মুদ্রানীতিতে অনুপস্থিত এক বড় ঝুঁকি

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট খেলাপি ঋণের হার ডিসেম্বর ২০২৪-এর ২০.২০ শতাংশ থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছানোর পর মার্চ ২০২৬ নাগাদ কিছুটা কমে ৩২.২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে— এই হ্রাসকে একটি ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাগত উন্নতি প্রকৃত কাঠামোগত স্থিতিশীলতার প্রতিফলন কিনা, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকে যায়।
হেজ, স্পেকুলেটিভ ও পঞ্জি অর্থায়ন
অর্থনীতিবিদ মিনস্কি ঋণগ্রহীতাদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন: হেজ অর্থায়নকারী, যারা নিজেদের নগদ প্রবাহ থেকে মূল ও সুদ উভয়ই পরিশোধ করতে সক্ষম; স্পেকুলেটিভ অর্থায়নকারী, যারা সুদ পরিশোধ করতে পারলেও মূল অর্থ পরিশোধের জন্য পুনঃঅর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল; এবং পঞ্জি অর্থায়নকারী, যারা সুদও পরিশোধ করতে পারে না এবং কেবল সম্পদমূল্য বৃদ্ধি বা নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে। মিনস্কির মূল সতর্কবার্তা ছিল— দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক স্থিতিশীলতা নিজেই ধীরে ধীরে অর্থনীতিকে হেজ থেকে স্পেকুলেটিভ এবং শেষ পর্যন্ত পঞ্জি অর্থায়নের দিকে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালাতেই এই প্রবণতার আলামত স্পষ্ট। মুদ্রানীতি বিবৃতি অনুযায়ী, শ্রেণিকৃত ঋণ পুনর্গঠনের কাঠামো এমনভাবে সংশোধন করা হয়েছে যাতে সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে, দুই বছর পর্যন্ত রেয়াতকালসহ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যায়, যা জুন ২০২৬ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সহায়তা সুবিধাসহ কার্যকর। একইসঙ্গে কৃষি ও সিএমএসএমই খাতে আদর্শ ও বিশেষ পর্যবেক্ষণাধীন হিসাবের জন্য নিম্নতর প্রভিশনিং হার ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়েছে। এই ধরনের ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন সুবিধা—যদিও স্বল্পমেয়াদে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের জন্য স্বস্তিদায়ক—প্রকৃতপক্ষে ‘এক্সটেন্ড অ্যান্ড প্রিটেন্ড’ কৌশলের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে প্রকৃত ঋণমান অবনতিকে প্রকাশ্যে স্বীকার না করে বারবার পুনঃতপশিলের মাধ্যমে বিলম্বিত করা হয়।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ও ‘টু বিগ টু ফেইল’ সমস্যা
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে উল্লেখিত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-র ক্ষেত্রে সরকার ২০,০০০ কোটি টাকা মূলধন যোগানের মাধ্যমে মোট পরিশোধিত মূলধন ৩৫,০০০ কোটি টাকায় উন্নীত করেছে। এই হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, মিনস্কীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাষ্ট্র বারবার দুর্বল প্রতিষ্ঠানের ত্রাণকর্তা হিসেবে অবতীর্ণ হয়, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে, যেখানে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও শেয়ারহোল্ডাররা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের পরিণতি থেকে কার্যত সুরক্ষিত বোধ করেন।
মিনস্কি দেখিয়েছিলেন যে, ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভের বারবার হস্তক্ষেপ ('Minsky moment' এড়ানোর প্রচেষ্টা) দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছিল, কারণ বাজার শৃঙ্খলার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ব্যাকস্টপের ওপর নির্ভরতা বেড়েছিল। ব্যাংক পুনর্গঠন ও অবসায়ন আইন ২০২৬ এবং আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হলেও, এই আইনগুলোর বাস্তবায়নে দৃঢ়তার অভাব হলে একই ধরনের নৈতিক ঝুঁকি পুনরাবৃত্ত হতে পারে।
৯ প্রতিষ্ঠান ও ছায়া-ঝুঁকি
মুদ্রানীতি বিবৃতি অনুযায়ী, ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক চাপের লক্ষণ পাওয়া গেছে, এবং পরবর্তী মূল্যায়নে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুতর মূলধন ঘাটতিতে চিহ্নিত করে ব্যাংক পুনর্গঠন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় কাঠামোগত সমাধান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই সংখ্যা ৩৫-এর মধ্যে ৯টি, অর্থাৎ প্রায় একচতুর্থাংশ- ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি সিস্টেমিক দুর্বলতা। মিনস্কির ভাষায় বলা যায়, একটি সম্ভাব্য ‘মিনস্কি মোমেন্ট’-এর পূর্বলক্ষণ— যেখানে সম্পদমূল্যের একটি আকস্মিক পুনর্মূল্যায়ন বা আস্থা সংকট সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
বিলম্বিত ঝুঁকি স্বীকৃতি: ইসিএল কাঠামোর ধীরগতি
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান-৯ (IFRS 9) অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি (Expected Credit Loss) কাঠামোতে সম্পূর্ণ রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের মধ্যে। বর্তমান নিয়মভিত্তিক প্রভিশনিং পদ্ধতি ভবিষ্যৎমুখী ঝুঁকি মূল্যায়নের পরিবর্তে অতীতমুখী ও প্রায়শই বিলম্বিত ক্ষতি স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল। ঝুঁকি স্বীকৃতিতে বিলম্ব ঠিক সেই ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করে যা প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্যকে আড়াল করে রাখে এবং সংকট যখন প্রকাশ পায়, তখন তার তীব্রতা আরও বেশি হয়। প্রায় ৩২ শতাংশ মোট খেলাপি ঋণের হার নিয়ে দুই বছরের অতিরিক্ত সময় নেওয়ার পরিবর্তে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দ্রুততর ঝুঁকি স্বীকৃতি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল আরও জরুরি ভিত্তিতে।
উপসংহার: সংখ্যাগত উন্নতির বাইরের বাস্তবতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিবৃতি খেলাপি ঋণের হার হ্রাসকে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উপস্থাপন করলেও, ৩২.২৬ শতাংশের এই হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এখনও একটি গুরুতর সংকটাবস্থা নির্দেশ করে, যেখানে সাধারণভাবে ৫ শতাংশের নিচের হারকে স্থিতিশীল বলে বিবেচনা করা হয়। মিনস্কির তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে, আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা কখনোই স্থায়ী অবস্থা নয়—এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া, যেখানে দীর্ঘায়িত স্বস্তি নিজেই পরবর্তী ভঙ্গুরতার বীজ বপন করে। ব্যাংক পুনর্গঠন আইন, আমানত সুরক্ষা তহবিল, এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু এগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দৃঢ়তা এবং ঝুঁকি স্বীকৃতিতে স্বচ্ছতার ওপর। মুদ্রানীতি বিবৃতিতে এই কাঠামোগত ভঙ্গুরতার গভীরতর বিশ্লেষণের অনুপস্থিতি একটি উল্লেখযোগ্য ঘাটতি, যা ভবিষ্যৎ নীতি প্রণয়নে অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক




