নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমোদন: সমস্যার সমাধান, নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি?

নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমোদন: সমস্যার সমাধান, নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি?
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশে চিকিৎসক ও রোগীর অনুপাত সন্তোষজনক নয়। এই যুক্তিকে সামনে রেখে প্রায়ই দেশে নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হতে দেখা যাচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও, আমাদের আর্থসামাজিক ও কাঠামোগত প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে। প্রয়োজন ও সক্ষমতার সমন্বয় না করে কেবল সংখ্যার পেছনে ছুটলে তা হিতে বিপরীত হতে বাধ্য।

বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহে প্রায় ১২ হাজার আসন রয়েছে। যেখান থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী এমবিবিএস পাস করে বের হচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এই বিশাল সংখ্যক চিকিৎসককে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত বা ‘অ্যাবজর্ব’ করার জায়গা কোথায়?

বিসিএস-এর মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। একটি সাধারণ বিসিএস সম্পন্ন হতে আড়াই থেকে তিন বছর এবং একটি বিশেষ বিসিএস সম্পন্ন হতে প্রায় দেড় বছর লেগে যায়। প্রতি তিন বছরের ব্যবধানে যদি পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে ঐ একই সময়ে রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত প্রায় ৩০ হাজার চিকিৎসকের মধ্যে ২৫ হাজার জনই সরকারি কাঠামোর বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

দেশের সিংহভাগ বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক গড়ে উঠেছে মূলত চারটি অপারেশনকে কেন্দ্র করে: সিজারিয়ান সেকশন, গল ব্লাডার, হার্নিয়া ও অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশন। এই ছোট ও মাঝারি মানের হাসপাতালগুলো মূলত সরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে, সেখানে নতুন পাস করা এমবিবিএস চিকিৎসকদের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত।

চাকরির বাজারে চাহিদা ও জোগানের এই চরম ভারসাম্যের অভাব চিকিৎসকদের পারিশ্রমিককে এক অবিশ্বাস্য তলানিতে নামিয়ে এনেছে। উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সুবিধার্থে অনেক তরুণ চিকিৎসক রাজধানী বা বড় শহরের বেসরকারি হাসপাতালে অন-কল বা চুক্তিভিত্তিক ডিউটি করেন, যা চিকিৎসা মহলে ‘খ্যাপ’ নামে পরিচিত। এখানে একজন এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসককে টানা ২৪ ঘণ্টা ইমার্জেন্সি ও ইনডোরের রোগীদের দেখভালের জন্য মাত্র ২ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যা একজন দিনমজুর বা রিকশাচালকের আয়ের চেয়েও পরিহাস-মূলকভাবে কম। মেধার এই চরম অবমূল্যায়ন দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী সন্তানদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের এক ধরনের অবহেলা ও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে।

আমাদের দেশে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি বড় ভূমিকা থাকে। প্রত্যেকেই নিজ এলাকায় একটি মেডিকেল কলেজ চান এই ভেবে যে, এতে এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসা পাবে। কিন্তু এই ধারণার ভেতরেই রয়েছে বড় গলদ। মেডিকেল কলেজ মূলত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এটি মূল ধারার সেবা কেন্দ্র নয়। সাধারণত মেডিকেল কলেজে হাসপাতাল নির্ধারিত থাকে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষাদানের জন্য, যেখানে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছাত্রের বিপরীতে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক বেড (যেমন: ১০০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৫০০ বেড) ও নির্বাচিত রোগী থাকতে হয়। অথচ আমরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে মূলত সেবা কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছি। এর ফলে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলো তাদের গুরুত্ব ও ফোকাস হারিয়েছে।

যদি উদ্দেশ্য হয় এলাকার মানুষকে সেবা দেওয়া, তবে জেলা হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বেডে উন্নীত করে ফাংশনাল করাই সবচেয়ে যৌক্তিক ও দ্রুততম সমাধান। নতুন একটি মেডিকেল কলেজকে পুরোপুরি সচল করতে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়, যা অনেক সময় উদ্যোগ গ্রহণকারী ব্যক্তির মেয়াদকাল বা জীবদ্দশাতেও শেষ হয় না।

মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটরা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মতো নন। একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর সামান্যতম শিক্ষা ঘাটতি সরাসরি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। অথচ দেশের নতুন ও বেশ কিছু পুরনো মেডিকেল কলেজের ভেতরের চিত্র অত্যন্ত করুণ।

এনাটমি, ফিজিওলজি, মাইক্রোবায়োলজি বা ফার্মাকোলজির মতো বেসিক ও প্যারাক্লিনিক্যাল বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। ফলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এ সকল মৌলিক বিষয়ে পর্যাপ্ত পাঠ গ্রহণ ছাড়াই শিক্ষার্থীরা চিকিৎসক হয়ে যাচ্ছেন।

