মোতালিব প্লাজায় বিএনপির দুপক্ষের বিরোধে বিপাকে ৭০০ দোকান মালিক
• দোকান মালিক সমিতির কমিটি নিয়ে বিরোধ।
• বিবদমান দুপক্ষের নেতৃত্বে খন্দকার আকতার হামিদ পবন এবং সাবেক যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান বাচ্চু।
• বিরোধের সূত্রপাত সমিতির তহবিলে থাকা নগদ কোটি টাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।
• গত ১৬ মে মালিক সমিতির অফিস দখলে নিয়ে পরদিন নতুন কমিটি ঘোষণা করেন পবন।
• পবনের কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকে অবৈধ উল্লেখ করে হাইকোর্টে রিট বাচ্চুর।

রাজধানীর মোতালিব প্লাজায় দোকান মালিক সমিতির কমিটি নিয়ে বিএনপির দুপক্ষের বিরোধ চরম রূপ নিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন দেশের অন্যতম বৃহৎ এই মোবাইল মার্কেটের সাত শতাধিক দোকান মালিক।
সভাপতি পদ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খন্দকার আকতার হামিদ পবন এবং সাবেক যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান বাচ্চু।
একপর্যায়ে বহিরাগতদের নিয়ে মার্কেটে মহড়া চালিয়ে মালিক সমিতির অফিস দখলে নেয় পবন গ্রুপ। পরে বিষয়টি পুলিশ ও আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এমন বাস্তবতায় একদিকে ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আতঙ্কে ভুগছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই ব্যবসায়ী এশিয়া পোস্টকে জানান, দুপক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের দৈনন্দিন বেচাকেনায়। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মার্কেটের স্বাভাবিক ব্যবসার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিরোধের সূত্রপাত যেভাবে
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন মার্কেট কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা গা-ঢাকা দেন। এমন পরিস্থিতিতে ওই বছরের ১১ নভেম্বর সাধারণ সভার মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করেন মোতালিব প্লাজার ব্যবসায়ীরা।
৩১ সদস্যের কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব নেন আগের কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান বাচ্চু। সাধারণ সম্পাদক হন আগের কমিটির কোষাধ্যক্ষ শাহ আলম ব্যাপারী।
তখন থেকেই এই কমিটির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বিএনপির আরেক পক্ষ খন্দকার আকতার হামিদ পবন ও তার অনুসারীরা।

সে সময় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে টিকে যায় মাহবুবুর রহমান বাচ্চুর কমিটি। দুই বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কমিটির ফান্ডের কোটি টাকার হিসাব নিয়ে সভাপতি মাহবুবুর রহমান বাচ্চুর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় সেক্রেটারি শাহ আলম ব্যাপারীর। এরপর খন্দকার আকতার হামিদ পবনের সঙ্গে হাত মেলান শাহ আলম ব্যাপারী।
বহিরাগত লোকজন নিয়ে গত ১৬ মে সন্ধ্যায় মার্কেটে মহড়া দেন খন্দকার আকতার হামিদ পবন। এ সময় তিনি মালিক সমিতির অফিস দখলে নেন। পরদিন নিজেকে আহ্বায়ক ও শাহ আলম ব্যাপারীকে সদস্যসচিব করে কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন।
আদালতে রিট
এভাবে একতরফা কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকে অবৈধ উল্লেখ করে গত ৯ জুন হাইকোর্টে রিট করেন মাহবুবুর রহমান বাচ্চু। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১ জুন আদালত মোতালিব প্লাজা দোকান মালিক সমিতির পরবর্তী কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষ যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে বর্তমান কমিটিকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) পাঁচজন বিবাদীকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এ ছাড়া ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য নির্দেশ দেন আদালত।
আদালতের এই নির্দেশনা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন মাহবুবুর রহমান বাচ্চু। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত প্রশাসন ও শ্রম অধিদপ্তর থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মার্কেটের সাধারণ ব্যবসায়ীরা ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন। তারা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। আমি ও আমার কমিটি এই নির্বাচনের মাধ্যমে সমিতির নেতৃত্ব প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিতে চাই। অথচ আমি এখন সমিতির অফিসে যেতে পারছি না। আমার সঙ্গে থাকা লোকজনকে মারধর করা হচ্ছে। সমিতির ক্যাশে বর্তমানে নগদ এক কোটি ২০ লাখ টাকা রয়েছে। তারা সমিতির অফিস দখল করে সেই টাকা কারণে-অকারণে খরচ করছে। এ ছাড়া মার্কেটের বিভিন্ন স্পট বিজ্ঞাপনের জন্য বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ভাড়া রয়েছে। সেই টাকাও ঠিকমতো সমিতির কোষাগারে জমা হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের নতুন করে চুক্তি করতে হবে, এমন শর্ত দিয়ে বিভিন্নভাবে জিম্মি করার চেষ্টা করছে বর্তমান কমিটি।’
বাচ্চু কখনও সভাপতি ছিলেন না, দাবি পবন-শাহ আলমের
মাহবুবুর রহমান বাচ্চুকে সভাপতি হিসেবে মানতে নারাজ আকতার হামিদ পবন। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মাহবুবুর রহমান বাচ্চু নামে কোনো সভাপতি নেই। যিনি দাবি করছেন, তিনি কখনও সভাপতি ছিলেন না। তিনি হাইকোর্টের একটি আদেশের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছেন। যে কারণে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে।’
আকতার হামিদ পবন বলেন, ‘এই মার্কেট আমরাই প্রতিষ্ঠা করেছি। এর আগে আমার বড় ভাই মার্কেটের সভাপতি ছিলেন। আওয়ামী লীগের ১৭ বছর আমরা এখানে ঢুকতে পারিনি। এখন আমি বৈধভাবে কমিটির দায়িত্ব নিয়েছি। এতে ব্যবসায়ীরা খুশি। অন্যদিকে, যিনি নিজেকে সভাপতি দাবি করছেন, তিনি বেজমেন্টের একটি গুদাম নিজের দখলে রেখে অর্থ আত্মসাৎ করছেন।’
মোতালিব প্লাজা ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনের সীমানার মধ্যে পড়েছে। মার্কেটের মালিক সমিতিতে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট। আকতার হামিদ পবনের দাবি, তিনি যে কমিটি ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস সে ব্যাপারে অবগত।
ফোনে আকতার হামিদ পবন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি এই মুহূর্তে মির্জা আব্বাস আঙ্কেলকে দেখতে মালয়েশিয়ায় আছি। আমার কমিটির সদস্য সচিব শাহ আলম মার্কেটে আছেন, কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
পরে কথা হয় শাহ আলম ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মাহবুবুর রহমান বাচ্চু কখনও সভাপতি ছিলেন না। ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেই নিজেকে সভাপতি ঘোষণা করেন। ওই কমিটির কোনো বৈধতা ছিল না।’
শাহ আলম ব্যাপারীর দাবি, তিনি যে কমিটির সদস্য সচিব সেটি মির্জা আব্বাস নিজেই করে দিয়েছেন। এর বাইরে আর কোনো কমিটি ছিল না, এখনও নেই।
সমঝোতার চেষ্টা পুলিশের
আদালতে রিট পিটিশন দায়েরকারী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সিদ্দিক উল্লাহ মিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মাহবুবুর রহমান বাচ্চুর পক্ষে আমরা একটি রিট পিটিশন করেছিলাম। আদালত সেটি আমলে নিয়ে পাঁচজন বিবাদীকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেছেন। একই সঙ্গে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে বর্তমান কমিটিকে যেন কোনো পক্ষ বাধা দিতে না পারে, সে বিষয়ে ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। আশা করি, দ্রুত এর সমাধান হবে।’
ডিএমপির রমনা বিভাগের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) এস কে জাহিদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আদালতের আদেশ পাওয়ার পর আমরা উভয়পক্ষকে ডেকে সমঝোতার চেষ্টা করছি। কিন্তু দেখা যায় কখনও এক পক্ষ আসে তো অন্য পক্ষ আসে না। আমাদের মূল কাজ হলো যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না হয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনে আমরা অবশ্যই সাহায্য করব। তবে আমাদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়েও যাতে উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তি বজায় থাকে, সে জন্য আমরা আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, আদালতের দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই একটি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’
ডাবলু থেকে যুবলীগ হয়ে পবন-বাচ্চু
১৯৯৯ সালে হাতিরপুলে ব্যবসায়ী আলহাজ আবদুল মোতালিবের জমিতে যৌথ চুক্তিতে ইস্টার্ন হাউজিং ১৪ তলাবিশিষ্ট এই কমপ্লেক্স নির্মাণ করে। প্রথম পাঁচতলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক এবং বাকি ৯ তলা আবাসিক ফ্ল্যাট।
দেশের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল মার্কেট হিসেবে বেশি পরিচিত মোতালিব প্লাজা। দোকান সংখ্যা সাত শতাধিক।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রথম কমিটি গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন সাবেক বিএনপি মহাসচিব প্রয়াত খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলু।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মার্কেট কমিটির নিয়ন্ত্রণ নেন কলাবাগান থানা যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি আজিজুল হক আজিজ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের অনুসারী যুবলীগ নেতা আযাদ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ওই কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা পালিয়ে যান।
আওয়ামী লীগ নেতারা পালিয়ে যাওয়ার পর মার্কেটের মালিক সমিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে বিএনপির দুপক্ষ। উভয়পক্ষের নজর পড়ে সমিতির তহবিলে। কেননা, বিদ্যমান তহবিলের পাশাপাশি মার্কেট থেকে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের টাকা আয় হয়।
লাইটিং, জেনারেটর, পরিচ্ছন্নতাসহ সার্ভিস চার্জ বাবদ দোকানপ্রতি দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে মালিক সমিতি। এর বাইরে বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন ও ফাঁকা স্পেস ভাড়া থেকে আসে মোটা অঙ্কের তহবিল।
নিয়ম অনুযায়ী, এই টাকা সাধারণ ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের স্বার্থে ব্যয়ের কথা। তবে বাস্তবে এই তহবিলই এখন মার্কেটে অস্থিরতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





