ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনবেন যেভাবে

ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর একটি। একসময় এটি মূলত বয়স্কদের রোগ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন কম বয়সীদের মধ্যেও ডায়াবেটিসের হার বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন এবং পারিবারিক ইতিহাস এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩ কোটি। এর মধ্যে বেশির ভাগই টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
ডায়াবেটিস কী
ডায়াবেটিস হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে শরীর রক্তে থাকা শর্করা বা গ্লুকোজকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। সাধারণত অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন নামের একটি হরমোন গ্লুকোজকে রক্ত থেকে কোষে পৌঁছে দেয়, যাতে তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হলে বা ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ না করলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই ডায়াবেটিস বলা হয়।
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ, চোখের সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষতি এবং পায়ের জটিলতাসহ নানা ধরনের গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ এবং নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং জটিলতার ঝুঁকিও অনেক কমানো যায়।
ডায়াবেটিসের প্রধান ধরন
ডায়াবেটিসের কারণ সব ক্ষেত্রে এক রকম নয়। এটি কোন ধরনের ডায়াবেটিস, তার ওপর কারণ নির্ভর করে। তবে ধরন যাই হোক না কেন, ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। আর দীর্ঘদিন রক্তে অতিরিক্ত শর্করা থাকলে তা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এবং গুরুতর স্বাস্থ্যজটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদি ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস। এ ছাড়া এমন কিছু অবস্থা রয়েছে, যেগুলো সময়মতো নিয়ন্ত্রণে আনলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রিডায়াবেটিস এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস।
প্রিডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তবে সেটি ডায়াবেটিস হিসেবে নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় পৌঁছায় না। এই পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অন্যদিকে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থায় দেখা দেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের পর এটি সেরে যায়। তবে যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়, তাদের ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই প্রসবের পরও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিসের লক্ষণ
ডায়াবেটিসের লক্ষণ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- বারবার পিপাসা লাগা
- ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
- অকারণে ওজন কমে যাওয়া
- সব সময় ক্লান্ত লাগা
- চোখে ঝাপসা দেখা
- ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
- বারবার সংক্রমণ হওয়া
- হাত বা পায়ে ঝিনঝিনি অনুভব করা
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অনেক সময় লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা দেয়। তাই অনেকেই দীর্ঘদিন বুঝতে পারেন না যে তিনি আক্রান্ত।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
নিচের কারণগুলো থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- নিয়মিত শরীরচর্চা না করা
- পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস
- বয়স বৃদ্ধি
- উচ্চ রক্তচাপ
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- পূর্বে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়া
ডায়াবেটিস হলে কী কী জটিলতা হতে পারে?
রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
- হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক
- কিডনি বিকল হওয়া
- দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা অন্ধত্ব
- স্নায়ুর ক্ষতি
- পায়ে ঘা হওয়া
- গুরুতর ক্ষেত্রে অঙ্গ কেটে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে
কীভাবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করবেন?
বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে কিছু অভ্যাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
- সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করুন।
- প্রতিদিন শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও আঁশযুক্ত খাবার খান।
- অতিরিক্ত চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার কম খান।
- ধূমপান থেকে বিরত থাকুন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে ঝুঁকি থাকলে।
ডায়াবেটিসের চিকিৎসা
ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিরাময় করা না গেলেও এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে-
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- নিয়মিত ব্যায়াম
- ওজন নিয়ন্ত্রণ
- রক্তে শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা
- প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ
- টাইপ ১ এবং কিছু টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চোখ, কিডনি ও পায়ের পরীক্ষা করানোও জরুরি।
ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ হলেও সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করতে পারে। তাই শরীরে ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
.png)






