Advertisement

ডা. কামরুলের নামে ভুয়া ওষুধের ডিজিটাল জালিয়াতি

ডা. কামরুলের নামে ভুয়া ওষুধের ডিজিটাল জালিয়াতি
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে দেশের প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের ছবি, আগের ভিডিও চিত্র এবং কণ্ঠস্বর হুবহু নকল (ভয়েস ক্লোন) করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চিকিৎসাসেবা ও ওষুধের বিজ্ঞাপন ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। একটি অসাধু চক্র এই ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে যৌনস্বাস্থ্য ও প্রস্টেটের অবৈধ ওষুধের বিপণন চালাচ্ছে।

এ ঘটনায় সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে (ডিজিডিএ) অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছেন প্রখ্যাত এই সার্জন।

গত ২৩ জুন অধ্যাপক কামরুলের থানায় করা অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত মাসের মাঝামাঝি ফেসবুকে অধ্যাপক কামরুলের ছবি, নাম, পরিচয়, কণ্ঠস্বর এআই/ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বা বিকৃত ভিডিও করে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া, বেঝাল ও অননুমোদিত ওষুধ বা চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিজ্ঞাপন করছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিজ্ঞাপনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ ভুলভাবে বিশ্বাস করতে পারে যে অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম নিজে ওই ওষুধ বা পণ্য অনুমোদন, পরামর্শ বা প্রচার করছেন। বাস্তবে অধ্যাপক কামরুল কিংবা তার প্রতিষ্ঠান সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কোনো ওষুধ, পণ্য বা অনলাইন বিজ্ঞাপন/ফেসবুক পেজের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। এই ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে অধ্যাপক কামরুলের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে, হাসপাতালের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এবং সাধারণ রোগী ও জনগণ প্রতারিত হওয়ার গুরুতর ঝুঁকিতে পড়ছে। এতে জনস্বাস্থ্য, রোগীর নিরাপত্তা এবং চিকিৎসাপেশার প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরে অজ্ঞাতনামা আসামি করে গত ১১ জুলাই একই থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হলে তা গ্রহণ করে পুলিশ।

রোগীদের কাছ থেকে প্রথম জানতে পারি: ডা. কামরুল ইসলাম

এই স্বনামধন্য চিকিৎসক জানান, তিনি নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় না থাকায় বিষয়টি প্রথমে তার নজরে আসেনি। তিনি বলেন, ‘আমার রোগীরা যখন চেম্বারে এসে আমাকে এই ওষুধগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন, তখন আমি প্রথম বিষয়টি জানতে পারি। পরবর্তীতে রোগীদের মোবাইল স্ক্রিনেই আমি সেই ভিডিওগুলো দেখি। আমি স্তব্ধ হয়ে যাই যে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কীভাবে আমার অবয়ব, মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি এবং কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে প্রস্টেট ও যৌনস্বাস্থ্যের ওষুধ বিক্রির বিজ্ঞাপন বানানো হয়েছে।’

নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে এই সার্জন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমি একজন সার্জন, সার্জারির মানুষ। চিকিৎসার বৈশ্বিক উন্নত প্রযুক্তি কীভাবে আমাদের দেশে আনা যায় এবং অস্ত্রোপচারকে কতটা নিখুঁত করা যায়—তা নিয়েই আমার সারাজীবনের কাজ। আমি কোনো মেডিসিনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নই। এমনকি চিকিৎসার সাধারণ প্রয়োজনে যতটুকু প্রয়োজন, তার বাইরে আমি কোনো ওষুধের প্রচার বা পরামর্শ দিই না।’

প্রতারণা এড়াতে অফিশিয়াল পেজ যাচাইয়ের আহ্বান

যেকোনো ভিডিও দেখেই তা বিশ্বাস করার আগে সেটির উৎস বা সোর্স নিশ্চিত করার জন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডা. কামরুল ইসলাম। তিনি জানান, তার অধিকাংশ বক্তব্যই এটিএন বাংলা, সময় টিভিসহ দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া। তাই ভিডিওর সঙ্গে এসব নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের লোগো ও সূত্র আছে কি না, তা খেয়াল করতে হবে।

প্রতারণা রুখতে তিনি সম্প্রতি ‘Professor Kamrul Islam’ নামে একটি অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ চালু করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতেও এই অসাধু চক্র এমন জালিয়াতি করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কোনো ভিডিও দেখলে, তা আসলেই সত্য কি না, নিশ্চিত হতে অফিশিয়াল পেজের কনটেন্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। পেজে না থাকলে বুঝতে হবে সেটি সম্পূর্ণ ভুয়া।

ঢাকার বাইরে থেকে সক্রিয় চক্র, তদন্তে সাইবার পুলিশ

বিজ্ঞাপনটিকে সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে করা একটি জালিয়াতি হিসেবে উল্লেখ করে ডা. কামরুল ইসলাম জানান, তার এক আত্মীয় ক্রেতা সেজে ওই ভুয়া বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে ওপাশ থেকে প্রতারকরা দাবি করে, তারা ডা. কামরুল ইসলামের অফিস থেকে কথা বলছে এবং তাদের অবস্থান ঢাকার বাইরে যশোর বা অন্য কোথাও।

এই চক্রের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। বর্তমানে সরকারের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার ক্রাইম বিভাগ এবং ডিবি সাইবার পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। মামলাটি দ্রুত আলোর মুখ দেখবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আশ্বস্ত করেছে বলে জানান এই অধ্যাপক।

২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া 'সাইবার সুরক্ষা আইন'-এর কথা উল্লেখ করে ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন এই আইনে এ ধরনের অপরাধের জন্য পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে। আমি আশা করব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত এই চক্রকে গ্রেপ্তার করবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, এই অপরাধীরা যখন ধরা পড়বে, সেই শাস্তির খবরটিও যেন আপনারা বড় করে প্রচার করেন। এতে মানুষ জানবে যে ডিজিটাল মাধ্যমে অন্যের নাম ভাঙিয়ে এমন জঘন্য অপরাধ করে পার পাওয়া যায় না।’

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. ছাব্বির আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মামলা হওয়ার পর সাইবার টিমের সহযোগিতায় বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে, অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে। চিহ্নিত করে অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও ভোক্তা অধিকারের নীরবতায় ক্ষোভ

জালিয়াতির বিষয়টি নজরে এলে প্রতিকার পেতে গত ১৩ জুলাই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন অধ্যাপক কামরুল ইসলাম। একই অভিযোগ দেওয়া হয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে। তবে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ দেখতে না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই চিকিৎসক।

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, এই নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ চক্রের সব তথ্য ও সুনির্দিষ্ট লিংক প্রমাণসহ ডিজিডিএ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে জানানো হলেও, তাদের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডিজিডিএ এখনো তাদের সনাতন পদ্ধতির তদারকিতেই আটকে আছে। সাধারণত তারা বিভিন্ন ওষুধের দোকানে গিয়ে ড্রাগ লাইসেন্স যাচাই করে, ব্যাচ নম্বর পরীক্ষা করে কিংবা বড়জোর কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে জরিমানা বা ওষুধ বাজেয়াপ্ত (সিজ) করে। কিন্তু অপরাধের ধরন এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। অপরাধীরা এখন ভার্চুয়াল জগৎ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই ক্ষতিকর ব্যবসা পরিচালনা করছে।

একইভাবে ভোক্তা অধিকারকেও সব তথ্য ও লিংক সরবরাহ করা হলেও ভোক্তাদের এই চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তাদের কাছ থেকেও তেমন কোনো জোরালো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই অপরাধ দমনে তাদের সবার আগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা উচিত ছিল বলে মনে করেন এই বিশিষ্ট চিকিৎসক।

জানতে চাইলে ডিজিডিএর পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি অধিদপ্তর আমলে নিয়েছে। ঢাকার ও ঢাকার বাইরেও বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। আজকালের মধ্যে ঢাকার অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কাছে আমাদের একটি টিম যাবে। একই সঙ্গে যশোরেও আমাদের টিমকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তারাও কাজ করছে।’