আলজাজিরার বিশ্লেষণ/ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের সমঝোতা কি পরবর্তী যুদ্ধের পথ খুলে দিচ্ছে

সামি হালাবি
ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের সমঝোতা কি পরবর্তী যুদ্ধের পথ খুলে দিচ্ছে
২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার এবং লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ছবি: রয়টার্স

মাসের পর মাস যুদ্ধ, ব্যাপক চাপ আর দীর্ঘ কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপের পর শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে লেবানন। তবে এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া হয়েছে অত্যন্ত তীব্র। হিজবুল্লাহ ও তাদের মিত্রসহ লেবাননের বড় একটি রাজনৈতিক অংশ এই সমঝোতার নিন্দা জানিয়েছে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে এবং গণমাধ্যমেও চলছে কড়া সমালোচনা।

এই চুক্তিতে অনেক সমস্যা রয়েছে। এটি যেমন অবাস্তব ও রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক, তেমনি এর সাংবিধানিক বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এই সমঝোতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো— এটি নতুন একটি যুদ্ধের পথ তৈরি করছে। আর সেই যুদ্ধের দায় শেষ পর্যন্ত লেবাননের ওপরই চাপানো হতে পারে।

একটি ‘অসম্ভব’ চুক্তি

ইসরায়েল দীর্ঘ সময় ধরে অস্পষ্ট শব্দে লেখা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি বা সমঝোতা থেকে ফায়দা তুলে আসছে। ওসলো চুক্তিও ছিল তেমনি একটি ‘মূলনীতি ঘোষণা’। সেখানে সীমান্ত, বসতি স্থাপন, জেরুজালেম, শরণার্থী ও সার্বভৌমত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলো অমীমাংসিত রাখা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এগুলো নিয়ে পরে আলোচনা হবে। কিন্তু সেই ‘পরে’ আর কখনোই আসেনি। বরং সেই অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল নিজের সুবিধামতো কাজ করেছে। তারা দখলদারত্ব বাড়িয়েছে এবং বর্ণবাদী শাসন কায়েম করেছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেই এমন সব শর্ত পূরণে ব্যর্থতার জন্য তারা ফিলিস্তিনিদেরই দোষারোপ করেছে।

লেবানন আর ফিলিস্তিন এক নয়। তাদের প্রেক্ষাপট এবং চুক্তির ধরনও ভিন্ন। তবে উভয় ক্ষেত্রে কূটনৈতিক কৌশলে অনেক মিল রয়েছে, যা বেশ উদ্বেগের। লেবানন ও ইসরায়েল তাদের সংঘাত মেটানোর ঘোষণা দিলেও চূড়ান্ত কোনো সমাধানে পৌঁছায়নি। আপাতদৃষ্টিতে একে নমনীয় মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি ফাঁদ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

লেবানন এখন যে কাঠামো মেনে নিয়েছে, তা বর্তমান অবস্থায় বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, শুধু সরকারি আদেশ জারি করে হিজবুল্লাহর বিকল্প তৈরি করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। হিজবুল্লাহর অস্ত্রশস্ত্র কেবল একটি সামরিক বাস্তবতা নয়; এর সঙ্গে দেশটির প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মতো রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো জড়িয়ে আছে। ওয়াশিংটনে বসে শুধু একটি কাগজে সই করে এই দীর্ঘদিনের কাঠামো ভেঙে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে, লেবাননের সেনাবাহিনী এখন নানা সংকটে জর্জরিত। তাদের পর্যাপ্ত বাজেট নেই এবং তারা অতিরিক্ত চাপে রয়েছে। রাজনৈতিকভাবেও তারা সংকটাপন্ন। তদুপরি, এই বাহিনী বিদেশের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। আবার সেই সহায়তার সীমাও নির্ধারণ করে দেয় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এই বাহিনীকে হঠাৎ করে একটি সার্বভৌম ও শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

প্রকৃতপক্ষে, লেবানন যেসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল, সেখানেই তাকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে শক্ত অবস্থান নিতে বলা হচ্ছে। লেবানন যাদের পরাজিত করতে পারবে না, সেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে। আবার যে শত্রুকে সে ঠেকাতে পারছে না, তার সঙ্গেই আলোচনার কথা বলা হচ্ছে। লেবানন এমন সব বাধ্যবাধকতা মেনে নিয়েছে, যেগুলোর বাস্তবায়ন এমন সব শক্তির ওপর নির্ভর করছে, যাদের কাছে লেবাননের সার্বভৌমত্বের কোনো গুরুত্বই নেই।

সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত বিলম্ব

চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরের কিছু শর্ত। আন্তর্জাতিক কোনো রাজনৈতিক বা আইনি ফোরামে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো ‘বৈরী’ বা ‘প্রতিকূল’ পদক্ষেপ না নেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। এই শর্ত লেবাননের সাধারণ মানুষ, যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সমর্থকদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

সামরিক শক্তিতে লেবানন কোনোভাবেই ইসরায়েলের সমকক্ষ নয়। দেশটির হাতে এখন কেবল কূটনৈতিক, আইনি আর রাজনৈতিক হাতিয়ারই অবশিষ্ট আছে। ‘উত্তেজনা প্রশমন’-এর দোহাই দিয়ে যদি সেই সুযোগগুলোও কেড়ে নেওয়া হয়, তবে লেবানন পুরোপুরি শক্তিহীন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) যাওয়ার মতো পথগুলো বন্ধ করা হলে লেবানন তার শেষ সম্বলটুকুও হারাবে।

এখানে বড় ধরনের একটি সাংবিধানিক সংকটও রয়েছে। তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে লেবাননের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হয়তো এই ঘোষণাকে কেবল একটি ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ হিসেবে চালিয়ে দিতে চাইবেন। একে হয়তো তারা আইনি বাধ্যবাধকতাহীন কোনো দলিল হিসেবে দেখাতে চাইবেন। কিন্তু কেবল নাম দিয়ে এর ভেতরের বিষয়বস্তুকে আড়াল করা সম্ভব নয়। এই দলিলে যদি যুদ্ধ, শান্তি, সীমানা নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা কিংবা নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো থাকে, তবে এটি আর সাধারণ কোনো কূটনৈতিক আলোচনা থাকে না।

লেবাননের সংবিধান কোনো ব্যক্তিকে এককভাবে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষমতা দেয়নি। আন্তর্জাতিক যেকোনো চুক্তির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। যুদ্ধ, শান্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো মন্ত্রিসভার এখতিয়ারভুক্ত। এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই শেষ কথা নয়।

একটি সাধারণ ‘ইচ্ছাপত্র’ ব্যবহার করে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সুরক্ষা কবচকে ফাঁকি দেওয়া যায় না। লেবাননের সংবিধান রাষ্ট্রকে তার অখণ্ডতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। তাই কোনো ঘোষণার মাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিকে বৈধতা দেওয়া সম্ভব নয়। আবার হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের ওপর ভিত্তি করে লেবাননের সার্বভৌমত্বের শর্ত জুড়ে দেওয়াও অসাংবিধানিক।

ঠিক এই জায়গাটিতেই চুক্তিটি রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে। হিজবুল্লাহ এবং আমাল মুভমেন্টসহ বিরোধীরা এই সমঝোতাকে আটকে দেওয়ার সব রকমের চেষ্টা করবে। তারা যুক্তি দেখাবে যে, এর জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। তারা এই চুক্তিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিকীকরণ’ হিসেবেও আখ্যা দিতে পারে।

বিরোধী পক্ষগুলো ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করতে পারে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের অধিকার খর্ব করার যেকোনো চেষ্টার তারা প্রতিবাদ জানাবে। তারা পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিভিন্ন কমিটি, সাংবিধানিক বিতর্ক আর আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে ফেলে অচল করে দিতে পারে। সাধারণত লেবাননের রাজনীতিতে এমন অচলাবস্থাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দেরি হওয়াটাই হয়তো লেবাননের জন্য সবচেয়ে কম বিপজ্জনক পথ।

