প্রতিদিনের একটি অভ্যাসই জানিয়ে দেয় আপনার অন্ত্র কতটা সুস্থ

প্রতিদিনের মলত্যাগের অভ্যাস শুধু একটি দৈনন্দিন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নয়, এটি আপনার অন্ত্রের স্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, দিনের কোন সময়ে মলত্যাগ হচ্ছে, কতটা নিয়মিত হচ্ছে এবং হঠাৎ কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, এসব বিষয় হজমতন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেয়। তাই এই অভ্যাসে দীর্ঘদিনের পরিবর্তনকে সাধারণ বিষয় ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
কারও ঘুম থেকে ওঠার পরপরই মলত্যাগের অভ্যাস থাকে। কেউ আবার সকালে এক কাপ চা বা কফি না খেলে পায়খানার চাপ অনুভব করেন না। আবার কেউ প্রতিবার খাবার খাওয়ার পর মলত্যাগ করেন, আর কেউ দুই-তিন দিন পরপর একবার। এসব অভ্যাস একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হলেও, এগুলো অনেক সময় অন্ত্রের কার্যকারিতা ও হজমপ্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার মলত্যাগের সময় এক রকম হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে নিজের স্বাভাবিক অভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন এলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, এটি কখনো কখনো হজমতন্ত্রের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই এমন পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পুষ্টিবিদ দীপশিখা জৈনের মতে, দিনের কোন সময়ে মলত্যাগ হচ্ছে, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও হজমপ্রক্রিয়ার অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। বিভিন্ন ধরনের মলত্যাগের সময়ের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যা শরীরের ভেতরের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
ঘুম থেকে উঠেই মলত্যাগ হলে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিকভাবে মলত্যাগ হওয়া একটি স্বাস্থ্যকর লক্ষণ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে শরীরের স্বাভাবিক বাওয়েল রিফ্লেক্স বা অন্ত্রের ছন্দ ঠিকভাবে কাজ করছে এবং হজম প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক রয়েছে।
কফি না খেলে মলত্যাগ হয় না?
অনেকেরই সকালে এক কাপ কফি না খেলে মলত্যাগ হয় না। কফি অন্ত্রের নড়াচড়া বাড়াতে পারে, তাই অনেকের ক্ষেত্রে এটি মলত্যাগে সহায়তা করে। তবে যদি প্রতিদিন শুধু কফির ওপর নির্ভর করেই মলত্যাগ হয়, তাহলে সেটি শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ নয়, বরং কফির উদ্দীপক প্রভাবের কারণে হচ্ছে।
প্রতিবার খাবার খাওয়ার পরই বাথরুমে যেতে হয়?
খাবার খাওয়ার পরপরই অনেকের মলত্যাগের বেগ আসে। মাঝে মাঝে এমন হওয়া স্বাভাবিক। তবে যদি প্রায় প্রতিবার খাবারের পরই বাথরুমে যেতে হয়, তাহলে খাবার অন্ত্রে খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে পুষ্টি শোষণে সমস্যা হতে পারে। তবে এটি একা কোনো রোগের নিশ্চিত লক্ষণ নয়। যদি দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকে বা ডায়রিয়া, ওজন কমে যাওয়া কিংবা পেটব্যথার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দুই থেকে তিন দিন পরপর মলত্যাগ হলে
যদি নিয়মিত দুই বা তিন দিন পরপর মলত্যাগ হয় এবং মল শক্ত থাকে বা বের করতে কষ্ট হয়, তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হতে পারে। এর পেছনে পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, আঁশ কম খাওয়া, কম শারীরিক পরিশ্রম বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকতে পারে।
শুধু অফিসে বা বাইরে গেলেই বাথরুমের চাপ আসে?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা উদ্বেগ অন্ত্রের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। তাই বাড়ির বাইরে, অফিসে বা চাপের পরিস্থিতিতে হঠাৎ মলত্যাগের বেগ আসতে পারে। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তাই মানসিক চাপ অনেক সময় হজমের ওপরও প্রভাব ফেলে।
প্রতিদিন একই সময়ে মলত্যাগ করা কি ভালো?
হ্যাঁ। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে মলত্যাগের অভ্যাস সাধারণত স্বাস্থ্যকর রুটিনের ইঙ্গিত দেয়। এটি বোঝায় যে শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি এবং হজম প্রক্রিয়া নিয়মিত ছন্দে চলছে।
সুস্থ মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলবেন যেভাবে
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল ও আঁশযুক্ত খাবার রাখুন।
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
- মলত্যাগের বেগ চেপে রাখবেন না।
- প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাথরুমে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
- টয়লেটে অযথা দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
মলত্যাগের সময়সূচি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে যদি হঠাৎ অভ্যাস বদলে যায়, দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকে, মলের সঙ্গে রক্ত দেখা যায়, তীব্র পেটব্যথা হয় বা অকারণে ওজন কমতে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব উপসর্গের পেছনে এমন কিছু রোগ থাকতে পারে, যার দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রতিদিন কখন মলত্যাগ করছেন, সেটি হয়তো তুচ্ছ বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু শরীরের এই ছোট্ট অভ্যাসই অনেক সময় হজমশক্তি, অন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। তাই নিজের স্বাভাবিক রুটিন সম্পর্কে সচেতন থাকুন। কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: এনডিটিভি