মাগুরা, নওগাঁ, নেত্রকোণা বা রাঙ্গামাটির মতো ৮-১০টি মেডিকেল কলেজের নিজস্ব ক্যাম্পাস বা হসপিটাল ভবন পর্যন্ত নেই। রাঙ্গামাটির শিক্ষার্থীদের প্র্যাক্টিক্যাল ও ট্রেনিংয়ের জন্য চট্টগ্রামে আসতে হচ্ছে। সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে কারণ ভবন হলেও হাসপাতাল চালু হয়নি। মেধাবী শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও প্রয়োজনীয় শিক্ষক, হোস্টেল, ল্যাব বা একাডেমিক পরিবেশ পাচ্ছে না। এই তীব্র ঘাটতি নিয়েই তারা পাস করছে এবং বিএমডিসি থেকে লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে।

এখানে একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন দেখা দেয়। এই অপ্রস্তুত ও লার্নিং ঘাটতি থাকা চিকিৎসকদের কাদের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হচ্ছে? নিশ্চিতভাবেই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য। কারণ, যারা এসব কলেজের অনুমোদন দিচ্ছেন বা দেশের নীতিনির্ধারক, তাদের পরিবারের সামান্যতম অসুখ হলেও তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা দেশের নামী কর্পোরেট হাসপাতালে চলে যান। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও আমরা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিদেশে চিকিৎসার পেছনে বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয় দেখেছি। তাহলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব কার ওপর বর্তাচ্ছে?

এই আত্মঘাতী ভুলের বৃত্ত থেকে বের হতে হলে সরকারকে অবিলম্বে কতগুলো কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, যেসব মেডিকেল কলেজের নিজস্ব ক্যাম্পাস, একাডেমিক ভবন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষক ও শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নেই, সেগুলোতে অবিলম্বে নতুন ছাত্র ভর্তি বন্ধ রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো ও শিক্ষকহীন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি মানসম্পন্ন ও সক্ষমতাসম্পন্ন মেডিকেল কলেজে (যেমন: মাগুরা থেকে যশোর, নওগাঁ থেকে রাজশাহী ও নেত্রকোনা থেকে ময়মনসিং মেডিকেল কলেজ) স্থানান্তর করে তাদের শিক্ষা জীবন সুরক্ষিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হলেও, ডিপিপি তৈরি করে শতভাগ ভৌত অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাব এবং শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করার আগে কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করা যাবে না।

বর্তমানে সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক নিয়োগ মূলত সিভিল সার্ভিসের মেডিকেল ক্যাডারের ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসকরা প্রথমে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইচ্ছার ভিত্তিতে মেডিকেল কলেজে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে ক্লিনিক্যাল বিষয়ে তুলনামূলকভাবে শিক্ষক পাওয়া গেলেও বেসিক ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মেডিকেল কলেজের জন্য পৃথক শিক্ষক নিয়োগ কাঠামো প্রবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার আদলে সরাসরি শিক্ষক নিয়োগ অথবা সরকারি কলেজগুলোর মতো বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এর ফলে মেধাবী স্নাতকেরা কর্মজীবনের শুরু থেকেই একাডেমিক পেশাকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে বেসিক, প্যারা-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল—সব বিভাগেই পরিকল্পিতভাবে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং গবেষণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

উল্লেখ্য, অনেকের ধারণা যে উপযুক্ত আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করলে বেসিক ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়ে শিক্ষকের সংকট দূর করা সম্ভব। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। দেশে যতদিন ক্লিনিক্যাল চিকিৎসকদের জন্য প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ থাকবে, ততদিন কেবল বেতন বা আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধি করে এই সংকটের টেকসই সমাধান করা কঠিন। মূল বেতনের তিন বা পাঁচ গুণ অতিরিক্ত প্রণোদনা দিলেও অধিকাংশ চিকিৎসক ক্লিনিক্যাল ক্যারিয়ারকেই বেছে নেবেন, কারণ প্রাইভেট প্র্যাকটিস থেকে তারা যে আয় করতে পারেন, তা অতিরিক্ত প্রণোদনার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

ফলে বেসিক ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল বিষয়ে শিক্ষক সংকটের মূল কারণ কেবল আর্থিক নয়; এটি বিদ্যমান ক্যারিয়ার কাঠামোরও একটি সীমাবদ্ধতা। তাই এই সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য পৃথক ও আকর্ষণীয় একাডেমিক ক্যারিয়ার ট্র্যাক এবং বিষয়ভিত্তিক সরাসরি শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মেডিকেল কলেজ কোনো প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয় নয় যে একটি ভবন বা টিনের ঘর তুলে স্থানীয় লোকবল দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে পরবর্তীতে এমপিওভুক্তির জন্য অপেক্ষা করা যাবে। চিকিৎসকদের যথাযথ কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে এবং মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লাইসেন্সধারী চিকিৎসক তৈরি করে আমরা দেশের স্বাস্থ্য খাতকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। আজ যাদের ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে, আগামী দিনে তারাই দেশের চিকিৎসা খাতের নীতিনির্ধারক ও শিক্ষক হবেন। অদূরদর্শীভাবে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার এই চক্র সচল থাকলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। আশা করি, বর্তমান সরকার এই ভুলের বৃত্ত ভেঙে মেডিকেল কলেজে একটি টেকসই ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ নীতি প্রণয়নে সাহসী ভূমিকা রাখবেন।


লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ।