কমছে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র যমুনার পানি, তীব্র স্রোতে বাড়ছে ভাঙন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, গাইবান্ধা
কমছে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র যমুনার পানি, তীব্র স্রোতে বাড়ছে ভাঙন
নদীর পানি কমলেও স্রোতে ভেঙে যাচ্ছে ফসলি জমি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে উত্তরের জনপদ গাইবান্ধায় বন্যার তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়াসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি কখনও বাড়ে আবার কখনও কমে। পানি কমা-বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে স্রোতের তীব্রতা। ফলে বেড়েছে নদীভাঙন। তারপর আবার পানির চাপে তিস্তার ৪৪টি গেট খুলে দিয়েছে তিস্তা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ।

Advertisement

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টা গাইবান্ধা জেলায় ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। জেলার সব নদীর পানি কমলেও করতোয়া নদীর পানি ২৪ ঘণ্টায় ১১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সব নদীর পানি এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার সাত উপজেলায় ৪৫ হেক্টর আউশ, ৩০ হেক্টর পাট, ২৫ হেক্টর তিল, ৮ হেক্টর আমন বীজতলা ও ১০ হেক্টর শাকসবজিসহ মোট ১১৮ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পচে গেছে।

বুধবার (১ জুলাই) সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত চরগুলোতে পানি কিছুটা কমছে। তবে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। এ ছাড়া পানি বাড়ার ফলে চরের বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেলে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. মাসুদুর রহমান মোল্লা গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ভাঙনকবলিত একটি স্থান পরির্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন।

এদিকে সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজের ২০০ মিটার ধসে গেছে। এ ছাড়া হুমকিতে রয়েছে কয়েকটি গ্রাম।

সাঘাটার হলদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কাদের মল্লিক বলেন, নদী ভাঙতে, ভাঙতে এই ইউনিয়নের ৮০ ভাগ বিলীন হয়ে গেছে। যদি সরকার দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কাজ না করে, এই ইউনিয়নটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হবে।

তীব্র ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ফজলুপুর, রসুলপুর ও উড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম। গত সাত দিনে শতাধিক বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে ফসলি জমি, গাছ-পালাসহ অনেক ক্ষতি হয়েছে।

ফজলুপুর ইউনিয়নের জালাল উদ্দন বলেন, আমরা কখনোই সুখ পাইনি। নদীভাঙনের স্বীকার হয়ে জমাজমি হারাতে হয়েছে। এখনও নদীর কড়াল গ্রাসে মানবেতর জীবনযাপন করছি।

উরিয়া ইউনিয়নের কাদের আলী বলেন, যখন যে এমপি হন, বরাদ্দ নেন কাজের কোনো খবর নেই। আমাদের নদীভাঙন প্রতিরোধে কেউ স্থায়ী সমাধান দিতে পারেননি।

তিস্তা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ফুলছড়ি উপজেলায় নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে ভাঙনের শিকার হয়ে পাটক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসল নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানা গেছে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নসহ তিস্তা নদীবেষ্টিত এলাকায় এক সপ্তাহে তীব্র ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক বসতভিটা, আবাদি জমি ও রাস্তাঘাট। বর্তমানে ভাঙনের মুখে পড়েছে আরও শত শত পরিবারের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ডান তীরের পুরোনো বেড়িবাঁধসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।

হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজারের বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, আমরা যে কোনো জেলার মানুষ কেউ জানে না। কারণ নদীভাঙন রোধে গাইবান্ধা যোগাযোগ করলে কুড়িগ্রাম যেতে বলে, আর কুড়িগ্রাম যোগাযোগ করলে গাইবান্ধা যেতে বলে। কারণ এই স্থানে কাজের জন্য কোনো জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড আসতে চায় না। জেলা শহর থেকে অনেক দূরে। তাই আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে সাহয্যা চাইতে পারি না।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফ্ফাত জাহান তুলি বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দের চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে।

সাঘাটার ইউএনও আশরাফুল কবীর বলেন, সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের নদীভাঙন-কবলিত এলাকা পরিদর্শনসহ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালন মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, এক মাসে নদীবেষ্টিত বিভিন্ন চরের ১১৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। পানি কমা-বাড়ার ফলে পাটক্ষেতসহ বেশ কিছু ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে এসব ক্ষতির তালিকা করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা কাউনিয়া (সুন্দরগঞ্জ) পয়েন্টে পানি ১৩ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঘাঘট নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাখালি পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় ১১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিপৎসীমার ২৬০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গাইবান্ধায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, পানি কমা-বাড়ার সঙ্গে জেলার সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জে ২৫টি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করছি।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, নদীভাঙন প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে সহযোগীতা অব্যাহত আছে। তালিকা অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে।