‘আমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখ, কত মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছি’

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
‘আমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখ, কত মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছি’
মো. বাপ্পী আহম্মেদ (বাঁয়ে) ও এসআই মো. বিলায়েত হোসেন (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত

‘আমার সম্পর্কে সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ থানায় খোঁজ নিয়ে দেখ, কত মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছি। আমার কথা না শুনলে তোকে জেলে ভরে দেব, দিনের আলো দেখতে দেব না’—এভাবেই ভালুকা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. বিলায়েত হোসেন ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন ময়মনসিংহের ভালুকার হবিরবাড়ী এলাকার ডাল-পুরি বিক্রেতা মো. বাপ্পী আহম্মেদ।

তিনি আরও জানান, হুমকি দিয়েই এই পুলিশ কর্মকর্তা নীরব থাকেননি। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা আদায় এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তাকে একটি মাদক মামলায় পলাতক আসামি করা হয়েছে।

একপর্যায়ে এ ঘটনা গড়িয়েছে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজির দপ্তরে। গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) নিজের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়ার অভিযোগে ডিআইজির দপ্তরে এসআই মো. বিলায়েত হোসেন, এএসআই মেহেদী হাসান, এএসআই তোফাজ্জল হোসেন, এএসআই সালাউদ্দিন ও এএসআই আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দুই পাতার লিখিত অভিযোগ করেছেন বাপ্পী আহম্মেদ। অভিযোগপত্রের অনুলিপি এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে।

ঘটনা সম্পর্কে বাপ্পী আহম্মেদ এশিয়া পোস্টকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ছোট একটি ডাল-পুরির দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন বাপ্পী। বিভিন্ন সময় পুলিশ সদস্যরা তার দোকানে এসে এলাকার নানা ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য নিতেন। পরিচিত মানুষ হিসেবে তিনি যেটুকু জানতেন, সেটুকুই জানাতেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে এসআই বিলায়েত হোসেন তার সঙ্গে আলাদা করে যোগাযোগ শুরু করেন।

অভিযোগপত্রের তথ্য অনুসারে, একদিন হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে বাপ্পীকে থানায় ডেকে পাঠান। থানায় পৌঁছানোর পর এসআই বিলায়েত তাকে দেখেই বলেন, ‘তোকে হেরোইন দিয়ে মামলা দেব।’ তিনি নিজের অপরাধ জানতে চাইলে এসআই বিলায়েত বলেন, ‘আমি গোপালগঞ্জের লোক। ঢাকা জেলার সাভার-আশুলিয়ায় থাকাকালে তোর মতো বহু মানুষকে মাদক মামলায় ঢুকিয়েছি। মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকতে হবে না, আমি জড়িত বানিয়ে দিতে পারি।’

আলোচনার এক পর্যায়ে এসআই বিলায়েত তার কাছে প্রস্তাব দেন, ‘হবিরবাড়ী ইউনিয়নের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক টাকা তোলার ব্যবস্থা করতে। আমার বিটের যত মাদক ব্যবসায়ী আছে, তাদের সঙ্গে মাসিক খরচের ব্যবস্থা করে দাও। এতে তোমারও লাভ হবে, আমারও লাভ হবে।’

বাপ্পী দাবি করে বলেন, তিনি এসব কাজে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানালে এসআই বিলায়েত ক্ষিপ্ত হয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং বলেন, ‘তুই কেমনে এলাকায় থাকস, আমি দেখব। আমার সম্পর্কে সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ থানায় খোঁজ নিয়ে দেখ, কত মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছি।’

ময়মনসিং রেঞ্জ ডিআইজির কাছে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘ফেসবুকে গত ২৩ জুন বিকেলে দেখতে পাই, বিউটিফুল ভালুকা নামক পেজে মো. সবুজ মিয়া নামক ব্যক্তিকে ৩২৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও নগদ ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকাসহ এসআই বিলায়েত হোসেন গ্রেপ্তার করেন। সকালে ৩২৪ পিস ইয়াবা ২০ পিস হয়ে যাওয়ায় শিরোনামে নিউজ দেখতে পাই। পরের দিন (২৪ জুন) আমি জানতে পারি এসআই বিলায়েত হোসেন নিজে বাদী হয়ে মো. সবুজ মিয়ার সহযোগী হিসেবে আমাকে পলাতক আসামি করেছে। যা ভালুকা থানার মামলা (৩৭(৬)২৬) জিআর ২২৯ (২৩/০৬/২৬ইং)। আরও খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, মামলার সাক্ষী সোহেল মিয়া ও দুলাল মিয়া। তারা বিলায়েত স্যারের ভাড়া করা সিএনজির ড্রাইভার। যে সিএনজি করে তারা সবুজের বাড়িতে গিয়েছে।’

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ‘আমি ঘটনাস্থলে না থেকেও এজাহারের ভাষ্যমতে দৌড়ে পালালাম কীভাবে? দৌড়ে পালালে আমার বাসায় খুঁজতে বা গ্রেপ্তার করতে কেন গেলেন না? তারা আমাকে ঘটনাস্থলে দেখেননি, কিন্তু সবকিছুই জানেন। এসআই বিলায়েত হোসেন ও সঙ্গীয় অফিসারসহ মো. সবুজ মিয়াকে রাত ৪টার দিকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যান, যা বাড়ির সিসি ফুটেজে দেখা গেছে। কিন্তু জব্দতালিকায় সময় দেখিয়েছেন ভোর পৌনে ৬টা। গত ২২ জুন আমি আমার বাসায় রাত ৯টা ২২ মিনিটে ঢুকেছি এবং ২৩ তারিখ সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঘুম থেকে উঠি। যা আমার বাসায় সিসি ফুটেজ আছে, এর মধ্যে আমি এক মুহূর্তের জন্যও বাসার বাইরে যাইনি।’

ডিআইজির কাছে দেওয়া অভিযোগে বাপ্পী লিখেছেন, থানার সিসিটিভি ফুটেজ, তার মোবাইলের সিডিআর, বাসার সিসিটিভি এবং সংশ্লিষ্ট আলামত যাচাই করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তিনি মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পাবেন এবং এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বাপ্পী।

এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মো. বিলায়েত হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাপ্পীর নামে কোনো মামলা নেই। তবে সে সিন্ডিকেট করে টাকা ওঠায় এবং যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বলছে বাপ্পী তার সঙ্গে ছিল। এ ছাড়া বাপ্পী বিভিন্ন লোক দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলায়। কথা বলানোর পর বিভিন্ন কিছু ভিডিও রেকর্ড করে, সেসব ভিডিও তার কাছে আছে।

তার বিরুদ্ধে ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিলায়েত বলেন, ‘আমার নামে কোথাও কোনো অভিযোগ নেই।’

‘আমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখ, কত মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছি এবং “সমঝোতা” না করায় মাদক মামলায় ফাঁসানো হবে’, বাপ্পীর এসব অভিযোগসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রশ্না করলে এসআই বিলায়েত বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।