গার্ডিয়ানের কলাম/কী এমন হলো যে মেলোনি–ট্রাম্প সখ্যে ভাটা পড়ল?

রিকার্ডো আলকারো
কী এমন হলো যে মেলোনি–ট্রাম্প সখ্যে ভাটা পড়ল?
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি (বামে) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানো)। ছবি: সংগৃহীত

জর্জিয়া মেলোনি ভেবেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সেই পুরোনো ঝগড়া মিটে গেছে। গত এপ্রিলে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ নিয়ে পোপের সমালোচনার জেরে দুজনের মধ্যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। মেলোনি ভেবেছিলেন সেই তিক্ততা এখন অতীত। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে এতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হতে পারেন, তা তিনি হয়তো আঁচ করতে পারেননি।

ট্রাম্প নতুন করে এই উত্তেজনা উসকে দিয়েছেন। সম্প্রতি ইতালির এক টিভি সাংবাদিককে তিনি বলেন, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে তার সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য মেলোনি নাকি ‘মিনতি’ করেছিলেন।

স্প্যানিশ পত্রিকা ‘এল পাইস’ অবশ্য ভিন্ন এক ইঙ্গিত দিয়েছে। পত্রিকাটির মতে, ওই সম্মেলনের একটি ভিডিও দেখে ট্রাম্প ভীষণ চটেছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, মেলোনি যেন ট্রাম্পকে বকাঝকা করছেন। যা-ই হোক, ট্রাম্প নিজের দাবিতেই অনড় থাকলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে তিনি বিষয়টি নিয়ে আরও মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, মেলোনির জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে। সেই জনপ্রিয়তা বাড়াতেই তিনি ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্পের দাবি, ইরান যুদ্ধে মেলোনি আমেরিকাকে সমর্থন না করায় ইতালির মানুষ তার ওপর ক্ষুব্ধ।

ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এমন আক্রমণ খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু মেলোনি যেভাবে পাল্টা শক্ত জবাব দিয়েছেন, তা অনেককেই অবাক করেছে। এক ভিডিও বার্তায় তিনি ট্রাম্পের ছবি তোলার দাবিকে ‘মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার মিত্রদের সঙ্গে শত্রুর চেয়েও খারাপ ব্যবহার করছেন। নিজের ব্যক্তিগত ও দেশের মর্যাদার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি কারও কাছে হাত পাতি না, ইতালিও না।’

এরপর এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে মেলোনি আবারও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, তার জনপ্রিয়তা কমার পেছনে আমেরিকার কোনো ভূমিকা নেই। তবে বিদ্রূপ করে তিনি যোগ করেন, ট্রাম্পের বন্ধু হয়েও এখন আর কোনো লাভ হচ্ছে না। এর মধ্যেই ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তার মিয়ামি সফর বাতিল করেছেন। সেখানে একটি ইউএস-ইতালি বিজনেস ফোরামে তার যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

এই বিরোধ আসলেই নাকি লোকদেখানো, তা বোঝা মুশকিল। ট্রাম্পের চোখে মেলোনির অপরাধ হলো, তিনি যথাযথ সম্মান দেখাননি। ট্রাম্প চান মেলোনি তার অনুগত হয়ে থাকবেন। অন্যদিকে মেলোনি মনে করেন, ট্রাম্প পশ্চিমা দেশগুলোর জোটের গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না। এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং আদর্শিক সংঘাত।

ইউরোপের প্রতি ট্রাম্পের বৈরিতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এর আগে বাণিজ্য শুল্ক, ইউক্রেন নীতি কিংবা গ্রিনল্যান্ডকে হুমকি দেওয়ার মতো ইস্যুতে ট্রাম্প যখনই সরব হয়েছেন, মেলোনি বরাবরই চুপ ছিলেন। এমনকি ইরান যুদ্ধের শুরুতেও মেলোনি কোনো পক্ষ নিতে চাননি।

তবে এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে ইতালি সরকার। আগামী বৃহস্পতিবার রোমে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হবে। তাজানি সেখানে অংশ নেবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিজেও এখন বেশ নরম সুরে কথা বলছেন।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই সম্পর্কের আর কোনো ক্ষতি হবে না। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—ট্রাম্প ও মেলোনির ব্যক্তিগত সখ্য প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর জন্য একে খুব একটা বড় ক্ষতি বলা যায় না।

