১৫ থেকে ১৯ বছরেই মা হচ্ছেন দেশের ২৩ শতাংশ কিশোরী

• ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মা হয়েছেন ১ দশমিক ২ শতাংশ কিশোরী

• গত ৫ বছরে শহরেও বেড়েছে কিশোরী মাতৃত্ব

• ১৮ বছরের আগে সন্তান জন্মদানের হারে শীর্ষে রাজশাহী বিভাগ

• বিত্তবান পরিবারে তুলনায় দরিদ্র পরিবারে কিশোরী মাতৃত্বের হার প্রায় দ্বিগুণ

১৫ থেকে ১৯ বছরেই মা হচ্ছেন দেশের ২৩ শতাংশ কিশোরী
সন্তান কোলে কিশোরী মা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

দেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরীদের মধ্যে ২৩ দশমিক ২ শতাংশই ইতিমধ্যে মা হয়েছেন। এর মধ্যে ১ দশমিক ২ শতাংশ মা হয়েছেন ১৫ বছর হওয়ার আগেই।

‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র। যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া এবং সীমিত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা সামাজিক বাস্তবতায় দেশে কিশোরী মাতৃত্বের হারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের মা হওয়ার হার রেকর্ড ছাড়িয়েছে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের এই প্রবণতায় মৃত ও অপরিণত শিশু প্রসব, মা ও শিশুর অপুষ্টি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।

প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরী মাতৃত্ব কেবল একটি জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি শিক্ষা, দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই হার কমিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি কিশোরী গর্ভধারণের ক্ষতিকর দিকগুলোর ওপর বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে লক্ষ্যভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে জোর দেওয়া গেলে পরিস্থিতির টেকসই উন্নতি সম্ভব।

বয়সভিত্তিক প্রজনন হার। ছবি: সৌজন্য
বয়সভিত্তিক প্রজনন হার। ছবি: সৌজন্য

শহরেও ভেঙেছে রেকর্ড

সাধারণত এক বছরে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি প্রতি হাজার কিশোরীর মধ্যে কতজন জীবিত সন্তানের জন্ম দিয়েছে, সেই সংখ্যাকে কিশোরী জন্মহার বলা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে প্রতি হাজার কিশোরীর মধ্যে মাতৃত্বের সংখ্যা ছিল ৮৩। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯২ জনে উন্নীত হয়।

আগে শহরাঞ্চলে এই হার কম থাকলেও পাঁচ বছরে তা প্রতি হাজারে ৭০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০। আর গ্রামাঞ্চলে ৮৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭ জনে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের এখানে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি, ফলে কিশোরী মাতৃত্বের হারও দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশে বিয়ের এক-দুই বছরের মধ্যে সন্তান নেওয়ার একটা রীতি রয়েছে এবং একধরনের প্রবণতাও কাজ করে। যার জন্য কম বয়সে বিয়ে হওয়া দম্পতিদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের হার কম। সরকারের কর্মসূচি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকায় শহরাঞ্চলেও কিশোরী মাতৃত্বের হার বাড়ছে।’

শীর্ষে রাজশাহী, সর্বনিম্ন সিলেট

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ বছর বয়সের আগে জীবিত সন্তান জন্মদানের হারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ (২৯ শতাংশ)। এরপর রয়েছে যথাক্রমে রংপুর (২৮ শতাংশ) ও খুলনা (২৭ শতাংশ)।

প্রতি হাজারে প্রসবের হিসাবে সংখ্যায় রংপুরে এই হার সর্বোচ্চ ১১১ জন এবং সিলেট বিভাগে সর্বনিম্ন ৫০ জন।

বিত্তবান পরিবারে কিশোরী মাতৃত্বের হার প্রতি হাজারে ৬১ হলেও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে এ সংখ্যা ১২০।

কিশোরী মাতৃত্বের পাশাপাশি সামগ্রিক প্রজনন হারও (টিএফআর) বেড়েছে। ২০১৯ সালে প্রজনন হার ছিল ২ দশমিক ৩, তা বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। প্রজনন হার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ (২ দশমিক ৮) ও চট্টগ্রাম (২ দশমিক ৭) বিভাগে।

বিভাগীয় প্রজনন ক্ষমতা ও পরিবার পরিকল্পনা তথ্য। ছবি: সৌজন্য
বিভাগীয় প্রজনন ক্ষমতা ও পরিবার পরিকল্পনা তথ্য। ছবি: সৌজন্য

বড় কারণ বাল্যবিয়ে

প্রতিবেদনে কিশোরী মাতৃত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বাল্যবিয়েকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশে ২০১৯ সালে ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ছিল ৬০ শতাংশ। বর্তমানে এটি ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে হ্রাসের এই গতি অত্যন্ত ধীর।

জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা ও পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার অভাবও কিশোরী মাতৃত্বের একটি বড় কারণ।

২০২২ সালের ‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে’ (বিডিএইচএস) অনুযায়ী, দেশে কিশোরীদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির একটি বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরীদের প্রায় ৪৬ শতাংশই যেকোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতার বাইরে রয়েছে। চাহিদা সত্ত্বেও ১৩ শতাংশ কিশোরী লোকলজ্জা বা সুযোগের অভাবে এটি ব্যবহার করতে পারছে না।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মো. মনজুর হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাল্যবিয়ের হার বেশি হওয়ায় কিশোরী মাতৃত্বের হার বাড়ছে। আমাদের দেশে অভিভাবকদের বাল্যবিয়ের ক্ষতি সম্পর্কে জানাশোনা একেবারে কম। দেশে এখনও আর্থসামাজিক কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার হার কিছুটা বাড়লেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার হার এখনও অনেক কম। যাদের কিশোর-কিশোরী অবস্থায় বিয়ে হচ্ছে অধিকাংশেরই অভিভাবকদের শিক্ষার হার ন্যূনতম। তাদের ধারণা, অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিলে অল্প যৌতুকে দিতে পারবে। বয়স বেশি হলে যৌতুক বেশি লাগবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই শহরাঞ্চলে বসবাস করে। এর মধ্যে অনেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে অন্য অঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলে তথা বস্তিতে বসত গড়েছে। বস্তিতে থাকা একটা পরিবার কতটা জায়গায় থাকে। ছোট একটা ঘরে মা-বাবাসহ একসঙ্গে থাকছে ছেলে-মেয়ে, ছেলের বউ। এতে নতুন দম্পতির সামাজিক সুরক্ষা কিংবা নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে। এসব কারণে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না।’

মনজুর হোসেন বলেন, ‘এখানে আরও বড় একটি ফাঁক রয়েছে। আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে মেয়ে এবং ২১ বছরের আগে ছেলের বিয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু যাদের নির্ধারিত বয়সের আগে বিয়ে হচ্ছে তাদের মধ্যে কয়টির নিবন্ধন হচ্ছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রি হচ্ছে না। ১৮-১৯ বছরের পরে গিয়ে হচ্ছে। কিন্তু তার আগেই অনানুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এবং নতুন দম্পতি একসঙ্গে থাকছে। বস্তি এলাকায় এই হার শতভাগের কাছাকাছি।’

আইনি দুর্বলতার কথা তুলে ধরে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে আইনের বড় গলদ বিশেষ কারণে ১৬ বছরের নিচে বিয়ে দেওয়ার অনুমতি। বাল্যবিয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করছেন অভিভাবকরা। এর রাশ টেনে ধরার প্রধান মাধ্যম হতে পারত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। মসজিদের ইমামরা সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারলে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হতো।’

জন্ম হার। ছবি: সৌজন্য
জন্ম হার। ছবি: সৌজন্য

মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারীদের তুলনায় ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোরীদের গর্ভধারণের কারণে খিঁচুনি ও প্রসবপরবর্তী জরায়ু সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। একই সঙ্গে এসব মায়ের সন্তানরা কম ওজন নিয়ে বা সময়ের আগেই জন্ম নেয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব গ্লোবাল হেলথে গত মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের আটটি জেলা হাসপাতালে ১৫ হাজার ৫২৯টি প্রসবের মধ্যে ৪ শতাংশ ছিল মৃত প্রসব।

চিকিৎসকরা বলছেন, মৃত সন্তান প্রসবের অন্যতম প্রধান কারণ মায়ের কম বয়স এবং প্রসব-পূর্ব পর্যাপ্ত সেবার ঘাটতি।

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা রিতা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গর্ভকালীন অবস্থায় একজন মা ঠিকমতো খেতে পারেন না। ফলে এই সময়ে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। আর কিশোরী হলে তো অবস্থা একেবারে শোচনীয়। এ ছাড়া বয়স কম হওয়ায় রক্তশূন্যতা, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, ইউরিন ইনফেকশনের হার অনেক বেশি থাকে।’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু মা খাবার খেতে পারেন না, তাই গর্ভের শিশু ঠিকমতো বেড়ে ওঠে না, ফিটাল গ্রোথ অনেক কম হয়। ডেলিভারির সময়ে মায়ের শরীর ঠিকমতো প্রস্তুত না হওয়ায় বিলম্বিত প্রসব, বাধাগ্রস্ত প্রসবের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। প্রসবের সময় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি থাকে বিধায় মৃত্যুঝুঁকিও অনেক বেশি। এদের মধ্যে সিজারিয়ানের হার অনেক বেশি। শুধু প্রসবের আগে নয়, ডেলিভারির পরেও এরা রক্তশূন্যতায় ভোগে।’

সমাধান কোন পথে

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে জানতে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে বড় গ্যাপ রয়েছে। এখন দরকার লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি। এ জন্য ২০২৫ সালে যে কৌশল ঠিক করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বরাদ্দ হওয়া অর্থ কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এখানে দীর্ঘদিনের জনবল ঘাটতি রয়েছে। সেটি পূরণ করা গেলে সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে। একই সঙ্গে সচেতনতায় সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।’