‘ডাইনি শিকার’ করছে নাইজার, গ্রেপ্তার ৪০

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
‘ডাইনি শিকার’ করছে নাইজার, গ্রেপ্তার ৪০
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজারের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের শুরুতে নতুন দণ্ডবিধি কার্যকর হওয়ার পর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজারে সমকামিতার অভিযোগে কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটিতে এলডিবিটিকিউ+ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যত ‘ডাইনি-শিকার’ চলছে বলে অভিযোগ মানবাধিকারকর্মীদের।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, নাইজারে প্রায় ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাসহ অন্তত ১৬ জন কারাগারে রয়েছেন। সমকামী পুরুষদের এইচআইভি–সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া কয়েকটি সংস্থাকে কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক ধরপাকড়ের কারণে পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত ভীতিকর’ হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার আশঙ্কায় এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হওয়া নাইজারের নতুন দণ্ডবিধিতে ‘অশালীন বা অস্বাভাবিক কার্যকলাপ’ ও সমলিঙ্গের ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০০ মিলিয়ন পশ্চিম আফ্রিকান সিএফএ ফ্রাঁ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

দেশটির ইতিহাসে এবারই প্রথম সমকামিতাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। এর আগে প্রতিবেশী মালি ও বুরকিনা ফাসোও একই ধরনের আইন প্রণয়ন করেছে।

নতুন আইনে সমকামী বিয়েতে অংশ নেওয়া, সাক্ষী থাকা বা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে এলজিবিটিকিউ+–সম্পর্কিত ক্লাব, সংগঠন বা সমিতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্যও ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিয়ন সিএফএ ফ্রাঁ জরিমানার বিধান রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, নতুন আইনের কারণে যেসব পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জডান, তার এখন কনডম, এইচআইভি পরীক্ষা এবং প্রিইপি (এইআইভি প্রতিরোধী ওষুধ) পাওয়ার সযোগ হারাচ্ছেন।

নামা প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র সতর্ক করে বলেন, মানুষ আত্মগোপনে চলে গেলে তাদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন সামরিক নেতা জেনারেল আবদুরাহমানে চিয়ানি। পরে তিনি রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত করেন। ২০২৫ সালে পাাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

চিয়ানির সরকার ২০২৫ সালের মার্চে ২০১০ সালের সংবিধানের পরিবর্তে ‘পুনর্গঠন সনদ’ জারি করে। যদিও ওই সনদে এলজিবিটিকিউ+ সম্পর্ক নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, ফৌজদারি শাস্তির বিধান যুক্ত হয় ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হওয়া নতুন দণ্ডবিধিতে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও প্যান-আফ্রিকান কর্মী লারিসা কোজুয়ে বলেন, সমকামিতাকে পশ্চিমা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি বলেন, আফ্রিকান মূল্যবোধ, সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতির কথা বলা হলেও একই সঙ্গে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। কোনো সংস্কৃতিই নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে সমর্থন করে না।

গত সপ্তাহে নাইজারসহ আটটি দেশ জাতিসংঘের এইচআইভি বা এইডস–বিষয়ক রাজনৈতিক ঘোষণার বিপক্ষে ভোট দেয়। ওই ঘোষণাটি ১৪৯ ভোটে গৃহীত হয়।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় নতুন এইচআইভি সংক্রমণ ৪৯ শতাংশ কমলেও সাব-সাহারান আফ্রিকাতেই এখনো বিশ্বে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের প্রায় ৬৪ শতাংশ বাস করে। ২০২৩ সালে নাইজারে আনুমানিক ৩২ হাজার নতুন সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংস্থা ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স এক বিবৃতিতে নাইজারের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি যৌন অভিমুখ বা লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে এমন সব আইন বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে।