লিভারে চর্বি জমলেই শেষ নয়, বিপদ ছড়াতে পারে পুরো শরীরে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
লিভারে চর্বি জমলেই শেষ নয়, বিপদ ছড়াতে পারে পুরো শরীরে
ফ্যাটি লিভার শুধু লিভারের সমস্যা নয় ছবি : সংগৃহীত

ফ্যাটি লিভারকে শুধু লিভারের সমস্যা মনে করলে ভুল হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শরীরের বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এমন একটি রোগ, যার প্রভাব শুধু লিভারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি হৃদ্‌রোগ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ এবং লিভারের গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ফ্যাটি লিভারকে প্রাথমিক অবস্থাতেই গুরুত্ব দেওয়া এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা জরুরি।

বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD)-এর পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই MASLD বা Metabolic Dysfunction-Associated Steatotic Liver Disease নামটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ এই রোগের সঙ্গে শরীরের বিপাকজনিত সমস্যার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

কেন ফ্যাটি লিভার শুধু লিভারের সমস্যা নয়?

যখন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে, তখন শুধু লিভারই নয়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে যেসব সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো হলো হৃদ্‌রোগ, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, লিভারে প্রদাহ ও পরবর্তী সময়ে সিরোসিস এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি।

এ কারণে ফ্যাটি লিভারকে এখন পুরো শরীরের বিপাকজনিত স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হয়।

শুরুতে সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না

ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেকেরই শুরুতে কোনো উপসর্গ থাকে না। কারণ লিভারে ব্যথা অনুভব করার স্নায়ু খুব কম থাকে। ফলে দীর্ঘদিন রোগটি নীরবে অগ্রসর হতে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পরে সব সময় ক্লান্ত লাগা, ডান পাশের ওপরের পেটে অস্বস্তি, দুর্বলতা ও/বা রক্ত পরীক্ষায় লিভারের এনজাইম বেড়ে যাওয়া দেখা দিতে পারে। তবে অনেকের ক্ষেত্রেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় আলট্রাসনোগ্রামে এটি ধরা পড়ে।

সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা এখনো জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা।

ধীরে ধীরে ওজন কমাতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই লিভারের চর্বি কমে, প্রদাহ হ্রাস পায় এবং রোগের অগ্রগতি ধীর হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ওজন কমানোর মাধ্যমে কিছু রোগীর লিভারের প্রদাহও সেরে যেতে পারে।

কী খাবেন?

খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

  • বেশি করে শাকসবজি ও ফল খান।
  • ওটস, ব্রাউন রাইস ও অন্যান্য পূর্ণ শস্য বেছে নিন।
  • মাছ, মুরগি, ডাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিন খান।
  • অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয় ও মিষ্টিজাত খাবার কমান।
  • অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলুন।

নিয়মিত ব্যায়াম জরুরি

সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে এবং লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এমনকি ওজন খুব বেশি না কমলেও নিয়মিত ব্যায়াম উপকারী।

আরও যেসব অভ্যাস উপকারী

  • প্রতি সপ্তাহে ধীরে ধীরে ০.৫ থেকে ১ কেজি ওজন কমানোর লক্ষ্য রাখুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুমান।
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাবেন না।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

যদি আলট্রাসনোগ্রামে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে, লিভারের এনজাইম অস্বাভাবিক থাকে, অথবা আপনার ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরল থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিয়মিত ফলোআপ করা উচিত। কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ফ্যাটি লিভারকে শুধু লিভারের একটি সাধারণ সমস্যা মনে করলে ভুল হবে। এটি শরীরের সামগ্রিক বিপাকজনিত স্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সময়মতো সচেতন হলে লিভারসহ পুরো শরীরকেই সুস্থ রাখা সম্ভব।

সূত্র: এনডিটিভি