কোন সময় গোসল করা শরীরের জন্য বেশি উপকারী

গোসল নিয়ে সবারই নিজস্ব অভ্যাস থাকে। কেউ সকালে গোসল না করলে যেন ঘুমই কাটে না। আবার কেউ সারাদিনের ধুলো, ঘাম আর ক্লান্তি ধুয়ে না ফেলে বিছানায় যেতে পারেন না। আবার অনেকে সময়ের চেয়ে সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেন। যখন সময় পান, তখনই গোসল করেন।
কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, গোসলেরও কোনো আদর্শ সময় আছে নাকি!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর উত্তর হলো হ্যাঁ। যদিও সবার জন্য একই সময় সেরা নয়, তবে কোন উদ্দেশ্যে গোসল করছেন, তার ওপর নির্ভর করে সকাল বা রাতের গোসল আলাদা আলাদা উপকার দিতে পারে।
সত্যিই কি গোসলের সময় গুরুত্বপূর্ণ?
মৌলিক পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে বিষয়টি খুব সহজ। শরীর ঘেমে গেলে, ব্যায়াম করার পর, বাইরে ধুলোবালিতে ঘোরাঘুরি করলে বা রোদে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর গোসল করা দরকার।
তবে যদি লক্ষ্য হয় ভালো ঘুম, সুস্থ ত্বক, পরিষ্কার মাথার ত্বক বা অ্যালার্জির সমস্যা কমানো, তাহলে গোসলের সময় কিছুটা গুরুত্ব পায়।
বোর্ড সার্টিফায়েড ট্রাইকোলজিস্ট এবং স্ক্যাল্প গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টিন ম্যাকমিলান বলেন, সবার জন্য একটাই নির্দিষ্ট সময় নেই। কারণ প্রত্যেকের শরীর, জীবনযাপন, ত্বক, মাথার ত্বক এবং ঘুমের অভ্যাস আলাদা।
অর্থাৎ, কোন সময় গোসল করবেন, সেটি আপনার প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে।
উৎপাদনশীল দিন শুরু করতে চাইলে সকালে গোসল করুন
অনেকের কাছে সকালের গোসল শুধু শরীর পরিষ্কার করার বিষয় নয়, বরং নতুন দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার একটি অংশ। ঘুম ঘুম ভাব দূর করা, শরীরকে সতেজ করা এবং কাজে মন বসাতে সকালের গোসল বেশ কার্যকর হতে পারে।
ক্রিস্টিন ম্যাকমিলান বলেন, যদি সকালে গোসল করলে নিজেকে সতেজ ও কর্মক্ষম মনে হয়, তাহলে সেটিই আপনার জন্য ভালো অভ্যাস।
অনেকের ক্ষেত্রে এটি দিনের শুরুতে মানসিকভাবে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলে।
ভালো ঘুম চাইলে রাতের গোসল বেশি উপকারী
ঘুমের মান উন্নত করতে চাইলে রাতের গোসলের পক্ষে সবচেয়ে বেশি বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ডিভিশন অব স্লিপ মেডিসিনের গবেষক ও চিকিৎসক ড. এরিক ঝৌ বলেন, ২০১৯ সালের একটি গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘুমানোর এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে ১০ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে হালকা গরম পানিতে গোসল করলে ঘুমের মান উন্নত হয়।
এর কারণ শরীরের তাপমাত্রা।
ঘুমানোর আগে শরীর স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা হতে শুরু করে। হালকা গরম পানিতে গোসল করলে রক্ত চলাচল বাড়ে এবং শরীর দ্রুত ঠান্ডা হতে সাহায্য করে। এতে সহজে ঘুম আসে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন একই সময়ে রাতের গোসল করলে মস্তিষ্ক এটিকে ঘুমের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চিনে নেয়। ফলে শরীরও ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়।
তবে গোসলের পরপরই ভেজা শরীর নিয়ে বিছানায় যাওয়া ঠিক নয়। শরীরকে কিছুটা ঠান্ডা হতে সময় দেওয়া উচিত।
অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে রাতেই গোসল করা ভালো
বোর্ড সার্টিফায়েড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ড. শামসা কানওয়াল বলেন, যাদের মৌসুমি অ্যালার্জি, সংবেদনশীল ত্বক বা একজিমা রয়েছে, তাদের জন্য রাতের গোসল বেশি উপকারী হতে পারে।
দিনভর বাইরে থাকার সময় চুল ও ত্বকে পরাগরেণু, ধুলো, ঘাম ও নানা ধরনের অ্যালার্জির উপাদান জমে যায়। রাতে গোসল করলে এগুলো ধুয়ে যায় এবং বালিশ বা বিছানায় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে।
বায়োহ্যাকবিস্টের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড পুয়ানদায়েভ বলেন, চুলে জমে থাকা ধুলো বা পরাগরেণু রাতে শ্বাসনালীর কাছে চলে এলে নাক বন্ধ হওয়ার সমস্যা বাড়তে পারে এবং ঘুমও ব্যাহত হতে পারে।
গরম পানির বাষ্প নাকের পথও কিছুটা খুলে দেয়, ফলে সহজে শ্বাস নেওয়া যায়।
ত্বকের জন্যও রাতের গোসল ভালো
বোর্ড সার্টিফায়েড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ড. পুরভিশা প্যাটেল বলেন, রাতে গোসল করলে সারাদিনের ময়লা, ঘাম ও দূষণ ত্বক থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়।
আরেকটি বড় সুবিধা হলো, রাতে ব্যবহার করা ময়েশ্চারাইজার বা অন্যান্য ত্বকের যত্নের পণ্য দীর্ঘ সময় ত্বকে থাকে। এতে সেগুলো আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারে।
গোসলের পর হালকা ভেজা ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বকের আর্দ্রতাও দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সহজ হয়।
চুলের জন্য সকাল নাকি রাত?
এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই।
ক্রিস্টিন ম্যাকমিলান বলেন, চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা। সকাল বা রাতে গোসল করলেন, সেটি তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের খুশকি, অতিরিক্ত তৈলাক্ত মাথার ত্বক, সোরিয়াসিস, ফলিকুলাইটিস বা চুল পড়ার সমস্যা রয়েছে, তাদের অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম শ্যাম্পু করার অভ্যাস থাকে। অথচ নিয়মিত পরিষ্কার মাথার ত্বক অনেক ক্ষেত্রেই বেশি স্বাস্থ্যকর।
তবে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। ভেজা চুল নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া উচিত নয়।
কারণ ভেজা অবস্থায় চুল সবচেয়ে দুর্বল থাকে। দীর্ঘ সময় মাথার ত্বক ভেজা থাকলে কিছু স্ক্যাল্পের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
যদি রাতে গোসল করতে ভালো লাগে কিন্তু চুল শুকাতে বেশি সময় লাগে, তাহলে রাতে শুধু শরীর ধুয়ে সকালে চুল ধুতে পারেন। অথবা ঘুমানোর আগে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে অন্তত চুলের গোড়া শুকিয়ে নিন।
মানসিক চাপ কমাতেও রাতের গোসল কার্যকর
দিনের ব্যস্ততা শেষে হালকা গরম পানিতে গোসল অনেকের কাছেই স্বস্তির অনুভূতি এনে দেয়।
ড. শামসা কানওয়াল বলেন, এটি মানসিকভাবে শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করে। তবে খুব বেশি গরম পানি ব্যবহার করা উচিত নয়। অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের স্বাভাবিক তেল কমিয়ে ত্বককে শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
গোসলের সময় যেসব বিষয় মাথায় রাখবেন
সঠিক সময়ে গোসল করলেও কিছু ভুল অভ্যাস ত্বক ও চুলের ক্ষতি করতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেন।
- গোসল ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করুন।
- খুব গরম নয়, হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।
- ত্বক সংবেদনশীল হলে মৃদু ও সুগন্ধিবিহীন ক্লিনজার ব্যবহার করুন।
- প্রতিদিন জোরে ঘষে ত্বক পরিষ্কার করার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
- গোসলের পর আলতোভাবে শরীর মুছে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
- জীবনযাপন অনুযায়ী মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখুন। বেশি ঘাম হলে বা স্টাইলিং পণ্য ব্যবহার করলে প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি শ্যাম্পু করতে হতে পারে।
- গোসলের পর যদি ত্বক খুব টানটান লাগে, তাহলে বুঝতে হবে আপনার গোসলের পদ্ধতি বা ব্যবহৃত পণ্য ত্বকের জন্য বেশি কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সকালের গোসল আপনাকে দিন শুরু করতে শক্তি ও সতেজতা দিতে পারে। অন্যদিকে রাতের গোসল ভালো ঘুম, সুস্থ ত্বক, পরিষ্কার মাথার ত্বক এবং অ্যালার্জির সমস্যা কমাতে বেশি উপকারী হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত পরিচ্ছন্ন থাকা এবং এমন সময় গোসল করা, যা আপনার জীবনযাপন ও শরীরের চাহিদার সঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে মানিয়ে যায়।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট






