ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প/৮ দিন পর ধ্বংসস্তূপে থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার

ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় অবিশ্বাস্য এক উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে আট দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা একজনকে। টানা কয়েক দিন চেষ্টার পর উদ্ধারকারীরা ৪৩ বছর বয়সী হার্নান গিলকে (হার্নান গিল) ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের করে আনতে সক্ষম হন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) স্থানীয় সময় তাকে উদ্ধার করা হয়। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৩০০ জন মারা গেছেন। হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বহু ভবন ধসে পড়ে।
উদ্ধারকারীরা জানান, ভূমিকম্পের সময় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের উপকূলীয় শহর ক্যাটিয়া লা মারে অবস্থিত গালেরিয়াস প্লায়া গ্রান্দে শপিংমলের পাশের একটি সাততলা ভবনের পার্কিং এলাকার বেজমেন্টে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন হার্নান গিল।
তিনি একটি ছোট কংক্রিটের কক্ষে ছিলেন। ভবনটি ধসে পড়লেও ওই কক্ষটি নিরাপদ ছিল। প্রায় ১৪০ টন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
প্রথমে গত রোববার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ কণ্ঠে সাহায্যের আর্তনাদ শুনতে পান কোস্টারিকার রেড ক্রসের প্যারামেডিক অ্যালান মাদ্রিগাল।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম হয়তো ভুল শুনছি। তাই সহকর্মীকে ডেকে নিশ্চিত হতে বলি যে আমি ভুল শুনছি কি না।
এরপরই আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল গিলকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিযান শুরু করে।
গিলকে উদ্ধার করতে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হয়েছে। উদ্ধারকারীরা তার কাছে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ সুড়ঙ্গ ও প্রবেশপথ তৈরি করেন। তবে কাজ চলাকালে কয়েকবার সেই পথ ধসে পড়ে, ফলে উদ্ধারকারীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
চিলির এক দমকলকর্মী বলেন, আমার কর্মজীবনে এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জটিল এবং প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে কঠিন উদ্ধার অভিযান।
উদ্ধারকারীরা ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে গিলের কাছে পানি পৌঁছে দেন। পাশাপাশি চিকিৎসকরা তাকে শিরায় স্যালাইন (আইভি) দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন, যাতে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পরও তিনি শারীরিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারেন।
ভেনেজুয়েলা, চিলি, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, মেক্সিকো, পর্তুগাল ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে এ অভিযানে অংশ নেয়।
উদ্ধার অভিযানের এক পর্যায়ে একটি ছোট ক্যামেরা ধ্বংসস্তূপের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে প্রথমবারের মতো গিলকে দেখা যায়। ভিডিওতে এক চিলিয়ান উদ্ধারকর্মী তাকে ক্যামেরার দিকে মুখ ঘোরাতে বলেন।
ধুলাবালি থেকে রক্ষা পেতে তিনি একটি মুখোশ পরে ছিলেন। উদ্ধারকারীরাই আগে একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে সেই মাস্ক তার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরে চোখকে ধুলাবালি থেকে রক্ষা করতে তাকে সুরক্ষাচশমাও পরতে বলা হয়।
উদ্ধারের ঠিক আগে কোস্টারিকার রেড ক্রসের আরেক সদস্য জানান, তিনি আমাদের বলেছেন, তার শরীরের কোথাও আঘাত লাগেনি।
উদ্ধারের পর প্যারামেডিক অ্যালান মাদ্রিগাল জানান, তিনি প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থাতেই বেরিয়ে এসেছেন।"
মেক্সিকোর রেড ক্রসের সদস্য মার্কো আন্তোনিও ফ্রাঙ্কো বলেন, গিল পুরো সময়টাতেই আশাবাদী ও প্রাণবন্ত ছিলেন।
তিনি জানান, তিনি নির্দিষ্ট স্বাদের হাইড্রেশন ড্রিংক চেয়েছিলেন। আমরা তার সেই অনুরোধ পূরণ করেছি।
ফ্রাঙ্কোর ভাষায়, গিল নিয়মিত উদ্ধারকারীদের সঙ্গে কথা বলতেন। পরিবারের খোঁজখবর নিতেন এবং উদ্ধারকর্মীদের উৎসাহ দিয়ে বলতেন, এগিয়ে যান।
তিনি উদ্ধারকারীদের চিনতেও শুরু করেছিলেন এবং বলতেন, আবার ফিরে এসেছেন, আমার সঙ্গে আছেন— এটা খুব ভালো লাগছে।
অ্যালান মাদ্রিগাল জানান, এটি ছিল তার জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক উদ্ধার অভিযান।
তার ভাষায়, এক সপ্তাহ আগে যে মানুষটি এখানে এসেছিল, কোস্টারিকায় ফিরে যাবে সে আর আগের মানুষ থাকবে না। এই অভিজ্ঞতা আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক এই ভূমিকম্প দেশটির ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হাজারো উদ্ধারকর্মী এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা সম্ভাব্য জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।





