ওয়াসার সাড়ে ৪ হাজার কোটির প্রকল্প এখন ১৬ হাজার কোটি টাকা

রাজধানীর পানি সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ফেজ-৩-এর ব্যয় বাড়ানো হয়েছে প্রায় চার গুণ। শুরুতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও এখন তা ১৬ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে।
একই ধরনের গন্ধর্বপুর প্রকল্প মাত্র ১১ হাজার কোটি টাকায় প্রায় শেষের পথে। দুই প্রকল্পের ব্যয় ও সক্ষমতার এই ফারাক প্রকল্প ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রকল্পটি ঢাকার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তবে নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একই মানের ও একই সময়ে বাস্তবায়নাধীন গন্ধর্বপুর প্রকল্পের তুলনায় সায়েদাবাদ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। অথচ উৎপাদন সক্ষমতা ও অবকাঠামোর দিক থেকে গন্ধর্বপুর প্রকল্প এগিয়ে।
পানি শোধনে তিন ধাপের প্রকল্প
সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প ঢাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম বড় অবকাঠামো। এর মূল লক্ষ্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। মেঘনার পানি সংগ্রহ করে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়ায় তা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করা হবে। সময়ের সঙ্গে প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বিস্তৃত হয়েছে—ফেজ-১, ফেজ-২ এবং ফেজ-৩।
প্রথম দিকে শীতলক্ষ্যা থেকে পানি সংগ্রহ করে পরিশোধনের পর সরবরাহ করা হতো। শীতলক্ষ্যার পানি দূষিত হওয়ায় পরে মেঘনা থেকে পানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়িয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন লিটার পানি প্রতিদিন সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
পুরো প্রক্রিয়ায় প্রথমে নদী থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়। এরপর রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানির ভেতরের কণা একত্র করে নিচে বসিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কণা অপসারণ করা হয়।
সবশেষে জীবাণুনাশক প্রয়োগ করে পানি নিরাপদ করা হয়। পুরো ব্যবস্থাটি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
ফেজ-৩ এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ। এতে নতুন ইনটেক স্টেশন, দীর্ঘ ট্রান্সমিশন পাইপলাইন, শক্তিশালী পাম্পিং ব্যবস্থা এবং বিদ্যমান প্ল্যান্টের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পুরো সিস্টেমকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ধারাবাহিকভাবে ব্যয় বৃদ্ধি
রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটাতে আওয়ামী লীগ আমলে ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের ফেজ-৩ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। তবে বাস্তবে কাজ তেমন এগোয়নি।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৭ হাজার ৫১৮ কোটি ৩ লাখ টাকা। একই সঙ্গে মেয়াদ বাড়িয়ে ধরা হয় ২০২৫ সাল পর্যন্ত। তবে এ দফায়ও কাজে গতি আসেনি।
মূল কাজ না এগোলেও ২০২৪ সালের পর দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের ব্যয় একলাফে ২ দশমিক ১৩ গুণ বাড়িয়ে ১৬ হাজার ১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা করা হয়। অথচ নথিপত্র অনুযায়ী, এই ব্যয় বাড়ানোর সময় পর্যন্ত প্রকল্পের মূল কাজের অগ্রগতি ছিল ১০ শতাংশেরও কম।
নিয়ম ভেঙে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ
মানদণ্ড অনুযায়ী যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে বহাল রয়েছেন পঞ্চম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক চেয়ারম্যান ড. গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের পুরস্কার হিসেবে মোস্তাফিজকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা হয়। দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান তাকে এই পদে নিয়োগ দেন।
২০২৩ সালের মে মাসে একটি টেলিভিশনে তৎকালীন এমডি তাকসিম এ খানের সমালোচনা করেন তখনকার চেয়ারম্যান ড. গোলাম মোস্তফা। এর জেরে মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঢাকা ওয়াসা প্রকৌশলী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বানান তাকসিম। পরে তিনটি সমিতির মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করিয়ে গোলাম মোস্তফাকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরানো হয়।
এর পুরস্কার হিসেবে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদ পান মোস্তাফিজ। অথচ আইন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের পিডি হতে হলে ন্যূনতম তৃতীয় গ্রেডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়া বাধ্যতামূলক।
কাজের অগ্রগতি নিয়ে সংশয়
২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ছিল ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে আর্থিক অগ্রগতি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। এরপর আর কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদন অনলাইনে প্রকাশ করা হয়নি। যদিও নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি মাসে এটি প্রকাশের কথা।
