ভারত ভ্রমণের পর নারীর মস্তিষ্কে মিলল ৩৮টি পরজীবী

তিন মাসের জন্য ভারতে ঘুরতে গিয়েছিলেন এক ব্রিটিশ নারী। কিন্তু কে জানত, সেই ভ্রমণই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে! ভারত থেকে ফেরার পর তার মস্তিষ্কে বাসা বাঁধে ৩৮টি ভয়ংকর পরজীবী। যার জেরে তীব্র মাথাব্যথা, খিঁচুনি থেকে শুরু করে তীব্র মানসিক বিভ্রমের (সাইকোসিস) মতো মারাত্মক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
বুধবার (১ জুলাই) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম লোরি ডেনম্যান (৪২)। তিনি পেশায় একজন মিডিয়া কর্মী।
লোরি জানান, ২০০৭ সালে তিন মাসের জন্য ভারত ভ্রমণে গিয়েছিলেন তিনি। সংক্রামক রোগ ও অণুজীববিজ্ঞানের পরামর্শক চিকিৎসক ড. ব্র্যান্ডন হিলির ধারণা, ওই ভ্রমণের সময়ই লোরি ‘নিউরোসিস্টাইসারকোসিস’ নামের এই বিরল ও মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হন। ভ্রমণে গিয়ে যাতে খাদ্য বিষক্রিয়া (ফুড পয়জনিং) না হয়, সেজন্য লোরি মাংস খাওয়া থেকে বিরত ছিলেন। তবে ড. হিলির অনুমান, অসাবধানতাবশত তিনি এমন কোনো খাবার খেয়েছিলেন, যাতে শূকরের ফিতাকৃমির ডিম ছিল।
প্রথম যেভাবে ধরা পড়ে
ভ্রমণের তিন বছর পর, ২০১০ সালে একটি রেস্তোরাঁর শৌচাগার ব্যবহারের সময় লোরি প্রথম তার শরীর থেকে এক মিটার লম্বা একটি ফিতাকৃমি বের হতে দেখেন। ভয়ংকর সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে লোরি বলেন, ‘এটি দেখতে অত্যন্ত বিরক্তিকর ছিল, ঠিক যেন খাঁজকাটা সেলোটেপের মতো।’ তখনই তিনি বুঝতে পারেন, তার শরীরে বড় কোনো সমস্যা হয়েছে। তবে সে সময় মলের নমুনা পরীক্ষায় ফল সন্তোষজনক আসায় বিষয়টি নিয়ে তিনি আর মাথা ঘামাননি।
কৃমি দেখার এক বছরের মধ্যে লোরির তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়। ২০১১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো গুরুতর খিঁচুনির শিকার হন। লোরি বলেন, ‘আমি কথা বলতে গিয়ে আটকে যাচ্ছিলাম। এরপর যখন আমার জ্ঞান ফেরে, দেখি আমি অ্যাম্বুলেন্সে। ভাবছিলাম, কেন এমন হলো?’

হাসপাতালে ক্যাট স্ক্যান এবং এমআরআই করার পর চিকিৎসকেরা লোরিকে জানান, তার মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী বাসা বেঁধেছে। এই খবর শুনে লোরি ও তার মা স্তব্ধ হয়ে যান। হাসপাতালে দুই সপ্তাহ চিকিৎসার পর অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক (পরজীবীনাশক) ওষুধ এবং স্টেরয়েড দেওয়া হলে তিনি সাময়িকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
স্মৃতিভ্রম ও পাঁচ বছর বয়সীর মতো আচরণ
কয়েক বছর সুস্থ থাকার পর হঠাৎ একদিন কর্মক্ষেত্রে লোরি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। স্ক্যানে দেখা যায়, মৃতপ্রায় পরজীবীগুলোর চারপাশে তার মস্তিষ্কে বিশাল ফোলা অংশ তৈরি হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি প্রায়ই বিভ্রান্ত হয়ে পড়তেন, শরীর অবশ হয়ে আসত। বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন লোরি।
প্রায় ছয় সপ্তাহ একটি নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে কাটানো লোরি বলেন, ‘আমার মধ্যে তীব্র প্যারানয়া এবং সাইকোসিস ভর করেছিল। প্রচণ্ড উদ্বেগ ও প্যানিক অ্যাটাক হতো।’ লোরির ২০ বছরের পুরোনো বান্ধবী নিকোলা ব্রাউন হাসপাতালে তার এই আশঙ্কাজনক অবনতি দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। নিকোলা বলেন, ‘আমি ঘরে ঢুকে দেখলাম সে বাচ্চাদের মতো আচরণ করছে। মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে, পর্দার আড়ালে লুকাচ্ছে, বাবার কোলে এমনভাবে বসে আছে যেন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর।’
বর্তমান অবস্থা
বছরের পর বছর এই শারীরিক লড়াইয়ের পর লোরির মস্তিষ্কের পরজীবীগুলো এখন ক্যালসিফাইড (নিষ্ক্রিয় ও শক্ত) হয়ে গেছে। লোরি জানান, মস্তিষ্ক থেকে এগুলো বের করার জন্য কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এগুলো এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সব ডিম ধ্বংস করার পর ২০১৭ সালের পর লোরির আর কোনো খিঁচুনি হয়নি। তিনি এখন বিপদমুক্ত হলেও, চিকিৎসকদের পরামর্শে সারাজীবন তাকে মৃগীরোগের (এপিলিপসি) ওষুধ খেয়ে যেতে হবে।




