এনবিআরের সহিদুলের গ্রামেও ১০০ কোটির সম্পত্তি, ৫ হাজার শতাংশ জমি

এনবিআরের সহিদুলের গ্রামেও ১০০ কোটির সম্পত্তি, ৫ হাজার শতাংশ জমি
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাট, ১৫ প্লটসহ ৪০০ কোটির বেশি টাকার সম্পত্তির মালিক সেই এনবিআর কর্মকর্তা সহিদুলের নিজ এলাকায়ও প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। পৈতৃক নিবাস বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে বাবার নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে কলেজ, নিজ ও স্ত্রীর নামে অন্তত ৫ হাজার শতাংশ জমি কিনেছেন সহিদুল। রয়েছে দ্বিতল ও বহুতল একাধিক ভবন। অন্যদিকে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে এক দিনও শিক্ষকতা না করা মামাকে বানিয়েছেন কলেজের উপাধ্যক্ষ।

গত ১ জুন ‘এনবিআরের সহিদুলের ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাট, ৪০০ কোটির সম্পত্তি’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে এশিয়া পোস্ট। ওই সংবাদের পর সহিদুলের নিজ এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত চার বছরে নিজ গ্রামে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জমি কিনেছেন সহিদুল। প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন কলেজ। ভবিষ্যতে হাসপাতাল নির্মাণের জন্যও জমি সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মসজিদ ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করেছেন কোটি কোটি টাকা।

স্থানীয়দের একাংশ এসব কর্মকাণ্ডকে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখলেও হঠাৎ করে তার বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

বাবার নামে অর্ধশত কোটি টাকার কলেজ

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া ইউনিয়নের ফুলাহাতা গ্রাম। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও উন্নয়নবঞ্চিত এই এলাকায় পৌঁছাতে এখনও কোথাও ইটের সলিং, কোথাও কাঁচা রাস্তা পেরোতে হয়। সেই গ্রামেই দূর থেকে চোখে পড়ে বিশাল আয়তনের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নাম মোশারফ হোসেন কলেজ।

প্রবেশমুখে বিশাল সাইনবোর্ড। সামনে প্রশস্ত খেলার মাঠ। পেছনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক ভবনের জন্য নির্ধারিত জায়গা। বহরবুনিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কলেজের মোট জমির পরিমাণ ১৮ একর (প্রায় ১৮০০ শতাংশ)। এর মধ্যে দেড় একর জায়গাজুড়ে মূল একাডেমিক ভবন।

কলেজটির নির্মাণ ব্যয়ের কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, কলেজসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং বর্তমান বাজারদর বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই ব্যয় হয়েছে কমপক্ষে ৩৫ কোটি টাকা। জমি সংগ্রহ ও ভরাটে আরও প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় করেছেন সহিদুল।

এক দিনও শিক্ষকতা না করা মামাকে বানিয়েছেন কলেজের উপাধ্যক্ষ

বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে ২১ জন শিক্ষক রয়েছেন। উপাধ্যক্ষের পদে রয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা ড. সহিদুল ইসলামের মামা জাকির হোসেন। নিয়ম অনুযায়ী, উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে ন্যূনতম ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। অথচ জাকির হোসেন জীবনে কোনোদিন শিক্ষকতা না করেই এই পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

কলেজ প্রাঙ্গণে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে জাকির হোসেন বলেন, ‘তিন বছর আগে ড. সহিদুল ইসলাম এলাকার মানুষের শিক্ষার কথা চিন্তা করে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েকজন চিকিৎসক ও সরকারি কর্মকর্তারও অবদান আছে। তবে অধিকাংশ অর্থ নিজেই (সহিদুল) ব্যয় করেছেন। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।’

তিনি আরও জানান, কলেজসংলগ্ন একটি মসজিদের সৌন্দর্যবর্ধনেও সহিদুল ইসলাম বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের কয়েকজন শিক্ষক জানান, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ইসলামী ব্যাংকের মোরেলগঞ্জ শাখায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকার এফডিআর রাখা হয়েছে। সেই আমানতের মুনাফা থেকে শিক্ষকদের বেতন ও পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ নির্বাহ করা হয়। অর্থ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালিত হয় ফুলাহাটা ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার মাধ্যমে।

নিজ ও স্ত্রীর নামেও বাগেরহাটে জমি

বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার উত্তর ফুলাহাতা মৌজায় সহিদুল, তার পরিবারের সদস্য ও তার প্রতিষ্ঠিত কলেজের নামে মোট ৩৯০ দশমিক ৭২ শতাংশ জমির কাগজপত্র হাতে পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। এর মধ্যে ওই মৌজার ৬৩৬ ও ৬১৩ নম্বর দাগে সহিদুলের নামে রয়েছে মোট ১১৯ দশমিক ৭২ শতক জমি।

এ ছাড়া অন্য তিনটি পৃথক দাগে তার স্ত্রী ফাহমিদা রাখী এবং বাবা মোশারফ হোসেনের নামে রয়েছে ১৬৬ শতক জমি। এ ছাড়া সহিদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত মোশারফ হোসাইন কলেজের নামে ২৪৯, ২৫০ ও ৩৬৫ নম্বর দাগে মোট ১০৫ শতাংশ জমি রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, সহিদুল সংশ্লিষ্টদের জমির প্রকৃত পরিমাণ অনেক বেশি।

কলেজের ঠিক বিপরীত পাশে ড. সহিদুল ইসলামের পৈতৃক বাড়ি। প্রতিবেশী সুলতান হোসেন মোল্লা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গত চার বছরে জমিজমা কিনে কলেজ করেছেন সহিদুল। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৮০ থেকে ৯০ বিঘা (প্রায় ২৭০০ শতাংশ) সম্পত্তি কিনেছেন। কলেজ করার সময় একজনের অল্প কিছু জমি দিতে সমস্যা হয়েছিল। পরে তাকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে সেই জমিও কিনে নেন।’

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কলেজ নির্মাণের পরও জমি কেনার কার্যক্রম থামেনি সহিদুলের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশে ধীরে ধীরে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

হাসপাতালের জন্য জমি সংরক্ষণ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভবিষ্যতে কলেজের আশপাশে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে চান সহিদুল। এ জন্যই মূলত ওই এলাকা ঘিরে একের পর এক জমি কিনছেন তিনি।

সহিদুল ইসলামের গ্রামের বাড়ির প্রতিবেশী সুলতান হোসেন মোল্লা এশিয়া পোস্টকে বলেন, কলেজের আশপাশে অতিরিক্ত জমি কেনার অন্যতম কারণ হলো, ভবিষ্যতে তিনি এখানে হাসপাতাল তৈরি করবেন।

পৈতৃক বাড়ি ঘিরেও জমির বিস্তার

সহিদুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়বে একটি ছোট মসজিদ, পাশে মা-বাবার কবরস্থান। একটু এগোলেই দৃষ্টিনন্দন দোতলা ভবন। বর্তমানে তার চাচি ওই বাড়িতে থাকেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় তাদের বাড়ি ছিল নদীর কাছাকাছি দক্ষিণ দিকে। পরে সহিদুলের বাবা, সাবেক থানা শিক্ষা কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বর্তমান জায়গায় বাড়ি নির্মাণ করেন।

এলাকাবাসী জানান, গত চার বছরে সহিদুল ইসলাম বাড়ির চারপাশে প্রায় ৯০ বিঘা জমি কিনেছেন। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী, এসব জমির দাম পাঁচ কোটির টাকারও বেশি।

খুলনা শহরেও রয়েছে বাড়ি

শুধু গ্রামেই নয়, খুলনা শহরেও সম্পদ রয়েছে সহিদুল ইসলামের। তার মামা ও মোশারফ হোসেন কলেজের উপাধ্যক্ষ জাকির হোসেন জানান, খুলনা সদর থানার বাগমারা প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন ব্যাংকার্স লেনেও বাড়ি কিনেছেন সহিদুল। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বাড়ির পেছনে অন্তত ২০ কোটি খরচ হয়েছে।

সব মিলিয়ে চাকরিজীবনে নিজ এলাকায় ৫ হাজার ১৬৬ শতাংশ জমি কিনেছেন সহিদুল। গড়ে প্রতি শতক ৪০ হাজার টাকা হিসাবে মোট ২০ কোটি ৬৬ লাখ ৪০ হাজার টাকার জমি কিনেছেন।

ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাটসহ ৪০০ কোটির সম্পত্তি

নিজ এলাকায় প্রায় ১০০ কোটির এসব সম্পত্তির অনুসন্ধানের আগে সহিদুল দম্পতির ঢাকায় ৫৩ ফ্ল্যাটসহ ৪০০ কোটির সম্পত্তির প্রমাণ পায় এশিয়া পোস্ট। সহিদুল ইসলাম এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি বহুল আলোচিত ‘ছাগলকাণ্ডের’ মতিউর রহমানের সহকর্মী।

বক্তব্য চাইলেও দেননি সহিদুল

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সহিদুলের বাসায় যান এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক। তবে নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, সহিদুল মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন না। পরে তার মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে বক্তব্য চাইলে মেসেজ দেখেও কোনো উত্তর দেননি।