logo
Advertisement

চিনি নাকি লবণ, হার্টের জন্য বেশি বিপজ্জনক কোনটি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
চিনি নাকি লবণ, হার্টের জন্য বেশি বিপজ্জনক কোনটি
চিনি ভিন্ন কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। ছবি: এনডিটিভি

চিনি ও লবণ দুটিই আমাদের প্রতিদিনের খাবারের পরিচিত উপাদান। একদিকে চা, মিষ্টি, কোমল পানীয় ও নানা ধরনের খাবারে যোগ হয় চিনি, অন্যদিকে রান্না থেকে শুরু করে আচার, চিপস, সস ও প্যাকেটজাত খাবারে থাকে লবণ। কিন্তু হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্যের কথা ভাবলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, চিনি নাকি লবণ, কোনটি বেশি ক্ষতিকর?

এর সরাসরি কোনো একক উত্তর নেই। কারণ অতিরিক্ত লবণ ও অতিরিক্ত চিনি হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি করে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। লবণ বিশেষ করে রক্তচাপ বাড়ানোর মাধ্যমে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত যোগ করা চিনি ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শুধু একটি উপাদান বাদ দেওয়ার বদলে দুটির অতিরিক্ত গ্রহণ কমানোই গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত লবণ হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য কেন ক্ষতিকর?

লবণের প্রধান উপাদানগুলোর একটি হলো সোডিয়াম। শরীরের জন্য সোডিয়াম প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ করলে শরীরে পানি ধরে রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে। এর ফলে রক্তনালিতে রক্তের পরিমাণ বাড়ে এবং রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।

দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত লবণ কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত, যা প্রায় এক চা-চামচের সমান। এই পরিমাণের মধ্যে রান্না ও খাবারে থাকা মোট লবণ বিবেচনা করতে হবে।


শুধু খাবারের ওপর দেওয়া লবণই সমস্যা নয়

অনেকে মনে করেন খাবারে আলাদা করে লবণ না দিলেই সোডিয়াম গ্রহণ কমে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সস, আচার, নোনতা স্ন্যাকস, প্রক্রিয়াজাত মাংসসহ বিভিন্ন খাবারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম থাকতে পারে। ফলে রান্নার সময় কম লবণ ব্যবহার করলেও এসব খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সোডিয়াম শরীরে ঢুকতে পারে।

তাই খাবারের প্যাকেট কেনার সময় শুধু ক্যালরি নয়, সোডিয়ামের পরিমাণও দেখে নেওয়া ভালো।

অতিরিক্ত চিনি কীভাবে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি করে?

চিনি হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর লবণের মতো সরাসরি রক্তচাপ বাড়ানোর পথেই মূলত কাজ করে না। এর প্রভাব অনেকটা পরোক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি।

অতিরিক্ত যোগ করা চিনি নিয়মিত খেলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে পারে। এর ফলে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত চিনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়াতে পারে। এসব বিষয় হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশেষ করে কোমল পানীয়, মিষ্টি পানীয়, মিষ্টি, কেক, বিস্কুট ও বিভিন্ন ডেজার্ট থেকে নিয়মিত বেশি পরিমাণে যোগ করা চিনি গ্রহণ করা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

চিনি মানেই সব চিনি নয়

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ফল বা দুধে স্বাভাবিকভাবে থাকা চিনি এবং খাবার তৈরির সময় যোগ করা চিনি এক জিনিস নয়।

ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য সম্পূর্ণ খাবারের মধ্যে চিনি সাধারণত আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের সঙ্গে থাকে। কিন্তু মিষ্টি পানীয় বা মিষ্টান্নে থাকা যোগ করা চিনি দ্রুত বেশি ক্যালরি গ্রহণের কারণ হতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও যোগ করা চিনি সীমিত রাখার পরামর্শ দেয়।

তাহলে লবণ নাকি চিনি বেশি ক্ষতিকর?

এখানে ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি, তাদের ক্ষেত্রে সোডিয়াম বা লবণ কমানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে যাদের স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যোগ করা চিনি এবং মোট ক্যালরি গ্রহণের দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

অর্থাৎ একজনের ক্ষেত্রে লবণ কমানো বেশি জরুরি হতে পারে, আবার অন্যজনের ক্ষেত্রে চিনি কমানো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে একটি নিরাপদ আর অন্যটি ক্ষতিকর। দুটির অতিরিক্ত গ্রহণই দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

দিনে কতটা লবণ ও চিনি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয়। এটি প্রায় ২ গ্রাম সোডিয়ামের সমান।

যোগ করা চিনির ক্ষেত্রে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রাপ্তবয়স্কদের মোট দৈনিক ক্যালরির ৬ শতাংশের বেশি যোগ করা চিনি না খাওয়ার পরামর্শ দেয়। তাদের হিসাবে অধিকাংশ নারীর জন্য এটি দিনে প্রায় ৬ চা-চামচ এবং পুরুষের জন্য প্রায় ৯ চা-চামচের সমান।

তবে দৈনিক প্রয়োজন বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

হৃদ্‌যন্ত্র ভালো রাখতে কী খাবেন?

চিনি ও লবণ নিয়ে আলাদা করে ভয় পাওয়ার চেয়ে পুরো খাবারের ধরন পরিবর্তন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশনায় বেশি শাকসবজি ও ফল, সম্পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন এবং কম প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যোগ করা চিনি ও সোডিয়াম কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দৈনন্দিন খাবারে তাই চেষ্টা করতে পারেন-

  • রান্নায় প্রয়োজনের বেশি লবণ না দেওয়া
  • খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ খাওয়ার অভ্যাস কমানো
  • ইনস্ট্যান্ট ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো
  • কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা
  • মিষ্টি ও ডেজার্ট পরিমিত খাওয়া
  • খাবারের প্যাকেটে সোডিয়াম ও যোগ করা চিনির পরিমাণ দেখা
  • বেশি শাকসবজি, ফল, ডাল ও সম্পূর্ণ শস্য খাওয়া
  • নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা
  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
  • ধূমপান এড়িয়ে চলা

শুধু চিনি ও লবণ নয়, পুরো খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ

অনেক সময় আমরা একটি উপাদানকে দায়ী করে বাকি খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দিই না। কিন্তু হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পুরো খাদ্যাভ্যাস, শরীরের ওজন, শারীরিক সক্রিয়তা, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ।

একজন মানুষ রান্নায় খুব কম লবণ ব্যবহার করলেও যদি নিয়মিত প্যাকেটজাত খাবার ও নোনতা স্ন্যাকস খান, তাহলে তার মোট সোডিয়াম গ্রহণ বেশি হতে পারে। একইভাবে চায়ে চিনি না খেলেও নিয়মিত কোমল পানীয়, মিষ্টি বা মিষ্টি খাবার খেলে যোগ করা চিনির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।

তাই চিনি না লবণ, কোনটি বেশি ক্ষতিকর এই প্রশ্নের চেয়ে প্রতিদিনের খাবারে দুটির অতিরিক্ত গ্রহণ কতটা কমানো যাচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: এনডিটিভি