প্লাস্টিকের বোতল থেকে খেলনা, ঘরের কোন পণ্যে রাসায়নিকের ঝুঁকি বেশি

প্লাস্টিকের বোতল, খাবার রাখার পাত্র, রান্নাঘরের নানা সরঞ্জাম, শিশুদের খেলনা, পোশাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী, দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের ব্যবহার রয়েছে। এসব পণ্য ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা সাধারণত এর সুবিধার কথাই বেশির ভাগ সময় ভাবি। কিন্তু প্লাস্টিক তৈরি করতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়তই উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস ফাউন্ডেশনের একটি বিশ্লেষণে প্লাস্টিকের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচিত রাসায়নিকগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য উচ্চ ঝুঁকির বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, খাবারের সংস্পর্শে আসে এমন প্লাস্টিক, পোশাক, শিশুদের খেলনা, গৃহস্থালির পণ্য এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও চিকিৎসাসামগ্রীতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই না যে প্রতিটি প্লাস্টিকের পণ্যই ক্ষতিকর বা প্লাস্টিক ব্যবহার করলেই অসুস্থ হয়ে পড়তে হবে। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারের মাত্রা, শরীরে প্রবেশের পথ এবং কত দিন ধরে এর সংস্পর্শ ঘটছে, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
প্লাস্টিকের রাসায়নিক নিয়ে এত উদ্বেগ কেন
প্লাস্টিককে প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য দিতে উৎপাদনের সময় নানা রকমের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে কোনোটি প্লাস্টিককে নমনীয় করে, কোনোটি এর স্থায়িত্ব বাড়ায়, আবার কোনোটি একে তাপ বা আলো থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
সমস্যা দেখা দেয় যখন এসব রাসায়নিকের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এর মধ্যে কিছু রাসায়নিক শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বাধা দেয়। কিছু পদার্থের সঙ্গে মানব শরীরের প্রজননস্বাস্থ্য, বিকাশ, নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে প্লাস্টিকের সঙ্গে সম্পর্কিত রাসায়নিকগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতি এবং মানুষের সংস্পর্শে আসার মাত্রা বিবেচনা করা হয়েছে। তবে সব রাসায়নিকের ঝুঁকি সমান না। প্রথমেই বুঝতে হবে, কোনো রাসায়নিকের ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য শনাক্ত হওয়া এবং সাধারণ ব্যবহারে সেই রাসায়নিকের কারণে মানুষের রোগ হওয়া এক বিষয় না।
ঘরের কোন কোন পণ্যে থাকতে পারে এসব রাসায়নিক?
খাবার রাখার পাত্র ও মোড়ক
খাবার সংরক্ষণের পাত্র, প্লাস্টিকের মোড়ক, টেকঅ্যাওয়ে খাবারের বাক্স এবং পানির বোতল বহুল ব্যবহৃত পণ্য। এসব পণ্যের উপাদান ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী রাসায়নিকের সংস্পর্শের সম্ভাবনা ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষ করে খাবারের জন্য তৈরি নয় এমন প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার রাখা বা প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা না মেনে পাত্র গরম করা এড়িয়ে চলা ভালো। মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের উপযোগী বলে চিহ্নিত নয়, এমন পাত্রে খাবার গরম করবেন না।
রান্নাঘরের প্লাস্টিকের সরঞ্জাম
প্লাস্টিকের চামচ, খুন্তি, কাটিং বোর্ড এবং খাবার সংরক্ষণের বাক্স অনেক বাড়িতেই ব্যবহৃত হয়। এসব পণ্যের গুণমান, তাপ সহ্য করার ক্ষমতা এবং ব্যবহারের নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ।
প্লাস্টিকের কোনো সরঞ্জাম অতিরিক্ত তাপে ব্যবহার করলে বা সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে তা থেকে রাসায়নিক বের হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে কি না, সেটি পণ্যের উপাদানের ওপর নির্ভর করে। তাই পণ্যের নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করা এবং গলে যাওয়া, ফেটে যাওয়া বা অতিরিক্ত ক্ষয় হওয়া সরঞ্জাম বদলে ফেলা ভালো।
শিশুদের খেলনা
শিশুরা অনেক সময় খেলনা মুখে দেয়। তাই খেলনা তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদান এবং পণ্যের নিরাপত্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের জন্য বয়সোপযোগী খেলনা বেছে নিন। পণ্যের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য, প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা এবং নির্ভরযোগ্য মান নিয়ন্ত্রণের চিহ্ন যাচাই করুন। খেলনা ভেঙে গেলে বা তার কোনো অংশ খুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেটি শিশুর নাগালের বাইরে রাখুন।
পোশাক ও গৃহস্থালির অন্যান্য সামগ্রী
পলিয়েস্টার ও নাইলনের মতো কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক ছাড়াও আসবাব, অফিসের সরঞ্জাম, বাগান করার উপকরণ এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যার কিছু পণ্যে প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়।
এ ধরনের সব পণ্য একই মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কোন রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি কীভাবে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং কতটা সংস্পর্শ ঘটছে, তার ওপর ঝুঁকি নির্ভর করে।
যেসব রাসায়নিকগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে
প্লাস্টিকের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি রাসায়নিক গোষ্ঠী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে।
বিসফেনল: বিসফেনল এ বা বিপিএ কিছু প্লাস্টিক ও রেজিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি শরীরের হরমোনের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা রয়েছে। বিভিন্ন পণ্যে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের নিয়ম দেশ ও পণ্যভেদে আলাদা।
ফথালেটস: কিছু প্লাস্টিককে নমনীয় করতে এই রাসায়নিক গোষ্ঠীর পদার্থ ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু ফথালেটের সঙ্গে প্রজনন ও বিকাশজনিত সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
পিএফএএস: পার-অ্যান্ড পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্ট্যান্সেস বা পিএফএএস এমন একদল রাসায়নিক, যার কিছু সদস্য পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। এগুলোর কয়েকটির সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।
এসব রাসায়নিকের সব সদস্যের বৈশিষ্ট্য বা ঝুঁকি এক নয়। তাই কোনো একটি রাসায়নিক গোষ্ঠীর কিছু সদস্যের ক্ষতিকর প্রভাবের তথ্য দিয়ে সেই গোষ্ঠীর প্রতিটি পদার্থকে সমান ক্ষতিকর বলা যায় না।
গবেষণায় ৯৩ শতাংশের যে তথ্য এসেছে, তার অর্থ কী
প্রতিবেদনটির সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো, প্লাস্টিকের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচিত রাসায়নিকের প্রায় ৯৩ শতাংশকে বিশ্লেষণে মানবস্বাস্থ্যের জন্য উচ্চ ঝুঁকির বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। খাবারের সংস্পর্শে আসা প্লাস্টিক, শিশুদের খেলনা, পোশাক, গৃহস্থালির পণ্য এবং স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রীসহ কয়েকটি শ্রেণি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তবে সংখ্যাটি বোঝার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। এটি এমন কোনো প্রমাণ নয় যে ঘরের ৯৩ শতাংশ পণ্য ব্যবহার করলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। বরং এটি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা রাসায়নিকগুলোর ঝুঁকি-শ্রেণিবিন্যাসের ফল। বাস্তবে মানুষের শরীরে কী পরিমাণ রাসায়নিক প্রবেশ করছে এবং তার ফলে কতটা ক্ষতি হচ্ছে, তা নির্ধারণ করতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত ৩ হাজার ৫৫২টি রাসায়নিকের প্রায় ৮০ শতাংশের বিষাক্ততা বা সংস্পর্শজনিত ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। অর্থাৎ, অনেক রাসায়নিকের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।
অন্যদিকে, আমেরিকান কেমিস্ট্রি কাউন্সিল নামের রাসায়নিক শিল্পের একটি বাণিজ্য সংগঠন সিএনএনকে জানিয়েছে, প্রতিবেদনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যথেষ্টভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। ফলে প্রতিবেদনটির ফলাফল মূল্যায়নের সময় বিশ্লেষণের পদ্ধতি, ব্যবহৃত তথ্য এবং বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্লাস্টিকের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
দৈনন্দিন জীবন থেকে প্লাস্টিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস বদলে অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ কমানোর চেষ্টা করা যায়। চলুন জেনে নিই যে অভ্যাসগুলো বদলালে অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ কমানো যায়-
- গরম খাবারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। খাবার গরম বা সংরক্ষণের জন্য উপযোগী নয়, এমন প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করবেন না। পাত্রে মাইক্রোওয়েভে ব্যবহারের অনুমতি আছে কি না, তা দেখে নিন।
- সম্ভব হলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করুন। বাড়িতে খাবার ও পানীয় সংরক্ষণের জন্য কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করতে পারেন। তবে সব ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার করা সম্ভব না হলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
- ক্ষতিগ্রস্ত পাত্র বদলে ফেলুন। প্লাস্টিকের পাত্রে ফাটল, গভীর আঁচড়, বিকৃতি বা গলে যাওয়ার চিহ্ন দেখা গেলে সেটি খাবার সংরক্ষণে ব্যবহার না করাই ভালো।
- শিশুদের পণ্য কেনার সময় যাচাই করুন। খেলনা, খাবারের পাত্র ও পানির বোতল কেনার সময় পণ্যের উপাদান, বয়সোপযোগিতা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নির্দেশনা দেখুন।
- অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমান। বারবার ব্যবহারযোগ্য নিরাপদ পাত্র বেছে নিতে পারেন। তবে কোনো পণ্য শুধু প্লাস্টিকের তৈরি বলেই সেটিকে বিপজ্জনক ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
- পণ্যের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। কোনো পাত্র কীভাবে পরিষ্কার করতে হবে, কতটা তাপ সহ্য করতে পারে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য কি না, তা প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা থেকে জেনে নিন।
প্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
প্লাস্টিকের সঙ্গে সম্পর্কিত রাসায়নিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গবেষণার ফলাফল কী বলছে এবং কী বলছে না, তা বোঝাও জরুরি। রাসায়নিকের ঝুঁকি, মানুষের বাস্তব সংস্পর্শ এবং রোগের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হলো নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলা, গরম খাবারের জন্য উপযুক্ত পাত্র বেছে নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য বদলে ফেলা এবং শিশুদের পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকা। প্লাস্টিকের সব পণ্যকে বিপজ্জনক ভাবার বদলে সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন ও ব্যবহার করাই ভালো।
সূত্র: সিএনএন