ভোটের অঙ্ক ও মেলোনির নতুন চাল

ট্রাম্পের ইউরোপ নীতি নিয়ে মেলোনি হয়তো সত্যিই উদ্বিগ্ন। তবে এই দ্বন্দ্বের মূলে ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে দেশের ভেতরের নির্বাচনী চালই বেশি কাজ করছে।

ট্রাম্প বিষয়টিকে বাড়িয়ে বললেও মেলোনির জনপ্রিয়তায় যে ভাটা পড়েছে, তা কিন্তু ভুল নয়। গত মার্চের এক গণভোটে ভোটাররা মেলোনির আনা বিচার বিভাগীয় সংস্কারের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২০২৭ সালের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে ইতালির প্রধান দুই বিরোধী দল জোট বাঁধার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে রবার্তো ভানাচ্চির নেতৃত্বাধীন নতুন কট্টরপন্থি দল ‘ন্যাশনাল ফিউচার’ মেলোনির জোটের ভোটব্যাংকে থাবা বসাচ্ছে। বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, আগামী নির্বাচনে মেলোনির জোটের হারের আশঙ্কা প্রবল।

ইতালিতে ট্রাম্প অত্যন্ত অজনপ্রিয়। তাই তার সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধ মেলোনির জন্য নির্বাচনী সুবিধা বয়ে আনতে পারে। এতে বামপন্থিরা মেলোনির সঙ্গে ট্রাম্পের পুরোনো ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আর আক্রমণের সুযোগ পাবে না। আবার কট্টর ডানপন্থিদেরও তিনি নিজের ছকে খেলতে বাধ্য করছেন। মেলোনি এখন এমন এক জাতীয়তাবাদী বয়ান তৈরি করছেন, যেখানে পশ্চিমা সভ্যতার গৌরব থাকবে, কিন্তু আমেরিকার দাসত্ব থাকবে না।

পাশাপাশি ইউরোপের দক্ষিণপন্থিদের মধ্যেও নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান মেলোনি। ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা তার সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। তিনি এখন ভিক্টর অরবানের মতো ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ নেতাদের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে চান। বরং ফ্রান্সের জর্ডান বারদেলার ‘ন্যাশনাল র্যালি’র সঙ্গে হাত মেলাতেই তিনি এখন বেশি আগ্রহী।

ট্রাম্পের অপমানের বিরুদ্ধে ইতালির সব রাজনৈতিক দল মেলোনির প্রতি সংহতি জানিয়েছে। এটি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতারই জয়। তবে শুধু এই কৌশলে কি নির্বাচনে জেতা যাবে? মেলোনি সম্ভবত সন্দিহান। তাই তিনি এখন নির্বাচনী আইন বদলাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নতুন আইনে জয়ী জোটকে বাড়তি আসন দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি ছোট দলগুলোর জন্য কঠোর শর্ত ও নির্বাচনের আগেই প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণার বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তিনি বিরোধী জোটের মধ্যে ফাটল ধরাতে চান। কারণ বিরোধী দুই নেতা—এলি শ্লিন ও জুসেপ্পে কন্তে, উভয়েই প্রধানমন্ত্রী হতে চান।

বিরোধীরা এই নির্বাচনী সংস্কারকে ‘কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার দখল’ হিসেবে দেখছে। এটি এখন পার্লামেন্টে পর্যালোচনার অধীনে আছে। এই প্রস্তাব পাস হলেই মূলত দেশটিতে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়ে যাবে। বড় কোনো সাফল্য না থাকায় মেলোনি এখন নিজের আদর্শ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দোহাই দিচ্ছেন

তবে ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্য নিয়ে তার এই ভোলবদল প্রশ্নবিদ্ধ। শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী নিয়ম বদলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই চেষ্টা কি ভোটাররা মেনে নেবেন? এখন সেটাই দেখার বিষয়।


লেখক পরিচিতি

রিকার্ডো আলকারো, রোমের ইস্তিতুতো আফারি ইন্টারনাজিওনালির (আইএআই) গবেষণা প্রধান।