logo

ঘুমের অভাব কি ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়

ঘুমের অভাব কি ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়
ছবি : সংগৃহীত

ফ্যাটি লিভার রোগের কথা উঠলেই সাধারণত অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, স্থূলতা বা শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের কথা মনে আসে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ আছে যা অনেকেই গুরুত্ব দেন না। সেটি হলো পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুমের অভাব।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত খারাপ ঘুম বা অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে যাকে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা এমএএসএলডি বলা হয়, তার সঙ্গে ঘুমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ঘুমের সময় কমে যাওয়া, ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দ নষ্ট হয়ে গেলে লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বেড়ে যায়।

লিভারের স্বাস্থ্যের সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক কী

লিভার শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান বের করে দেওয়া, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, শক্তি সঞ্চয়সহ শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভারের কার্যক্রম শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা বডি ক্লকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়। এর ফলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন বেড়ে যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে এসব পরিবর্তন ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভার রোগ অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। ফলে রোগটি শনাক্ত হতে হতে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।

কীভাবে লিভারে চর্বি জমতে সাহায্য করে খারাপ ঘুম

ঘুম শরীরের বিপাকক্রিয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা, চর্বি সঞ্চয় এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শরীরের চর্বি প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং অন্যান্য বিপাকজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এসব পরিবর্তনের কারণে লিভারে ধীরে ধীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে, যা পরে ফ্যাটি লিভার রোগে রূপ নিতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ঘুমের অভাবে ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যে স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেশি থাকে। আর এই দুটি সমস্যাই ফ্যাটি লিভারের বড় ঝুঁকির কারণ।

রাতের শিফটে কাজ করা ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি কেন

যারা নিয়মিত রাতের শিফটে কাজ করেন বা প্রায়ই ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তন করেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা প্রাকৃতিক জৈবিক ছন্দ ব্যাহত হলে লিভারের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া প্রভাবিত হয়। ফলে শরীরের পক্ষে চর্বি ও শর্করা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণেই রাতের শিফটে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন বিপাকজনিত রোগের পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারের হার তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

ফ্যাটি লিভার অবহেলা করলে কী হতে পারে

প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্যাটি লিভার রোগে সাধারণত তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু চিকিৎসা না করলে বা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না আনলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লিভারে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। পরে তা লিভারে দাগ বা ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসারের কারণও হতে পারে। এ ছাড়া হৃদরোগসহ অন্যান্য বিপাকজনিত জটিলতার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

লিভার সুস্থ রাখতে যা করবেন

বিশেষজ্ঞরা লিভারের সুস্থতার জন্য শুধু খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের ওপর নয়, ঘুমের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।

লিভার ভালো রাখতে কিছু সহজ অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন-

  • প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করুন
  • প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন
  • সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত করুন বা এড়িয়ে চলুন

ফ্যাটি লিভার রোগের ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এখনও বড় ঝুঁকির কারণ। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুমও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ও প্রশান্তিদায়ক ঘুম বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, শরীরের প্রদাহ কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভারকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সুস্থ লিভারের জন্য শুধু কী খাচ্ছেন বা কতটা ব্যায়াম করছেন তা নয়, কতটা ভালো ঘুমাচ্ছেন সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

সূত্র: এনডিটিভি