পরবর্তী যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

আসল চুক্তির ভাগ্য বৈরুতে নির্ধারিত হচ্ছে না। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে নির্ধারিত হচ্ছে। লেবানন কাগজে কী সই করল, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো তেহরান হিজবুল্লাহকে কী নির্দেশ দিচ্ছে। ওয়াশিংটন কীসের নিশ্চয়তা দিচ্ছে এবং ইসরায়েল আসলে কতটা সুবিধা আদায় করতে পারছে—তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা কতদিন টিকে থাকে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত ছড়াবে কি না।

আপাতত এই ঘোষণার ভাষার চেয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই আঞ্চলিক প্রক্রিয়া যদি প্রাথমিক ৬০ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে হিজবুল্লাহ হয়তো সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। কিন্তু এই আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তবে স্রেফ কাগজের এই ঘোষণা যুদ্ধ থামাতে পারবে না।

এভাবে একটি চুক্তিতে সই করে লেবানন সরকার হয়তো ভাবছে তারা কিছুটা সময় পাবে। তারা হয়তো আশা করছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দলিল ইতিহাসের আবর্জনায় পরিণত হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই চুক্তিতে যা লেখা আছে তার স্থায়িত্ব অনেক বেশি। সাময়িক রাজনৈতিক লাভের চেয়ে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে ভয়াবহ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে পারলে হয়তো কয়েক মাস সময় পাওয়া যাবে। এটি হয়তো লেবাননকে ইসরায়েলি নির্বাচন বা যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য কিছুটা সময় দেবে। হিজবুল্লাহ, ইসরায়েল, ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এটি একটি কৌশল হতে পারে। তবে এই কৌশলের জন্য লেবাননকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে।

এই চুক্তি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, এর সুদূরপ্রসারী আইনি ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ইরান নির্দেশ না দিলে হিজবুল্লাহ এই চুক্তির শর্ত মানবে না—এটাই বাস্তবতা। আর হিজবুল্লাহ যদি শর্ত না মানে, তবে ইসরায়েল সরাসরি লেবানন সরকারকে দায়ী করবে।

আবার পর্যাপ্ত রসদহীন লেবাননের সেনাবাহিনী যদি সীমান্তে ঠিকমতো মোতায়েন হতে না পারে, সেখানেও ইসরায়েল লেবাননের ব্যর্থতা খুঁজবে। এমনকি লেবানন যদি আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়, তবে ইসরায়েল একে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ হিসেবে প্রচার করবে। ইসরায়েলের কোনো নিরাপত্তা শর্ত মানতে অস্বীকার করলেই তারা বলবে—লেবানন শান্তি চায় না।

তাই এই ঘোষণা কোনোভাবেই যুদ্ধ ঠেকাবে না। উল্টো এটি এমন এক রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপট তৈরি করবে, যা ভবিষ্যতে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নতুন যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে কাজ করবে।

বড় ট্র্যাজেডি হলো, দীর্ঘ সময় পর লেবাননকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল লেবাননের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। হিজবুল্লাহ সেই সার্বভৌমত্বকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিয়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো লেবাননকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বও চরম অবহেলা দেখিয়েছে।

এখন প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী, শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, কার্যকর প্রতিরক্ষা নীতি আর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সত্যিকারের সার্বভৌমত্ব সংজ্ঞায়িত করার বদলে লেবানন এমন এক পথে পা বাড়িয়েছে, যা দেশটির বর্তমান দুর্বলতাকেই বিশ্বের সামনে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিচ্ছে।


আলজাজিরা থেকে অনূদিত

লেখক পরিচিতি: সামি হালাবি বৈরুতভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘বাদিল , দ্য অলটারনেটিভ পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর পলিসি ডিরেক্টর।