জোর নয়, এই কৌশলেই শিশুকে সবজি খাওয়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জোর নয়, এই কৌশলেই শিশুকে সবজি খাওয়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
ছবি : সংগৃহীত

বাড়িতে ছোট শিশু থাকলে একটি ঘটনা খুবই পরিচিত। ভাত খাবে, ডিম খাবে, মাছ-মাংসও খাবে। কিন্তু প্লেটে সবজি দেখলেই মুখ গোমড়া। কেউ সবজি দেখেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ আবার পালং শাকের এক চামচও মুখে নিতে চায় না। এমন অনেক অভিভাবকই চিন্তায় পড়ে যান, শিশুর এমন খুঁতখুঁতে খাবারের অভ্যাস কি স্বাভাবিক?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটবেলায় অনেক শিশুরই মিষ্টি স্বাদের খাবারের প্রতি বেশি আগ্রহ থাকে। এমনকি মায়ের দুধেও প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি স্বাদ থাকে। তাই কঠিন খাবার খাওয়া শুরু করার পর সবজি খাওয়ানো অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু শিশুদের সুস্থ বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত ফল ও সবজি খাওয়া খুবই জরুরি। পর্যাপ্ত সবজি না খেলে শুধু শারীরিক নয়, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আচরণ এবং পড়াশোনার ফলাফলেও প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি বাড়তে পারে স্থূলতার ঝুঁকিও।

সুখবর হলো, গবেষকরা শিশুদের সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে কয়েকটি কার্যকর উপায় খুঁজে পেয়েছেন। সামান্য কিছু পরিবর্তনেই শিশুর খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

সবজি খেতে দিন

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিডসের বায়োসাইকোলজির অধ্যাপক ম্যারিয়ন হেদারিংটনের মতে, ছোটবেলায় যত বেশি ধরনের সবজির সঙ্গে শিশুর পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়, ততই ভালো।

তিনি বলেন, পাঁচ বছর বয়সের আগেই সবজি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করার সবচেয়ে ভালো সময়। এরপরও সম্ভব, তবে কাজটা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নতুন সবজি শিশুর পছন্দ হতে অনেক সময় একই খাবার ৫ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত খাওয়ার সুযোগ দিতে হতে পারে। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে সংখ্যা এক নয়।

এক বছরের কম বয়সী শিশুরা তুলনামূলক কমবার চেষ্টা করেই নতুন খাবার গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু তিন থেকে চার বছরের শিশুদের মধ্যে নতুন খাবার খেতে অনীহা বেশি দেখা যায়।

মজার বিষয় হলো, এই অভ্যাসের শুরু হতে পারে জন্মের আগেই। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় মা যেসব খাবার খান, তার স্বাদ অ্যামনিয়োটিক তরলের মাধ্যমে শিশুর কাছেও পৌঁছাতে পারে। এতে ভবিষ্যতে শিশুর খাবারের পছন্দে প্রভাব পড়তে পারে।

খাবারের শুরুতেই সবজি দিন

অনেকেই বলেন, সবজি শরীরের জন্য ভালো। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু স্বাস্থ্যকর বললে শিশুরা খাবারটি খেতে বেশি আগ্রহী হয় না। বরং সুস্বাদু মনে হলে তারা সেটি সহজে গ্রহণ করে।

অধ্যাপক ম্যারিয়ন হেদারিংটনের পরামর্শ, খাবারের শুরুতেই সবজি পরিবেশন করুন। কারণ তখন শিশুর সবচেয়ে বেশি ক্ষুধা থাকে। যদি আগে ভাত, মাংস বা অন্য পছন্দের খাবার খেয়ে ফেলে, তাহলে শেষে সবজি আর খেতে চাইবে না।

প্লেটে সবজির পরিমাণ বাড়ান

সবজি আলাদা করে খাওয়ানো কঠিন মনে হলে আরেকটি সহজ উপায় হলো প্লেটের ভারসাম্য বদলে দেওয়া। মাংস বা বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের তুলনায় সবজির পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দিন।

