চামড়ার নিচে নরম পিণ্ড, কখন চিন্তার কারণ হতে পারে

চামড়ার নিচে হঠাৎ ছোট, নরম কোনো দলা বা পিণ্ড টের পেলে অনেকেরই মনে প্রথমে ক্যান্সারের ভয় তৈরি হয়। বিশেষ করে শরীরের একাধিক জায়গায় এমন পিণ্ড দেখা দিলে দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে। তবে চামড়ার নিচে থাকা সব পিণ্ড ক্যান্সার নয়। বরং নরম, ধীরে বাড়ে এবং আঙুলের চাপে নড়াচড়া করে এমন অনেক পিণ্ডই হতে পারে লাইপোমা।
লাইপোমা হলো চর্বি কোষ দিয়ে তৈরি এক ধরনের নির্দোষ টিউমার। সাধারণত এটি চামড়ার ঠিক নিচে তৈরি হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে শরীরে নতুন কোনো পিণ্ড দেখা দিলে সেটিকে নিজে থেকে লাইপোমা ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। কারণ দেখতে একই রকম হলেও কিছু পিণ্ড অন্য ধরনের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
লাইপোমা কী?
লাইপোমা হলো চামড়ার নিচে তৈরি হওয়া চর্বিযুক্ত একটি পিণ্ড। এটি সাধারণত নরম বা রাবারের মতো অনুভূত হয়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে চামড়ার নিচে কিছুটা নড়াচড়া করতে পারে। বেশির ভাগ লাইপোমা ব্যথাহীন এবং ধীরে ধীরে বড় হয়।
শরীরের প্রায় যেকোনো জায়গায় লাইপোমা হতে পারে। তবে ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, বাহু, পেট ও উরুতে এটি বেশি দেখা যায়। সাধারণত এর আকার কয়েক সেন্টিমিটারের মধ্যে থাকে, যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি অনেক বড়ও হতে পারে।
লাইপোমা খুবই পরিচিত একটি সমস্যা। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতি এক হাজার মানুষের একজনের লাইপোমা থাকতে পারে। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে। তবে যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে।
লাইপোমা কেন হয়?
লাইপোমা হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে পারিবারিক বা বংশগত কিছু কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের লাইপোমা থাকার ঘটনাও দেখা যায়।
শরীরের কোথাও আঘাত লাগার পর লাইপোমা তৈরি হতে পারে এমন ধারণাও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
একাধিক লাইপোমা হওয়ার পেছনে কিছু বংশগত অবস্থাও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শরীরে একসঙ্গে অনেকগুলো পিণ্ড দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে বুঝবেন এটি লাইপোমা?
লাইপোমার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-
- এটি সাধারণত চামড়ার নিচে থাকে
- নরম বা রাবারের মতো অনুভূত হয়
- আঙুল দিয়ে চাপ দিলে কিছুটা নড়াচড়া করে
- বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যথা থাকে না
- ধীরে ধীরে বড় হয়
- শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে
তবে শুধু স্পর্শ করে কোনো পিণ্ডকে নিশ্চিতভাবে লাইপোমা বলা যায় না। একই ধরনের পিণ্ড অন্য কারণেও হতে পারে। তাই নতুন কোনো পিণ্ড দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
লাইপোমা কি ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা রয়েছে। সাধারণ লাইপোমা একটি নির্দোষ বা ক্যান্সারবিহীন টিউমার। এটি সাধারণত ক্যান্সারে রূপ নেয় না।
তবে লাইপোমার মতো দেখতে আলাদা একটি ক্যান্সার আছে, যার নাম লিপোসারকোমা। এটি চর্বি কোষ থেকে তৈরি হওয়া বিরল ধরনের ক্যান্সার। তাই কোনো পিণ্ড লাইপোমা নাকি অন্য কোনো টিউমার, সেটি প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হয়।
লিপোসারকোমা সাধারণ লাইপোমার মতোই সবসময় দেখায় না। তবে কোনো পিণ্ড দ্রুত বড় হলে, শক্ত হয়ে গেলে, সহজে নড়াচড়া না করলে বা ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ তৈরি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কোন লক্ষণগুলো দেখলে চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
শরীরে কোনো পিণ্ড পাওয়া গেলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিচের যেকোনো পরিবর্তন দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-
- পিণ্ড দ্রুত বড় হতে থাকলে
- পিণ্ড শক্ত হয়ে গেলে
- আগের মতো সহজে নড়াচড়া না করলে
- ব্যথা বা অস্বস্তি শুরু হলে
- পিণ্ডটি চামড়ার অনেক গভীরে মনে হলে
- পিণ্ডের আকার প্রায় ৫ সেন্টিমিটার বা তার বেশি হলে
- শরীরের নড়াচড়া বা দৈনন্দিন কাজে বাধা তৈরি করলে

বিশেষ করে মনে রাখতে হবে, ক্যান্সারযুক্ত পিণ্ডে সবসময় ব্যথা থাকবে এমন নয়। তাই শুধু ব্যথা হচ্ছে কি না, সেটি দিয়ে পিণ্ডের প্রকৃতি বোঝা যায় না।
কীভাবে লাইপোমা শনাক্ত করা হয়?
অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক পিণ্ডটি দেখে ও হাত দিয়ে পরীক্ষা করেই প্রাথমিকভাবে লাইপোমা সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। তবে পিণ্ডটি অস্বাভাবিক হলে বা বিষয়টি পরিষ্কার না হলে আলট্রাসনোগ্রাম, এমআরআই, সিটি স্ক্যান বা বায়োপসির প্রয়োজন হতে পারে।
বায়োপসিতে পিণ্ডের সামান্য অংশ নিয়ে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। এতে পিণ্ডটি আসলে কী ধরনের, তা নিশ্চিত হতে সাহায্য করে।
লাইপোমার চিকিৎসা কি দরকার?
বেশির ভাগ লাইপোমার চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। যদি এটি ছোট থাকে, ব্যথা না করে এবং দৈনন্দিন কাজে কোনো সমস্যা তৈরি না করে, তাহলে চিকিৎসক শুধু পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে পিণ্ডটি বড় হতে থাকলে, ব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি করলে, শরীরের নড়াচড়ায় বাধা দিলে বা দেখতে অস্বস্তিকর মনে হলে সেটি অপসারণ করা যেতে পারে।
লাইপোমা অপসারণের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরো পিণ্ডটি বের করে ফেলা। কিছু ক্ষেত্রে চর্বি টেনে বের করার পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে, তা পিণ্ডের আকার, অবস্থান ও বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।
ঘরোয়া বা বিকল্প চিকিৎসায় কি লাইপোমা সেরে যায়?
লাইপোমা কমানোর জন্য বিভিন্ন ঘরোয়া উপায় বা বিকল্প চিকিৎসার কথা শোনা যায়। তবে লাইপোমা পুরোপুরি দূর করার ক্ষেত্রে এসব পদ্ধতির কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
খাবার কম খাওয়া, ব্যায়াম করা বা ওজন কমানোর ফলে শরীরের সামগ্রিক চর্বি কমতে পারে, কিন্তু তাতে আগে থেকে তৈরি হওয়া লাইপোমা গলে যাবে এমন প্রমাণ নেই। তাই কোনো পিণ্ডের চিকিৎসার জন্য নিজে থেকে ওষুধ বা বিকল্প চিকিৎসা শুরু না করে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চামড়ার নিচে নরম, নড়াচড়া করা ও ব্যথাহীন পিণ্ড দেখলেই ক্যান্সার হয়েছে এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই এর কারণ লাইপোমা, যা সাধারণত নির্দোষ এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
তবে শরীরে নতুন কোনো পিণ্ড দেখা দিলে সেটিকে নিজের মতো করে শনাক্ত না করাই ভালো। বিশেষ করে পিণ্ডটি দ্রুত বড় হলে, শক্ত হয়ে গেলে, নড়াচড়া না করলে, ব্যথা হলে বা আকারে বড় হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সাধারণ লাইপোমা নাকি অন্য কোনো সমস্যা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা