ইবিতে নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে প্রার্থীর স্বামীর সাক্ষাৎ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বিএনপিপন্থি নতুন প্রশাসনের প্রথম শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ পাওয়া এক প্রার্থীকে ঘিরে স্বজনপ্রীতি ও নানা একাডেমিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগপ্রাপ্ত প্রার্থী প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য হয়েছিলেন এবং ৩য় ও ৪র্থ বর্ষে ইমপ্রুভমেন্ট দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি একই বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী এবং তিনি বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন জিয়া পরিষদের নেতা। নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন তিনি বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনাকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ বলে অন্য প্রার্থীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে অভিযোগগুলো ব্যক্তিগতভাবে যাচাই করে দেখার কথা জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান।
জানা গেছে, গত ১৪ মে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান। দায়িত্ব নিয়েই শিক্ষক সংকট কাটাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। এ সময় আওয়ামী আমলের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। এরই মধ্যে তিনটি বিভাগে চারজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইসিটি বিভাগে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজা নাজনীন বিভাগটির প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে নতুন প্রশাসনের প্রথম নিয়োগকে ঘিরে স্বজনপ্রীতিসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সূত্রে জানা গেছে, ফিরোজা নাজনীন প্রথম বর্ষে ১০৩ ও ১০৫ নম্বর কোর্সে ইমপ্রুভমেন্ট এবং ১০২ নম্বর কোর্সে রিটেক পরীক্ষা দিয়ে ৩ দশমিক ৩৮ সিজিপিএ অর্জন করেন। দ্বিতীয় বর্ষে ২০৬ নম্বর কোর্সে ইমপ্রুভমেন্টের পর তার সিজিপিএ হয় ৩ দশমিক ৪২। তৃতীয় বর্ষে ৩০২ নম্বর কোর্সে ইমপ্রুভমেন্ট দিয়ে সিজিপিএ দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৬৪। চতুর্থ বর্ষে কোনো রিটেক বা ইমপ্রুভমেন্ট ছাড়াই তিনি ৩ দশমিক ৮৪ সিজিপিএ অর্জন করেন। সব মিলিয়ে রিটেক ও ইমপ্রুভমেন্টের ফল যুক্ত করে তার চূড়ান্ত সিজিপিএ হয় ৩ দশমিক ৫৯। তবে ইমপ্রুভ ও রিটেক পরীক্ষার ফল যুক্ত না করলে তার চূড়ান্ত সিজিপিএ হতো ৩ দশমিক ৪২। এ ছাড়া মাস্টার্সে তার সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক ৬৪। ৩য় ও ৪র্থ বর্ষে থাকাকালে তার স্বামী ড. জাহিদুল ইসলাম বিভাগটির পরীক্ষা কমিটির সভাপতি হন। এজন্য ১ম ও ২য় চেয়ে ৩য় ও ৪র্থ বর্ষে তার রেজাল্ট ও সিজিপিএ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন।
এদিকে নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে। ফিরোজার স্বামী ড. জাহিদুল ইসলাম একই বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন জিয়া পরিষদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। পরবর্তীতে তিনি ফিরোজাকে ২০১২ সালে বিয়ে করেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ড. জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, তাদের বিয়ে হয়েছে ২০১৪ সালে এবং পরীক্ষার ফলাফলে তার কোনো ধরনের প্রভাব ছিল না। তবে তার কাছে বিয়ের কাবিননামা চাইলে তিনি দিতে চাননি।
এ ছাড়া নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন (২৮ জুলাই) ফিরোজা নাজনীনের স্বামী ও আইসিটি বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম নিয়োগ বোর্ডের এক্সপার্ট সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করেন। কুষ্টিয়ার দিশা টাওয়ারে এই সাক্ষাৎ হয়। একই স্থানে আইসিটি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. তারেক হাসান আল মাহমুদও গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনাকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করে অন্য প্রার্থীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তারা বলেন, নিয়োগ বোর্ডের সদস্যের সঙ্গে কোনো প্রার্থীর স্বামীর যেকোনো ধরনের সাক্ষাৎ গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো প্রার্থীর স্বামী যদি নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্যের সঙ্গে গোপনে সাক্ষাৎ করেন, তাহলে তা নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একজন এক্সপার্ট প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে নিয়োগ বোর্ডের অনেক কাজ করেন। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তবে এক্সপার্ট চৌধূরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে সেখানে গিয়েছিলেন বলে সাংবাদিকদের জানান ড. জাহিদুল ইসলাম।
এ বিষয়ে নিয়োগ বোর্ডের (এক্সপার্ট) বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদ বলেন, ‘শুধু ড. জাহিদুল ইসলামের সঙ্গেই নয়, সেদিন আরও অনেক শিক্ষকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। ড. জাহিদের সঙ্গে আমার ২০১৯ সাল থেকে পরিচয়। আমরা গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে ক্লাস নিয়েছি। এ ছাড়া দুজনই দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পিএইচডি করেছি। তাই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়াটা স্বাভাবিক নয় কি? তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তবে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। যারা এ নিয়ে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিষয়েও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা হওয়া উচিত।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামকে একাধিকবার কল করলেও তা রিসিভ করেননি। তবে এর আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নিয়োগ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। রিটেক বা ইমপ্রুভমেন্ট কোনো অভিযোগের বিষয় নয়, এগুলো নথিভুক্ত থাকে। ফিরোজা নাজনীন ছাত্রী থাকাকালে পরীক্ষা কমিটির সদস্য ছিলাম, তবে বিয়ের সময় কোনো কমিটিতে ছিলাম না এবং তার কোনো ক্লাসও নিইনি। ২০১২ সালে পিএইডি শেষে দেশে ফিরে পরে ২০১৪ সালে আমাদের বিয়ে হয়।
ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, পরীক্ষা কমিটিতে একাধিক সদস্য থাকেন এবং একজন শিক্ষক এককভাবে ফলাফল নির্ধারণ করেন না। বরং আমার সঙ্গে বিয়ের কারণে ফিরোজা থিসিস পায়নি এবং মাস্টার্সেও কম নম্বর পেয়েছেন।
এদিকে নিয়োগকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, যে নিয়োগটির বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেটি আমি একান্তভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখব।





