয়ের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে নিঃসরণ, পলিথিন এবং অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্যের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা। এসব কারণে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, রূপসা নদী রক্ষায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলেও ময়ূর নদ, কাজিবাছা নদী এবং ভৈরব নদের যশোর অংশকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, দূষণ ও দখলমুক্ত নদী নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নদী রক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উদাসীনতা এবং রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে নদীর জায়গা লিজ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, আমরা প্রতি মাসেই নদীর পানির মান পরীক্ষা করে থাকি। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির মান সাধারণত নির্ধারিত মানদণ্ডের মধ্যে থাকে। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির মান অনেক ক্ষেত্রে মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না।
তিনি বলেন, যেসব শিল্পকারখানা পরিবেশগত ছাড়পত্র বা লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে মামলা দায়েরও করা হয়। এছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নদীতে দূষণ ছড়াচ্ছে—এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) খুলনা নদীবন্দরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বলেন, আমাদের কাছে নদীতীরবর্তী ৯০০টিরও বেশি অবৈধ স্থাপনার তালিকা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত করে পর্যায়ক্রমে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে।





