দুই দিনের ব্যবধানে আবারও বাড়ল তেলের দাম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে তেল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (১ জুলাই) সকাল ৯টা ৩৯ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৩ সেন্ট বা ০ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৭৩ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। রোববার (২৮ জুন) আগের দামের সঙ্গে ০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৭২ দশমিক ২০ ডলার হয়েছিল।
এদিকে বুধবার একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৪ সেন্ট বা ০ দশমিক ব্যারেল প্রতি ৬৯ দশমিক ৮৪ ডলারে পৌঁছেছে।
তেল বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভান্দা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এটি অসম, অপ্রত্যাশিত এবং পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়...। যতক্ষণ না ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে নতুন কোনো সমঝোতা হচ্ছে, ততক্ষণ বাজারে মন্দা ভাব ফিরে আসার আগে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বাজার হয়তো অপেক্ষা করবে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
এর আগে মঙ্গলবার (৩০ জুন) হোয়াইট হাউস এই আলোচনাকে উচ্চ স্তরের বলে বর্ণনা করেছে। তবে ইরান এবং বৈঠকের স্বাগতিক দেশ কাতার জানিয়েছে, ইরানিরা নিজেরা সরাসরি বসার চেয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবে।
কাতার নিশ্চিত করেছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল-থানি মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে এই মধ্যস্থতা বৈঠকে উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন।
চলতি বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের (কোয়ার্টার) মধ্যে ব্রেন্টের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৪৫ ডলার কমেছিল, যা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রান্তিক পতন। অন্যদিকে, মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩১ ডলার কমেছিল, যা ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা মারাত্মকভাবে ধসে পড়ার পর সবচেয়ে বড় প্রান্তিক পতন হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
মূলত মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত অবসানের দিকে কিছুটা অগ্রগতি হওয়ার ফলেই দামের এই পতন ঘটেছিল, যা এর আগে যুদ্ধাবস্থার কারণে হওয়া চড়া মূল্যবৃদ্ধিকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবার বিশ্লেষকেরা ২০২৬ সালের জন্য তেলের দামের পূর্বাভাস কমিয়েছেন। টানা পাঁচ মাস বাড়ার পর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার উদ্বেগ কমে আসায় এই পূর্বাভাস কমানো হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দ্য মাইকেল নোলস শো-তে জানিয়েছেন, ইরানকে এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল বা শুল্ক আদায় করা থেকে বিরত রাখা হবে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে শেষ হবে না যেখানে ইরানিরা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে টোল আদায় করবে।
বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে ট্যাংকার চলাচল পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে দাবি করে ভ্যান্স বলেন, প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ইতোমধ্যে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে।
এদিকে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেলের মজুদ কমে যাওয়াকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। মঙ্গলবার প্রকাশিত আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্যের বরাত দিয়ে বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুদ আবারও কমেছে এবং সেই সঙ্গে গ্যাসের মজুদও হ্রাস পেয়েছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২৬ জুন সমাপ্ত সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের মজুদ ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল কমেছে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুদের সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হবে। এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববাজারে তেলের দামের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হবে।





