বিমানে পাওয়ার ব্যাংক ও ভেপ বহনে নতুন সতর্কতা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বিমানে পাওয়ার ব্যাংক ও ভেপ বহনে নতুন সতর্কতা
ছবি : সংগৃহীত

ছুটিতে বিমানে ভ্রমণের আগে অনেকেই ব্যাগ গোছানোর সময় মোবাইল চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, ভেপ কিংবা ল্যাপটপ ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেন। কিন্তু সামান্য এই অসাবধানতাই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

Advertisement

যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বা সিএএ জানিয়েছে, বর্তমানে বিমানে অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে লিথিয়াম ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস। তাই যাত্রীদের এসব ডিভাইস লাগেজের কার্গো অংশে না রেখে নিজের সঙ্গে কেবিনে বহনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ লিথিয়াম ব্যাটারি?

বর্তমানে স্মার্টফোন, পাওয়ার ব্যাংক, ল্যাপটপ, স্মার্টওয়াচ, ভেপসহ অনেক ইলেকট্রনিক যন্ত্রেই লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়।

এই ব্যাটারিগুলো আকারে ছোট হলেও খুব বেশি শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। কিন্তু কোনো কারণে ব্যাটি অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে বা ত্রুটিপূর্ণ হলে দ্রুত আগুন ধরে যেতে পারে। এমন আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবিনে এমন ঘটনা ঘটলে বিমানকর্মীরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু যদি কার্গোতে রাখা লাগেজের ভেতরে আগুন লাগে, তাহলে সেটি অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে ঘটনা

সিএএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে বিমানের কার্গো লাগেজে লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত ডিভাইস পাওয়ার ঘটনা ছিল ৩১৬টি।

মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪৩টিতে।

একই সময়ে ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হওয়া বা ত্রুটিজনিত ঘটনার সংখ্যাও ১২৩টি থেকে বেড়ে ২০৬টিতে পৌঁছেছে।

বর্তমানে গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুটি লিথিয়াম ব্যাটারি-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

একটি পাওয়ার ব্যাংকের কারণে মাঝপথে নামতে হয়েছিল বিমান

এই ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণও রয়েছে।

গত মাসে একটি ইজিজেটের বিমানকে মাঝপথে ইতালির রোমে জরুরি অবতরণ করতে হয়। পরে জানা যায়, একটি পাওয়ার ব্যাংক ভুল করে কার্গো লাগেজে রাখা হয়েছিল।

এর আগে গত বছরের অক্টোবরে এয়ার চায়নার একটি বিমানের ওভারহেড কেবিন থেকে আগুন বের হওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, লিথিয়াম ব্যাটারির কারণেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।

যাত্রীদের জন্য নতুন সতর্কতা

সিএএর মতে, এখনও অনেক যাত্রী এসব নিয়ম সম্পর্কে জানেন না। তাই যাত্রীদের কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মোবাইল ফোন, পাওয়ার ব্যাংক, ভেপসহ লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত ডিভাইস সব সময় কেবিন ব্যাগে রাখুন।

  • একজন যাত্রী সর্বোচ্চ দুটি পাওয়ার ব্যাংক বহন করতে পারবেন।
  • বিমানের ভেতরে কখনও পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দেওয়া যাবে না।
  • ল্যাপটপ যদি চেক-ইন লাগেজে রাখতেই হয়, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

এয়ারলাইন্স ইউকের প্রধান নির্বাহী টিম অ্যাল্ডারস্লেড বলেন, মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে ভ্রমণ করছে। ফলে লিথিয়াম ব্যাটারির ঝুঁকিও বাড়ছে।

তার মতে, পাইলট ও কেবিন ক্রুরা এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ পেলেও সবচেয়ে ভালো উপায় হলো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা। আর সেটি শুরু হয় যাত্রীদের সঠিকভাবে ব্যাগ গোছানোর মাধ্যমে।

অন্যদিকে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাবিষয়ক দাতব্য সংস্থা ইলেকট্রিক্যাল সেফটি ফার্স্টের পণ্য নিরাপত্তা প্রকৌশলী জিউসেপ্পে কাপান্না বলেন, লিথিয়াম ব্যাটারিতে প্রচুর শক্তি জমা থাকে। তাই কোনো ত্রুটি দেখা দিলে খুব দ্রুত ভয়াবহ আগুন লাগতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

তিনি বলেন, যদি এসব ডিভাইস কার্গো লাগেজে থাকে, তাহলে সমস্যার সময় সেগুলোতে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তার মতে, বেশিরভাগ মানসম্মত পণ্যে সমস্যা হয় না। ঝুঁকি বেশি থাকে নিম্নমানের বা অচেনা বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা পণ্যে।

তাই ভ্রমণের আগে অবশ্যই নিরাপদ, পরীক্ষিত এবং মানসম্মত লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত পণ্য ব্যবহার করা উচিত।

ভ্রমণের আগে যা মনে রাখবেন

বিমান ভ্রমণের সময় পাওয়ার ব্যাংক, ভেপ, মোবাইল ফোন বা অন্যান্য লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত ডিভাইস কখনোই চেক-ইন লাগেজে রাখবেন না। এগুলো সব সময় নিজের কেবিন ব্যাগে রাখুন এবং বিমান সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম মেনে বহন করুন।

সামান্য এই সতর্কতাই বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারে এবং আপনার ভ্রমণকে আরও নিরাপদ করে তুলবে।

সূত্র: বিবিসি