নাগরিকদের বেশি সন্তান নিতে প্রণোদনা দিচ্ছে এশিয়ার আরেক দেশ

দীর্ঘদিনর দুই-সন্তান নীতি বাতিলের এক বছর পর জন্মহার বাড়াতে নতুন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম। দ্রুত কমে আসা জন্মহার ও ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তির সংকট ও অর্থনীতির ওপর চাপের আশঙ্কা থেকেই এই উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও ভুটানের দেখানো পথেই হাঁটল এশিয়ার এই দেশটিও।
বুধবার (০১ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া নতুন জনসংখ্যা আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, দ্বিতীয় সন্তানের মায়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে সাত মাস করা হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা এবং প্রসবপূর্ব ও নবজাতকের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
রাজধানী হ্যানয়ের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী নগুয়েন কিম বিচ জানান, দ্বিতীয় সন্তান নিলে তিনি এক মাস অতিরিক্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি, বিনামূল্যে প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নগদ বোনাস পাবেন। তিনি আরও বলেন, আমি শিশুর সঙ্গে আরও একমাস বাড়িতে থাকতে পারব। আমার স্বামীও কয়েক দিন বেশি সময় বাড়িতে থাকতে পারবে।
নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী মায়েদের এককালীন সর্বোচ্চ ২২৮ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বোনাস দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ হাজার ১০০ টাকা। এই অর্থ দেশটির গড় মাসিক বেতনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান।
তবে বিচ ও তার স্বামী লাইয়ের কাছে সরকারি প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। হিসাবরক্ষক ও বিজ্ঞাপন পেশাজীবী এই দম্পতির সম্মিলিত মাসিক আয় প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার। এর প্রায় অর্ধেকই তাদের প্রথম সন্তানের পেছনে ব্যয় হয়। তারা লাইয়ের বাবা–মায়ের সঙ্গে একটি ছোট বাড়িতে থাকেন।
বিচ বলেন, ‘সুবিধাগুলো ভালো, কিন্তু যথেষ্ট নয়। অতিরিক্ত এক মাস ছুটি আর ৭৫ ডলারের মতো বোনাস আমাদের দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে পারে না।’
তবে বোনাসেও মন বদলাচ্ছে না অনেকের। কারণ সাম্প্রতিক এক সরকারি জরিপে দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ বিবাহিত ব্যক্তি বলেছেন, তাদের আয় সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
হ্যানয়ের ২৪ বছর বয়সী ক্যাশিয়ার ত্রান মিন আনের মাসিক আয় প্রায় ৩৮০ মার্কিন ডলার। তিনি বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই সন্তান নেব না। এটা আর্থিক ও মানসিকভাবে খুব বেশি চাপের। আরেকজনের দায়িত্ব আমি কীভাবে নেব? কোনোভাবেই না।’
ভিয়েতনামে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ফাম থি লান বলেন, ‘এটি নীতিগতভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন। এখন পরিবার পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে জনসংখ্যার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, নতুন আইন বর্তমান জনসংখ্যাগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দম্পতিদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এককালীন নগদ বোনাস দিয়ে মানুষের সিদ্ধান্ত বদলানো কঠিন। সন্তান জন্মের পর দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, সাশ্রয়ী আবাসন এবং শিশুযত্নের সুবিধা নিশ্চিত না হলে অনেক দম্পতিই সন্তান নিতে আগ্রহী হবেন না।
গত বছর পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের তৃতীয় সন্তান নিলে শাস্তির মুখে পড়তে হতো। তবে এখন দেশটি ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। গড় আয়ু বাড়ছে, কিন্তু জন্মহার কমছে। ফলে বিশ্বের দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর একটি হয়ে উঠছে ভিয়েতনাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন সাম্প্রতিক উন্নয়নের প্রতিফলন হলেও ভবিষ্যতে শ্রমিক সংকট তৈরি করতে পারে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। নতুন জনসংখ্যা আইনের লক্ষ্য এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের গতি কমিয়ে আনা।
দ্রুত বার্ধক্যের পথে দেশ
ভিয়েতনামে দুই-সন্তান নীতির সূচনা ১৯৬০-এর দশকে। যুদ্ধের সময় উত্তর ভিয়েতনামের কর্তৃপক্ষ জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এ নীতি গ্রহণ করে। ১৯৮৮ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। তবে প্রতিবেশী চীনের এক-সন্তান নীতির মতো কঠোরভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। চীনে সে সময় জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ ও গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটেছে।
বর্তমানে ভিয়েতনামের জন্মহার নারীপ্রতি ১ দশমিক ৯৩, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ২ দশমিক ১-এর নিচে। তবে এই হার এখনও দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের তুলনায় বেশি। একই সময়ে দেশটির গড় আয়ু বেড়ে প্রায় ৭৫ বছরে পৌঁছেছে। ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের হার ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংক্যঅর ২৫ শতাংশে পৌঁছাবে। এরপর জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উদ্বেগের বিষয় হলো, ভিয়েতনাম ধনী হওয়ার আগেই দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। দেশটি এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি হলেও মাথাপিছু জিডিপি মাত্র পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছিল, বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার জন্য ভিয়েতনামের হাতে খুবই সীমিত সময় রয়েছে।
এশিয়ার যেসব দেশ প্রণোদনা দেয়
দক্ষিণ কোরিয়া: সন্তান জন্মের পর নগদ প্রণোদনা, মাসিক ভাতা এবং গৃহায়ণ সুবিধা দেওয়া হয়। প্রথম সন্তানের জন্য ২ মিলিয়ন ওন ক্যাশ ভাউচার এবং প্রথম দুই বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে ১ মিলিয়ন ওন (কোরিয়ান মুদ্রা) করে ‘অভিভাবক ভাতা’ প্রদান করা হয়।
চীন: জাতীয় পর্যায়ে তিন বছরের কম বয়সী প্রতিটি সন্তানের জন্য অভিভাবকদের বার্ষিক ৩ হাজার ৬০০ ইউয়ান নগদ সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, তৃতীয় সন্তানের জন্য বিভিন্ন স্থানীয় সরকার এককালীন আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকে।
সিঙ্গাপুর: দেশটিতে জন্মহার বৃদ্ধিতে নগদ বোনাস, ট্যাক্স ছাড় এবং দীর্ঘমেয়াদী মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
হংকং: নবজাতকের জন্য এককালীন ২০ হাজার হংকং ডলার নগদ বোনাস, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি আবাসন এবং প্রথম দুই বছরে অতিরিক্ত কর ছাড় দেওয়া হয়।
ভুটান: কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে যাওয়া রোধ করতে তৃতীয় বা তার বেশি প্রতিটি সন্তানের জন্য মাসিক ১০ হাজার গুলট্রাম নগদ ভাতার ঘোষণা দিয়েছে।
তাইওয়ান: ১ লাখ তাইওয়ানিজ ডলারের বেবি বোনাস এবং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে ৫ হাজার তাইওয়ানিজ ডলার ‘চাইল্ড গ্রোথ অ্যালাউন্স’ দেওয়া হয়।
সূত্র: এএফপি, সিএনএ






