Advertisement

টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ে যা জানা জরুরি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ে যা জানা জরুরি
ছবি : সংগৃহীত

টাইপ ২ ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর একটি। তবে সময়মতো শনাক্ত করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই টাইপ ২ ডায়াবেটিস কী, কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন এবং এটি নিয়ন্ত্রণে কী করা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি।

ডায়াবেটিস হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে শরীর রক্তে থাকা শর্করা বা গ্লুকোজকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। সাধারণত অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন নামের একটি হরমোন গ্লুকোজকে রক্ত থেকে কোষে পৌঁছে দেয়, যাতে তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হলে বা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই ডায়াবেটিস বলা হয়।

ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টাইপ ২ ডায়াবেটিস। এই রোগে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করলেও তা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন উৎপাদনও কমে যায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।

আগে টাইপ ২ ডায়াবেটিস মূলত মধ্যবয়সী ও বয়স্কদের রোগ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত ওজন, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে তরুণদের মধ্যেও এ রোগ দ্রুত বাড়ছে। সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।া সম্ভব।


টাইপ ২ ডায়াবেটিস কী?

আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে তৈরি হওয়া গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। এই কাজের জন্য প্রয়োজন ইনসুলিন নামের একটি হরমোন।

টাইপ ২ ডায়াবেটিসে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি ঠিকভাবে সাড়া দেয় না। একে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। শুরুতে অগ্ন্যাশয় বেশি ইনসুলিন তৈরি করে এই সমস্যা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু একসময় তা আর সম্ভব হয় না। তখন রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।

কেন হয়?

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে-

  • পারিবারিকভাবে ডায়াবেটিসের ইতিহাস
  • অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের মেদ
  • নিয়মিত শরীরচর্চা না করা
  • অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া
  • বয়স বৃদ্ধি
  • প্রিডায়াবেটিস থাকা
  • উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরল
  • দীর্ঘদিন মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব

তবে সব ক্ষেত্রে একই কারণ দায়ী নয়। জিনগত ও জীবনযাপনের বিভিন্ন বিষয় একসঙ্গে এ রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ

এই রোগের লক্ষণ সাধারণত ধীরে ধীরে দেখা দেয়। অনেক সময় বছরের পর বছর কোনো স্পষ্ট লক্ষণও থাকে না।

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো-

  • বারবার প্রস্রাব হওয়া
  • অতিরিক্ত পিপাসা লাগা
  • স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্ষুধা লাগা
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি
  • চোখে ঝাপসা দেখা
  • ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
  • হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
  • বারবার সংক্রমণ হওয়া

এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসক সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে টাইপ ২ ডায়াবেটিস শনাক্ত করেন।

  • ফাস্টিং ব্লাড সুগার পরীক্ষা
  • র‌্যান্ডম ব্লাড সুগার পরীক্ষা
  • HbA1c পরীক্ষা
  • প্রয়োজন হলে ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট

এসব পরীক্ষার ফল দেখে রোগের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

চিকিৎসা কী?

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত চিকিৎসায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

  • জীবনযাপনের পরিবর্তন
  • স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
  • নিয়মিত শরীরচর্চা
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ
  • পর্যাপ্ত ঘুম
  • ধূমপান ত্যাগ
  • ওষুধ

অনেকের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ডায়াবেটিসের ওষুধ দেওয়া হয়। সবচেয়ে পরিচিত ওষুধগুলোর একটি হলো মেটফরমিন। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক অন্য ওষুধ বা ইনজেকশনও দিতে পারেন।

ইনসুলিন

যদি ওষুধ ও জীবনযাপনের পরিবর্তনে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে ইনসুলিন প্রয়োজন হতে পারে। এটি কেবল টাইপ ১ ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য নয়, কিছু টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগীকেও ইনসুলিন নিতে হতে পারে।


টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পার্থক্য


ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে?

রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

  • হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোক
  • কিডনির ক্ষতি
  • চোখের রেটিনার সমস্যা
  • স্নায়ুর ক্ষতি
  • পায়ের আলসার ও সংক্রমণ
  • দাঁত ও মাড়ির সমস্যা
  • দৃষ্টিশক্তি হ্রাস

তাই নিয়মিত চিকিৎসা এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস কি প্রতিরোধ করা সম্ভব

সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও অনেক মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো যায়।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন-

  • সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করুন।
  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
  • বেশি শাকসবজি, ফল, ডাল ও পূর্ণ শস্য খান।
  • অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।
  • ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে যদি ঝুঁকির কারণ থাকে।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করলে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারেন। তাই ঝুঁকির কারণ থাকলে নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা এবং কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক