কফিতে দুধ-চিনি ছাড়াও ক্যালরি বাড়ানোর পেছনে থাকতে পারে যে উপাদান
-7258f5-720x405.webp)
সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ কফি পান করেন অনেকেই। কেউ কালো কফি পছন্দ করেন, কেউ আবার দুধ, চিনি অথবা ক্রিমার মিশিয়ে কফির স্বাদ বাড়িয়ে খেতে পছন্দ করেন। অনেকের ধারণা, দুধ বা চিনি ছাড়া অন্য উপাদান দিয়ে কফি তৈরি করলে তা তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর। কিন্তু কফিতে ব্যবহৃত একটি উপাদান অজান্তেই বাড়িয়ে দিতে পারে প্রতিদিনের ক্যালরি গ্রহণ।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে করা একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মানুষের কফি থেকে পাওয়া দৈনিক ক্যালরির পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। অথচ এ সময়ে গড়ে কফি পানের পরিমাণ প্রায় একই ছিল। গবেষকদের মতে, কফিতে নন-ডেইরি ক্রিমারের ব্যবহার বৃদ্ধি এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
নন-ডেইরি ক্রিমার কী?
নন-ডেইরি ক্রিমার এমন একটি উপাদান, যা কফিকে আরও ঘন, মসৃণ ও ক্রিমি করে। এটি সাধারণ দুধ বা দুগ্ধজাত ক্রিমের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাজারে পাউডার ও তরল, দুই ধরনের নন-ডেইরি ক্রিমারই পাওয়া যায়।
অনেকে মনে করেন, দুধ থেকে তৈরি হয় না বলে নন-ডেইরি ক্রিমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কিন্তু এই ধারণা সব ক্ষেত্রে ঠিক না। পণ্যভেদে এতে উদ্ভিজ্জ তেল, চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং বিভিন্ন ধরনের সংযোজিত উপাদান থাকতে পারে। এসব উপাদান ক্রিমারের ক্যালরি ও পুষ্টিগুণে প্রভাব ফেলে।
তাই কোনো পণ্যে নন-ডেইরি লেখা থাকলেই সেটি কম ক্যালরিযুক্ত বা বেশি স্বাস্থ্যকর হবে, এমন নয়। প্যাকেটের উপাদান ও পুষ্টিগুণের তালিকা দেখে নেওয়া জরুরি।
গবেষণায় কী জানা গেছে?
গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি জরিপের ২০০৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আটটি পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে ২০ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ৩০ হাজার মানুষের খাদ্যাভ্যাসের তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, এই সময়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড় কফি পানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ আউন্স বা ৩৮০ মিলিলিটার। তবে কফি থেকে পাওয়া দৈনিক ক্যালরি ৪৩ থেকে বেড়ে ৬০ ক্যালরিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ, কফি পানের পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এর সঙ্গে মেশানো উপাদান থেকে পাওয়া ক্যালরি বেড়েছে।
২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, কফিতে যোগ করা উপাদানগুলোর মধ্যে নন-ডেইরি ক্রিমার থেকে দৈনিক গড়ে ১৮.৫ ক্যালরি, চিনি থেকে ১৬ ক্যালরি এবং সাধারণ দুধ থেকে ১১ ক্যালরি পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ, গবেষণায় নন-ডেইরি ক্রিমার কফিতে অতিরিক্ত ক্যালরি যোগ করার সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠেছিল।
এখানে মনে রাখতে হবে, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের গড় হিসাব। বাংলাদেশের মানুষের কফি পানের অভ্যাস বা স্থানীয় বাজারের সব ক্রিমারের ক্ষেত্রে একই ফল প্রযোজ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
নন-ডেইরি ক্রিমারে ক্যালরি বেশি হতে পারে কেন?
নন-ডেইরি ক্রিমারের উপাদান একেক পণ্যে একেক রকম। কিছু ক্রিমারে উদ্ভিজ্জ তেল ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। আবার কিছু পণ্যে অতিরিক্ত চিনিও যোগ করা হয়। চর্বিতে প্রতি গ্রামে প্রায় ৯ ক্যালরি থাকে। অন্যদিকে, কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিনে প্রতি গ্রামে প্রায় ৪ ক্যালরি পাওয়া যায়। তাই চর্বিযুক্ত ক্রিমার অল্প পরিমাণে ব্যবহার করলেও কফিতে উল্লেখযোগ্য ক্যালরি যোগ হতে পারে।
প্রতিদিন কফিতে কয়েক চামচ ক্রিমার ব্যবহার করলে এই অতিরিক্ত ক্যালরি দীর্ঘমেয়াদে মোট ক্যালরি গ্রহণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব নন-ডেইরি ক্রিমার একই রকমের না। কিছু পণ্যে চিনি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম থাকে। তাই শুধু নাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্যাকেটের পুষ্টিগুণের তালিকা দেখা উচিত।
দুধ, চিনি নাকি ক্রিমার, কোনটি ভালো?
কফিতে কী যোগ করা হচ্ছে এবং কতটা পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর পানীয়টির পুষ্টিগুণ নির্ভর করে।
সাধারণ দুধ: দুধ কফিতে ক্যালরি যোগ করলেও এতে প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান থাকে। চিনি ছাড়া দুধ ব্যবহার করলে অতিরিক্ত চিনির পরিমাণও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
চিনি: চিনি কফির স্বাদ বাড়ায়, তবে এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বা খনিজ পাওয়া যায় না। বেশি চিনি ব্যবহার করলে দৈনিক ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।
নন-ডেইরি ক্রিমার: পণ্যভেদে এতে উদ্ভিজ্জ তেল, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি থাকতে পারে। তাই ব্যবহারের আগে উপাদান ও ক্যালরির পরিমাণ যাচাই করা ভালো।
চিনি ছাড়া উদ্ভিজ্জ দুধ: সয়া, বাদাম বা ওটস থেকে তৈরি কিছু পানীয় কফিতে ব্যবহার করা যায়। তবে এগুলোর ক্যালরি, প্রোটিন ও চিনির পরিমাণ এক নয়। প্যাকেটে দেওয়া তথ্য দেখে বেছে নেওয়া উচিত।
অর্থাৎ, দুধ সব সময় ক্রিমারের চেয়ে ভালো বা ক্রিমার সবসময় ক্ষতিকর, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কফিতে কতটা উপাদান ব্যবহার করছেন এবং সেটির পুষ্টিগুণ কেমন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে কফি পান করলে অতিরিক্ত ক্যালরি এড়ানো যায়?
কফির স্বাদ উপভোগ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমাতে কয়েকটি সহজ অভ্যাস অনুসরণ করতে পারেন।
- ক্রিমারের পরিমাণ মেপে ব্যবহার করুন। পাত্র থেকে সরাসরি ঢালার বদলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্রিমার ব্যবহার করুন। এতে প্রতিদিন কতটা ব্যবহার করছেন, তা বোঝা সহজ হবে।
- প্যাকেটের পুষ্টিগুণের তালিকা দেখুন। কেনার আগে প্রতি পরিবেশনে কত ক্যালরি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিরিক্ত চিনি রয়েছে, তা যাচাই করুন। শুধু নন-ডেইরি বা প্ল্যান্ট-বেসড লেখা দেখে পণ্য বেছে নেবেন না।
- ধীরে ধীরে ক্রিমারের পরিমাণ কমান। একবারে কফির স্বাদ বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। অল্প অল্প করে ক্রিমার কমালে নতুন স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে।
- চিনি ছাড়া বিকল্প বেছে নিন। পছন্দ অনুযায়ী সাধারণ দুধ কিংবা চিনি ছাড়া উদ্ভিজ্জ পানীয় ব্যবহার করতে পারেন। তবে বিকল্প পানীয়টির পুষ্টিগুণও দেখে নিন।
- ফ্লেভারযুক্ত সিরাপ সীমিত রাখুন। ক্যারামেল, ভ্যানিলা বা অন্যান্য স্বাদের সিরাপ কফিতে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি যোগ করতে পারে। নিয়মিত এসব উপাদান ব্যবহার করলে পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করুন।
- কফির সঙ্গে নিজের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দিন। শুধু কফি থেকে পাওয়া ক্যালরি নয়, সারাদিনে কী খাচ্ছেন এবং কতটা শারীরিক পরিশ্রম করছেন, তাও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্ল্যাক কফি কি তাহলে সবচেয়ে ভালো বিকল্প?
চিনি, দুধ বা ক্রিমার ছাড়া তৈরি সাধারণ ব্ল্যাক কফিতে ক্যালরি খুব কম থাকে। এক কাপ সাধারণ ব্ল্যাক কফিতে সাধারণত ৫ ক্যালরিরও কম থাকতে পারে। তাই অতিরিক্ত ক্যালরি এড়াতে এটি একটি ভালো বিকল্প।
তবে সবার জন্য ব্ল্যাক কফি পান করা বাধ্যতামূলক নয়। কেউ দুধ দিয়ে কফি খেতে পছন্দ করলে পরিমিত পরিমাণে দুধ ব্যবহার করতে পারেন। মূল বিষয় হলো, কফিতে কী যোগ করছেন এবং কতটা পরিমাণে করছেন।
এ ছাড়া কফিতে ক্যাফেইন থাকে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন কারও কারও ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা বা বুক ধড়ফড়ের কারণ হতে পারে। তাই শুধু ক্যালরি নয়, নিজের ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণের দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
কফি নিজে কম ক্যালরিযুক্ত পানীয় হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যোগ করা ক্রিমার, চিনি ও অন্যান্য উপাদান পানীয়টির ক্যালরি বাড়িয়ে দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কফি থেকে পাওয়া ক্যালরি বৃদ্ধির সঙ্গে নন-ডেইরি ক্রিমারের ব্যবহার বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সব নন-ডেইরি ক্রিমার অস্বাস্থ্যকর কিংবা দুধ ও চিনি সব সময় ভালো বিকল্প। পণ্যের উপাদান, পুষ্টিগুণ এবং ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনা করাই সবচেয়ে ভালো উপায়। কফির স্বাদ বজায় রেখেও সামান্য সচেতনতার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণ কমানো সম্ভব।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে ‘Think Your Coffee Is Healthy? The Hidden Culprit Adding Calories to Your Morning Brew’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।
-19c334.jpg)