চাইলে গাজর, লাউ বা জুচিনি কুচি করে ডাল, স্যুপ বা তরকারির মধ্যে মিশিয়েও দিতে পারেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্লেটে ফল ও সবজির পরিমাণ ৫০ শতাংশ বাড়ালে শিশুরা সেগুলোও বেশি খায়। এ ছাড়া একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি পরিবেশন করলে প্রি-স্কুল বয়সী শিশুরা তুলনামূলক বেশি সবজি খায়।

সবজিকে আকর্ষণীয় করে পরিবেশন করুন

খাবার শুধু স্বাদের বিষয় নয়, দেখতে কেমন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা সাধারণত যে খাবার দেখতে সুন্দর বা মজার লাগে, সেটির প্রতিই আগে হাত বাড়ায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফুল, প্রজাপতি বা টেডি বিয়ারের মতো আকৃতিতে ফল ও সবজি কেটে পরিবেশন করলে শিশুরা সেগুলো বেশি খেতে আগ্রহী হয়।

একটি গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আলাদা আলাদা প্লেটের বদলে একটি বক্সে বিভিন্ন ধরনের কাটা সবজি সাজিয়ে দিলে শিশুরা বেশি সবজি বেছে খায়।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভাগ করা অংশযুক্ত প্লেটে খাবার পরিবেশন করলে প্রি-স্কুল বয়সী শিশুরা ৩৬ শতাংশ বেশি সবজি খেয়েছে।

পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খান

শিশুরা বড়দের দেখেই অনেক কিছু শেখে। খাবারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। যদি বাবা-মা নিয়মিত সবজি খান, তাহলে শিশুও ধীরে ধীরে সেটি স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে।

নিউজিল্যান্ডে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারের বড়দের খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর, তাদের শিশুরা কেক, চকলেট ও অস্বাস্থ্যকর নাশতা তুলনামূলক কম খায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত তিন দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেলে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ভালো হয়, শরীরের ওজনও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর থাকে।

খাবার নিয়ে খেলতে দিন

অনেক অভিভাবক জোর করে সবজি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, এতে উল্টো ফল হতে পারে। একইভাবে সবজি খাওয়ার পুরস্কার হিসেবে চকলেট বা মিষ্টি দিলে শিশুর সেই অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে পারে। বরং শিশুকে খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিন।

একটি গবেষণায় শিশুদের বিট, ছোলা ও পাক চয়ের মতো নতুন উপকরণ স্পর্শ করতে, ঘ্রাণ নিতে এবং কাছ থেকে দেখতে দেওয়া হয়েছিল। তাদের খেতে বাধ্য করা হয়নি।

ফলাফল ছিল ইতিবাচক। পরে সেই শিশুরাই নতুন খাবার চেখে দেখতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে।

একই গবেষণায় শিশুদের রান্নার কাজে অংশ নিতে দেওয়া হলে নতুন খাবারের প্রতি তাদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।

এই গবেষণায় অংশ নেওয়া পরীক্ষামূলক শেফ জোজেফ ইউসুফ বলেন, শিশুদের কাছে খাবারকে আনন্দের বিষয় করে তুলতে হবে।

তার ভাষায়, খেলাধুলার পরিবেশে, কোনো চাপ ছাড়া যখন শিশুরা খাবার ছুঁয়ে দেখে, গন্ধ নেয়, পরীক্ষা করে বা রান্নায় অংশ নেয়, তখন তারা নতুন খাবার খেতে অনেক বেশি আগ্রহী হয়।

সব শিশু একদিনেই সবজি খেতে শুরু করবে, এমনটা আশা করা ঠিক নয়। নতুন স্বাদ গ্রহণ করতে সময় লাগে।

তাই ধৈর্য ধরুন। একই সবজি বারবার দিন, নিজেরাও নিয়মিত সবজি খান, খাবারকে আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করুন এবং শিশুকে জোর না করে ধীরে ধীরে নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করুন।

ছোট ছোট এই পরিবর্তনগুলোই একসময় শিশুর খাদ্যাভ্যাসে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

সূত্র: বিবিসি