চা-কফি পান করেন, যে ভুলে বাড়তে পারে ক্যানসারের ঝুঁকি

চা বা কফি অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ গরম চা, কিংবা কাজের ফাঁকে গরম কফি, অভ্যাস হয়ে গেছে অনেকেরই। কিন্তু পানীয়টি কতটা গরম, সেটিও যে স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, খুব বেশি তাপমাত্রায় পান করা চা, কফি বা অন্য কোনো পানীয় খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে চা বা কফি নিজেই ক্যানসার সৃষ্টি করে। মূল উদ্বেগ হলো পানীয়ের অতিরিক্ত তাপমাত্রা।
কতটা গরম পানীয় ঝুঁকিপূর্ণ?
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা আইএআরসি (IARC) ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পান করা তরলকে খুব গরম হিসেবে বিবেচনা করেছে। এমন তাপমাত্রায় নিয়মিত পানীয় গ্রহণকে খাদ্যনালির ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, সদ্য ফুটানো চা বা কফি কাপ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পান করার অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভালো।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আইএআরসি’র Group 2A বা probably carcinogenic শ্রেণিবিন্যাসের অর্থ হলো ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কের পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে, কিন্তু এতে ঝুঁকির মাত্রা কতটা বা কতবার পান করলে ক্যানসার হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে কীভাবে?
খুব গরম তরল বারবার খাদ্যনালির ভেতরের আবরণে তাপজনিত ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের তাপের সংস্পর্শে থাকলে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতির মতো পরিবর্তন তৈরি হতে পারে। এ কারণেই গবেষকেরা খুব গরম পানীয় এবং খাদ্যনালির ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্কের কথা বলেছেন।
এখানে ঝুঁকির বিষয়টি পানীয়টি চা, কফি নাকি অন্য কিছু, তার চেয়ে কতটা গরম অবস্থায় পান করা হচ্ছে, তার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।
শুধু চা-কফিই কি সমস্যা?
না। অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করা যেকোনো পানীয় নিয়েই একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। আইএআরসি’র মূল্যায়নে চা, কফি ও মাতে-সহ বিভিন্ন পানীয়ের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।
তাই গরম চা বা কফির পাশাপাশি খুব গরম স্যুপ বা অন্য কোনো তরলও ঠান্ডা না করে সরাসরি পান করা উচিত নয়।
তাহলে কি চা-কফি খাওয়া বন্ধ করতে হবে?
এমনটা বলার কারণ নেই। গবেষণার মূল সতর্কতা খুব গরম পানীয় নিয়ে, চা বা কফি নিয়ে নয়। আইএআরসি-ও বলেছে, খুব গরম পানীয়ের সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যানসারের একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কতটা পানীয় বা কতদিন পান করলে ঝুঁকি তৈরি হবে, তা নির্ধারণ করা যায়নি।
তাই চা বা কফি খেতে চাইলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পানীয়টি সহনীয় উষ্ণতায় নামিয়ে নেওয়াই ভালো।
ধূমপান ও অ্যালকোহলের ঝুঁকিও মনে রাখতে হবে
খাদ্যনালির ক্যানসারের ক্ষেত্রে শুধু খুব গরম পানীয় নয়, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। আইএআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, অনেক দেশে খাদ্যনালির ক্যানসারের প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে তামাক ও অ্যালকোহল রয়েছে।
তাই শুধু চা একটু ঠান্ডা করে খেলেই সব ধরনের ঝুঁকি দূর হবে, এমনটি ভাবা ঠিক নয়। ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকা বা গ্রহণ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে নিরাপদে গরম পানীয় খাবেন?
খুব সহজ কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। যেমন -
- সদ্য ফুটানো চা বা কফি সঙ্গে সঙ্গে পান করবেন না
- কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে দিন
- মুখ বা জিহ্বায় জ্বালা লাগে এমন পানীয় খাবেন না
- খুব গরম পানীয় দ্রুত বড় চুমুকে পান না করে ধীরে পান করুন
- নিয়মিত ধূমপান বা অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস থাকলে তা কমানো বা বন্ধ করার চেষ্টা করুন
একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- খুব গরম চা বা কফি খেলেই ক্যানসার হবে, এমন কোনো কথা নেই। একইভাবে একবার বা দুবার গরম পানীয় পান করাকে ক্যানসারের কারণ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।
গবেষণায় মূলত দীর্ঘদিন ধরে খুব উচ্চ তাপমাত্রার পানীয় নিয়মিত গ্রহণের সঙ্গে খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক দেখা হয়েছে। আইএআরসি-ও এই সম্পর্ককে probable বা সম্ভাব্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, নিশ্চিত কারণ হিসেবে নয়।
চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পানীয়টি খুব গরম অবস্থায় না খাওয়ার অভ্যাস করুন। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে বলেই সঙ্গে সঙ্গে পান করতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে নিলে স্বাদও উপভোগ করা যায়, আবার অতিরিক্ত তাপের সম্ভাব্য ক্ষতি থেকেও নিজেকে দূরে রাখা যায়।
সূত্র: দ্য কনভার্সেশন
.png)


