ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রত্যাশা: রাজনৈতিক কৌশল নাকি আদর্শিক অস্বস্তি?

শহিদুল ইসলাম কবির
ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রত্যাশা: রাজনৈতিক কৌশল নাকি আদর্শিক অস্বস্তি?
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিষয় প্রায়ই লক্ষ করা যায় যে, একটি দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নিয়ে অন্য দলের কিছু নেতাকর্মীর অস্বাভাবিক আগ্রহ। সাধারণ রাজনৈতিক কৌতূহলের বাইরে গিয়ে যখন কোনো দলের আমির বা শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তনের অপেক্ষা প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এর পেছনে কী কারণ কাজ করছে?

সম্প্রতি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। নতুন মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দেওয়া একটি পোস্টে একটি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য মন্তব্য করেন, ‘আমীর বা নায়েবে আমীর কি পরিবর্তন হয়েছে?’

আমার কাছে এটি নিছক একটি প্রশ্ন নয়; বরং একটি রাজনৈতিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে হয়েছে।

আমার পর্যবেক্ষণে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও সিনিয়র নায়েবে আমিরের নেতৃত্ব নিয়ে কিছু রাজনৈতিক মহলের অস্বস্তির মূল কারণ হলো দলটির স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান। বিভিন্ন সময় নির্বাচনি সমঝোতা বা রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির নানা উদ্যোগ থাকলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজেদের নীতি ও আদর্শের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি—এমন দাবিই দলটি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দলটি কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক রাজনীতির কথা বলে আসছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, খোলাফায়ে রাশেদার আদর্শ অনুসরণ করে রুহানিয়াত ও সংগ্রামের সমন্বয়ে একটি আদর্শভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছে। এ কারণে রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের হিসাবের চেয়ে নীতিগত অবস্থানকে তারা বেশি গুরুত্ব দেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ থেকে নানা ধরনের চাপ, প্রলোভন কিংবা সমঝোতার প্রস্তাব এসেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দাবি, এসব পরিস্থিতিতেও তারা দলীয় স্বার্থে আদর্শ বিসর্জনের পথ বেছে নেয়নি। এ কারণেই হয়তো দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কিছু মহলে বারবার আলোচনায় আসে।

মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীমের (রহ.) একটি বক্তব্য আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলতেন, ‘কেরামতি প্রদর্শনের চেয়ে আল্লাহর ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল আমলের ওপর অটল থাকা এবং হারাম ও মাকরুহ থেকে বিরত থাকাই প্রকৃত সফলতা।’ এই আদর্শিক শিক্ষা শুধু ব্যক্তিজীবনের জন্য নয়, রাজনৈতিক জীবনেও একটি নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বর্তমান আমীর ও সিনিয়র নায়েবে আমিরের নেতৃত্ব সম্পর্কে দলটির সমর্থকদের বিশ্বাস, তারা আদর্শিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনাও হতে পারে; তবে কোনো দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বানানোর সংস্কৃতি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রত্যেক দলের নিজস্ব আদর্শ, সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা রয়েছে। কোনো দলের সঙ্গে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু সেই দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নীতি, কর্মসূচি ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করবে।


লেখক পরিচিতি

শহিদুল ইসলাম কবির মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিলের সভাপতি।

ই-মেইল:shahid_kabir2007@yahoo.com