কর দিচ্ছেন যারা, তাদের বার্ধক্যের নিরাপত্তা কি রাষ্ট্রের দায় নয়?

প্রতি মাসে বেতনের একটি বড় অংশ আয়কর হিসেবে রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হয়। একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত করদাতার জন্য এটি কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দেশের উন্নয়নে তার সরাসরি অবদান।
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী প্রতি মাসে যে পরিমাণ আয়কর পরিশোধ করেন, সেই সমপরিমাণ অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই তারা ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসেবে জমাতে পারেন না। সংসার পরিচালনা, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপের কারণে সেই অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রের কোষাগারে চলে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অবদানের বিনিময়ে কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে তারা কী ধরনের নিরাপত্তা পান?
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের পর পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং সময়ে সময়ে বেতন কাঠামো সংশোধনের মতো নানা সুবিধা পেয়ে থাকেন। নতুন পে-স্কেল ঘোষণা হলে তার সুফলও মূলত সরকারি কর্মচারীরাই ভোগ করেন। এটি স্বাভাবিক, কারণ রাষ্ট্র তাদের নিয়োগকর্তা।
কিন্তু দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতের লাখ লাখ কর্মজীবী, যারা নিয়মিত আয়কর দেন, তাদের জন্য অবসরের পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো নিরাপত্তা কাঠামো নেই। চাকরি শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ মানুষকে নির্ভর করতে হয় ব্যক্তিগত সঞ্চয় বা প্রতিষ্ঠানের সীমিত সুবিধার ওপর। অথচ বাস্তবতা হলো, সংসার পরিচালনা, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেকের পক্ষেই পর্যাপ্ত সঞ্চয় গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।
রাষ্ট্র যখন কর আদায় করে, তখন সেই করদাতার ভবিষ্যত নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত আয়কর পরিশোধ করেছেন, তাদের জন্য একটি অবসরকালীন নিরাপত্তা তহবিল, করদাতাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা বা বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি।
এটি কোনো বিশেষ সুবিধা দাবি নয়। এটি একজন দায়িত্বশীল করদাতার ন্যায্য প্রত্যাশা। কারণ কর শুধু রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব নয়, নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রেরও দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকার যদি নিয়মিত করদাতাদের জন্য এমন একটি কার্যকর অবসরকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে মানুষ আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে উৎসাহিত হবে। কর প্রদানের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে এবং এর ফলে সরকারের রাজস্ব আহরণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ এটি শুধু করদাতার জন্য নয়, রাষ্ট্রের জন্যও একটি লাভজনক বিনিয়োগ হবে।
একজন মানবসম্পদ (এইচআর) পেশাজীবী হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতের কর্মীদের সঙ্গে কাজ করছি। খুব কাছ থেকে দেখেছি, প্রতি মাসে আয়করের অর্থ পরিশোধ করেও ভবিষ্যত নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাদের মধ্যে কতটা হতাশা ও অনিশ্চয়তা কাজ করে। অনেকের কাছেই কর যেন একটি বাধ্যবাধকতা, কিন্তু এর বিপরীতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার প্রত্যাশা পূরণ হয় না। এই নীরব কষ্ট ও হতাশার প্রতি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব সহকারে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে। কর্মসংস্থান, রপ্তানি, শিল্পায়ন এবং রাজস্ব আহরণে এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত সরকারি ও বেসরকারি কর্মজীবীদের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নিয়মিত করদাতারা কর্মজীবনের শেষে সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাবেন।
সরকারের উচিত এই বিষয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং বছরের পর বছর নিয়মিত কর পরিশোধ করা লাখো বেসরকারি খাতের করদাতার এই নীরব কান্নার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। কারণ রাষ্ট্রের উন্নয়নের অংশীদার যারা, তাদের বার্ধক্যও নিরাপদ হওয়া উচিত। একজন নিয়মিত করদাতার জন্য এটুকু প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক নয়।





