উচ্চশিক্ষায় আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) এখন সময়ের দাবি

উচ্চশিক্ষায় আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) এখন সময়ের দাবি
ড. ফুয়াদ হোসেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

আলবার্ট আইনস্টাইনের ভাষায় শিক্ষা শুধু তথ্য মুখস্থ করার নাম নয়; বরং শিক্ষা হলো চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়া। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজ আমাদের সামনে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে - আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি চিন্তাশীল মানুষ তৈরি করছে, নাকি শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে?

বাংলাদেশে প্রতি বছর যেসকল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে, তাদের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শিখেছে, কর্মক্ষেত্রে তার অনেকটাই কাজে লাগছে না। এই সমস্যাটি শুধু শিক্ষার্থীর নয়, সমস্যাটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার।

আমরা কী শেখাচ্ছি, নাকি শিক্ষার্থী কী শিখছে - কোনটি গুরুত্বপূর্ণ? দীর্ঘদিন ধরে আমাদের উচ্চশিক্ষা মূলত শিক্ষককেন্দ্রিক। শিক্ষক ক্লাস নেন, শিক্ষার্থী নোট করে, পরীক্ষায় লিখে, ভালো নম্বর পেলেই সে ‘ভালো ছাত্র’। প্রশ্ন হলো- বাস্তব জীবন কি এভাবে চলে?

একজন চিকিৎসকের রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা লিখিত পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন প্রকৌশলীর দক্ষতা শুধু সূত্র মুখস্থ জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন ব্যবস্থাপকের যোগ্যতা বইয়ের সংজ্ঞা মুখস্ত নয়; বরং বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণে। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন এখনও শুধুমাত্র মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভর করবে?

আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) ঠিক এই প্রশ্নমালা থেকেই শুরু হয়। ওবিই- এর মূল দর্শন হলো ‘শিক্ষক কী পড়ালেন’ তা নয়, বরং ‘শিক্ষার্থী কী করতে পারছে’ সেটি।

ওবিই আসলে কি? অনেকে মনে করেন ওবিই মানেই পিএলও, সিএলও, ম্যাপিং, রুবিকস কিংবা অ্যাক্রিডিটেশনের জন্য কিছু কাগজপত্র তৈরি করা। এটিই সবচেয়ে ভুল ধারণা। আউটকাম বেজড এডুকেশন আসলে একটি শিক্ষাদর্শন। এখানে প্রথমেই নির্ধারণ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কেমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে চায়? তারপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী কারিকুলাম ডিজাইন, পাঠদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা সাজানো হয়।

বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের ভাষায়- আমাকে বললে (Tell me) আমি ভুলে যাই, আমাকে শেখানোটা (Teach me) আমি হয়তো মনে রাখতে পারি, কিন্তু আমাকে যুক্ত করে (Involve me) যে কাজ করা হয়, আমি সেটি শিখে যাই। এই একটি বাক্যই আউটকাম বেজড এডুকেশনের দর্শনকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষে এখনও "Tell me" মডেলই চলছে। শিক্ষক বলছেন, শিক্ষার্থী লিখছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, তারপর ভুলে যাচ্ছে।

যেখানে আউটকাম বেজড এডুকেশন চায়- শিক্ষার্থী আলোচনা করবে। প্রশ্ন করবে। গবেষণা করবে। প্রকল্প করবে। ভুল করবে। আবার শিখবে। কিন্তু আউটকাম বেজড এডুকেশন এর প্রথম চ্যালেঞ্জ কারিকুলাম। তার চেয়ে বড় সংকট হলো- শিক্ষক। একজন শিক্ষক যদি সক্রিয় শিক্ষণ পদ্ধতি, শিক্ষণফলের স্তরভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন, মূল্যায়নের মানদণ্ড, শিক্ষণফল মানচিত্রায়ন কিংবা ধারাবাহিক মানোন্নয়ন সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা না রাখেন, তাহলে তিনি কীভাবে শিক্ষণফলভিত্তিক শিক্ষা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করবেন? এটি অনেকটা এমন যে একজন কোচ নিজে আধুনিক ক্রিকেট না বুঝে বিশ্বমানের ক্রিকেটার তৈরির চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো- ওবিই বাস্তবায়নের আগে শিক্ষক উন্নয়ন। কারণ কারিকুলাম লিখে পরিবর্তন আনা যায়। কিন্তু শ্রেণিকক্ষ পরিবর্তন করেন শিক্ষক।

বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজ শুধু লেকচার দিয়ে শিক্ষা সম্পন্ন হয় না। শিক্ষার্থীরা কেস স্টাডি করে। সিমুলেশন করে। ল্যাবে কাজ করে। বাস্তব সমস্যার সমাধান করে। সংশ্লিস্ট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে। তাদের প্রজেক্টে কমিউনিটিকে যুক্ত করে। কারণ শিক্ষা মানে শুধু জানা নয় - শেখা, করা, ব্যর্থ হওয়া এবং আবার শেখা।

তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় আউটকাম বেজড এডুকেশন বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো শিক্ষক উন্নয়ন। আমাদের শিক্ষক নিয়োগের পর নিয়মিত আউটকাম বেজড টিচিং, শেখনপদ্ধতি, ডিজিটাল লার্নিং, মূল্যায়ন পদ্ধতি, ইন্ডাস্ট্রি সংযুক্তি, শিক্ষা প্রযুক্তি ও যোগাযোগ দক্ষতার ওপর বাধ্যতামূলক পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পখাতকে কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ব্যবধান কমে আসে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আরেকটি উপেক্ষিত সংকট হলো শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি। আউটকাম বেজড এডুকেশন আমাদের শেখায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া একজন গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে কী কী দক্ষতা, মূল্যবোধ ও সক্ষমতা থাকা উচিত। আমরা চাই একজন শিক্ষার্থী সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করবে, বাস্তব সমস্যা সমাধান করবে, গবেষণা করবে, দলগতভাবে কাজ করবে, নেতৃত্ব দেবে, কার্যকরভাবে যোগাযোগ করবে, প্রযুক্তি ব্যবহার করবে এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। প্রশ্ন হলো- যিনি এই শিক্ষার্থীকে গড়ে তুলবেন, সেই শিক্ষককে নির্বাচন করার সময় আমরা কি এই গুণগুলো খুঁজে দেখি?

এটি একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয়- যে যোগ্যতা আমরা শিক্ষার্থীর মধ্যে দেখতে চাই, সেই একই যোগ্যতা যদি শিক্ষক নিয়োগের সময় মূল্যায়িত না হয়, তাহলে সেই যোগ্যতা শিক্ষার্থীর মধ্যে বিকশিত হবে কীভাবে? আমরা যে শিল্পের জন্য মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু শিল্পকে চিনি না। একটি কঠিন বাস্তবতা হলো- অনেক শিক্ষক তাদের শিক্ষার্থীরা যে শিল্পখাতে কাজ করবে, সেই শিল্পখাতের বাস্তব পরিবেশে কখনও কাজ করেননি। এতে তাদের একাডেমিক যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না; কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের জ্ঞান অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে পিছিয়ে থাকে।

একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান দূর করতে শিক্ষক ও শিল্পখাতের কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য শিক্ষক-শিল্প সংযোগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণা সহায়তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অবকাশকালীন কর্ম-অভিজ্ঞতা, যৌথ গবেষণা এবং বাধ্যতামূলক শিল্প-অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ-এর মতো উদ্যোগকে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ, একজন শিক্ষক যত বেশি শিল্পখাতের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, ততই তিনি যুগোপযোগী দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদা এবং প্রত্যাশিত শিক্ষণফল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও কার্যকরভাবে বিকশিত করতে সক্ষম হবেন।

আমরা শিক্ষার্থীদের বলি- সৃজনশীল হও। যোগাযোগে দক্ষ হও। নেতৃত্ব দাও। সমস্যা সমাধান করো। গবেষণা করো। প্রযুক্তিতে পারদর্শী হও। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের সময় যদি আমরা এই যোগ্যতাগুলো যাচাইই না করি, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের এই প্রত্যাশা কতটা ন্যায়সংগত?

এটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং একটি নীতিগত প্রশ্ন। যে দক্ষতা শিক্ষক নির্বাচনেই মূল্যায়িত হয় না, সেই দক্ষতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

দার্শনিক জন ডিউই বলেছিলেন, যদি আমরা আজকের শিক্ষার্থীদের গতকালের পদ্ধতিতে পড়াই, তাহলে আমরা তাদের আগামীকালকে কেড়ে নিই। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আজ ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

আউটকাম বেজড এডুকেশন কোনো নতুন স্লোগান নয়, কোনো প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, কিংবা কেবল অ্যাক্রিডিটেশন-এর শর্ত পূরণের একটি কৌশলও নয়। এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের নাম।

এ পরিবর্তনে শিক্ষককে তথ্যদাতা থেকে শেখার সহযাত্রী হতে হবে; শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার্থী থেকে সমস্যা-সমাধানকারী হতে হবে; আর বিশ্ববিদ্যালয়কে সনদ বিতরণের প্রতিষ্ঠান থেকে দক্ষ, মানবিক, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য তার ভবনের আকার, র‌্যাংকিং কিংবা ফলাফলে নয়; বরং তার গ্র্যাজুয়েট সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতিতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে সেই অবদানের মধ্যেই তার প্রকৃত পরিচয় নিহিত।


লেখক: ডিন, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।