একই মানের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। তৃতীয় সংশোধনীতে এই ব্যয় চূড়ান্ত হয় এবং প্রকল্পটি এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত মাসে গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প পরিদর্শন করেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘মেঘনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প চালু হলে দিনে ৫০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি ঢাকা শহরে সরবরাহ করা যাবে।’
মন্ত্রী জানান, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষামূলক ও আংশিক পানি সরবরাহ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করে ঢাকা ওয়াসার মাধ্যমে রাজধানীতে নিয়মিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একই ধরনের আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে, যা রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদি পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কম সক্ষমতায় বেশি ব্যয়
রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে বর্তমানে দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এগুলো হলো সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেজ-৩) এবং ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প (গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার)। দুই প্রকল্পের ব্যয় ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা তুলনা করলে বেশ কিছু অসংগতি সামনে আসে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-৩ প্রকল্পের ব্যয় দ্বিতীয় সংশোধনের পর দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের ব্যয় তৃতীয় সংশোধনের পর দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ গন্ধর্বপুর প্রকল্পের তুলনায় সায়েদাবাদ প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। তবে এই বড় ব্যয়ের বিপরীতে অবকাঠামোগত সক্ষমতায় সায়েদাবাদ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং সামগ্রিকভাবে এগিয়ে রয়েছে গন্ধর্বপুর প্রকল্প।
নথি অনুযায়ী, গন্ধর্বপুর প্রকল্পে ১০৫ কোটি লিটার ক্ষমতার ইনটেক এবং ৫০ কোটি লিটার ক্ষমতার পানি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিপরীতে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ প্রকল্পে ইনটেকের ক্ষমতা ৯৫ কোটি লিটার এবং শোধনাগারের ক্ষমতা ৪৫ কোটি লিটার।
পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কেও এগিয়ে গন্ধর্বপুর প্রকল্প। এই প্রকল্পে ১৬০০ মিলিমিটার ব্যাসের ৭২ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন পাইপলাইনসহ ৬৭ কিলোমিটার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ওয়াটার পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে সায়েদাবাদ প্রকল্পে রয়েছে ২২০০ মিলিমিটার ব্যাসের ৪৪ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন পাইপলাইন এবং ৫২ কিলোমিটার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি পাইপলাইন।
গন্ধর্বপুর প্রকল্পে অতিরিক্ত ৪৯৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার ১৬টি ডিএমএ (ডিস্ট্রিক্ট মিটার্ড এরিয়া) নেটওয়ার্ক, ৫০টি গভীর নলকূপ, ১৫৫০টি টয়লেট ও গোসলখানা নির্মাণসহ ২০০ একর জমি অধিগ্রহণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সায়েদাবাদ প্রকল্পের ব্যয় বিবরণীতে এ ধরনের অবকাঠামো উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।

ব্যয়ের খাত
দুই প্রকল্পের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। সায়েদাবাদ প্রকল্পে কম্পোনেন্ট-১ এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ২৩২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা গন্ধর্বপুর প্রকল্পের মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
সায়েদাবাদ প্রকল্পে কাস্টম ডিউটি বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৮১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। একই খাতে গন্ধর্বপুর প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ২৬৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
দুই প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোতেও রয়েছে পার্থক্য। সায়েদাবাদ ফেজ-৩ প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বিপরীতে গন্ধর্বপুর প্রকল্পে ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ৭৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, কম ব্যয়ে গন্ধর্বপুর প্রকল্পে বেশি পানি উৎপাদন সক্ষমতা, দীর্ঘতর বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং অতিরিক্ত অবকাঠামো সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সায়েদাবাদ ফেজ-৩ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। ফলে প্রকল্পের ব্যয়ের যৌক্তিকতা, ব্যয় কাঠামো এবং সংশোধিত ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন উপাদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গন্ধর্বপুর প্রকল্পের সক্ষমতা যেখানে ৫০ কোটি লিটার সেখানে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ এর শোধনাগারের সক্ষমতা ৯৫ কোটি লিটার। ফলে ব্যয় বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এই পানি আসবে মেঘনা থেকে। এর মধ্যে সাড়ে ২২ কোটি লিটার করে যাবে সায়েদাবাদ-১ ও ২ এ। বাকি ৫০ কোটি লিটার যাবে সায়েদাবাদ ফেজ-৩ এ।’
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে আইন না মানার বিষয়ে বলেন, ‘আমি আসার আগে এই নিয়োগ হয়েছে। কাজেই সে সম্পর্কে আমার জানা নেই।’




