আলজাজিরার কলাম/যে কৌশলে শেখ হামাদ কাতারকে বিশ্বমঞ্চে অপরিহার্য করে তুলেছিলেন

আন্দ্রেয়া ক্রেইগ
যে কৌশলে শেখ হামাদ কাতারকে বিশ্বমঞ্চে অপরিহার্য করে তুলেছিলেন
কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে কাতার এমন একটি দেশ ছিল, যেখানে সবকিছু যেন বাইরের চাপে ঘটত। প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদে সমৃদ্ধ এই শান্ত উপদ্বীপটি তখন বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রান্তিক সীমানায় পড়ে থাকত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু রোববার দোহায় ৭৪ বছর বয়সে প্রয়াত হওয়া শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি সেই উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেছিলেন।

অনেকেই তার অর্জনকে কেবল কাতারের বিপুল সম্পদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন, কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো—তিনি কাতারকে শুধু ধনী করেননি, বরং বিশ্বমঞ্চে ‘প্রাসঙ্গিক’ করে তুলেছিলেন। একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে অপরিহার্য হয়ে ওঠাই হলো নিরাপত্তার প্রকৃত উপায়। ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা তার মৃত্যুর পরও টিকে থাকবে।

২০১৩ সালে যখন তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, তখন কাতার এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে, আয়তনে অনেক বড় দেশগুলোর পক্ষেও কাতারের মতো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকা বা মধ্যস্থতা করা কঠিন ছিল।

এই পরিবর্তনের সূচনা হয় ১৯৯৫ সালের জুন মাসে, যখন শেখ হামাদ তার পিতার কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি প্রথাগত সতর্ক নীতির অবসান ঘটান। ছোট রাষ্ট্রের টিকে থাকার চিরাচরিত নিয়ম ছিল—শক্তিশালী দেশগুলোর সামনে মাথা নত করা, নিজে আড়ালে থাকা এবং পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকা। শেখ হামাদ সেই ধারণা উল্টে দিলেন।

সৌদি আরব ও ইরানের মতো দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীর মাঝখানে অবস্থিত কাতারকে তিনি এমনভাবে গড়ে তোলেন যে, তারা যেন অন্যদের জন্য ‘অপরিহার্য’ হয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অস্ত্রে সজ্জিত থাকার চেয়ে অন্যদের কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা বেশি নিরাপদ।

কাতার তার শাসনামলে যে অঢেল সম্পদ অর্জন করেছিল, তা ছিল কেবল একটি মাধ্যম। আসল কৃতিত্ব ছিল সেই সম্পদ দিয়ে তিনি কী নির্মাণ করেছিলেন তার ওপর। শেখ হামাদ বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস আধার ‘নর্থ ফিল্ড’-এর আয় ব্যবহার করে দেশের সীমানা ও প্রভাব বিস্তার করেন। ১৯৯৬ সালে ‘আল জাজিরা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দোহা প্রতিটি আরব পরিবার এবং প্রতিটি আরব সরকারের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করে।

কাতার এয়ারওয়েজ, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন এবং লেবানন, দারফুর ও ফিলিস্তিনে ধৈর্যশীল মধ্যস্থতা—এসবই ছিল একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। প্রতিটি পদক্ষেপই কাতারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপেক্ষা করা কঠিন করে তুলেছিল।

২০১২ সালে ওয়াশিংটনের অনুরোধে শেখ হামাদ যখন তালেবানকে দোহায় রাজনৈতিক অফিস খোলার অনুমতি দিলেন, ততদিনে রুমের সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কাতার নিয়মিত এমন সব আলোচনার আয়োজন করত, যা অন্য বড় ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নিজে করতে পারত না। দেশটির কূটনৈতিক যোগাযোগই হয়ে উঠেছিল তাদের আন্তর্জাতিক মুদ্রা।

শেখ হামাদ কেবল অর্থের বিনিময়ে কূটনীতি করেননি, বরং একটি জাতীয় আদর্শকে সামনে রেখেছিলেন। সম্পদের প্রাচুর্যের অনেক আগে থেকেই কাতার নিজেকে ‘কা’বাতুল মাদলুম’ (মজলুমের ক্বাবা) হিসেবে বিবেচনা করত। এটি ছিল নির্যাতিত ও নির্বাসিতদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল—যে ধারণাটি আমির জাসিম বিন মোহাম্মদ আল থানির নাভাতি কবিতায় ফুটে উঠেছিল, যেখানে বলা হয়েছে কাতারের শরণাপন্ন যে কেউ সুরক্ষিত থাকবে। শেখ হামাদ এই উত্তরাধিকারকে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ারে রূপান্তর করেন।

আল জাজিরা, যা অবহেলিতদের কণ্ঠস্বর হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছিল, তা ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমের প্রান্তিক মানুষদের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। রাজনৈতিক বিদ্রোহী ও নির্বাসিতদের জন্য উন্মুক্ত দুয়ার ছিল বিপ্লবের এক নতুন ধারা, যার মাধ্যমে তিনি অঞ্চলটিকে এক নতুন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

এটি কাতারকে আরব বিশ্বের আবেগের সাথে যুক্ত রাখে, বিশেষ করে ২০১১ সালের আরব বিপ্লবের সময়। নিপীড়িতদের প্রতি সংহতি প্রকাশে শেখ হামাদের কিছুটা আবেগী সমর্থন ছিল প্রভাবশালী, তবে তা অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকে তাকে সমালোচনার মুখেও ফেলেছিল।

দেশেও তিনি একই দর্শন মেনে চলতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ হওয়া উচিত মুক্ত এবং সরকার জনগণের জন্য পরিচালিত হবে। ১৯৯৯ সালে প্রথম পৌরসভা নির্বাচন এবং ২০০৩ সালে দেশের প্রথম সংবিধান প্রদানের মাধ্যমে তিনি নারী ও পুরুষ উভয়কেই ভোটাধিকার দেন।

তিনি স্ত্রী শেখা মোজা বিনতে নাসেরের সাথে মিলে কেবল গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণানির্ভর ‘জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি’ গড়ে তোলার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেন। যদিও শুরুতে রক্ষণশীল সমাজ এই দ্রুত পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তিনি পিছু হটেননি।

তিনি তার রেখে যাওয়া সমাজকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমাজের চেয়ে অনেক বেশি মুক্ত ও প্রগতিশীল করে গেছেন। মাথাপিছু আয় ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জনসেবার দিক থেকে কাতার আজ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।

২০১৩ সালে শেখ হামাদ অঞ্চলের রাজতন্ত্রের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থেকেও নিজ পুত্র শেখ তামিমের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া ছিল তার বিচক্ষণতার পরিচয়।

হামাদ দ্রুত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার মানুষ ছিলেন। নিজের পিতাকে হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর, বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন যাতে তার উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের হাতে এগিয়ে যেতে পারে। শেখ হামাদ কাতারকে এমন এক সার্বভৌমত্ব ও স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন, যার ফলে বিশ্বব্যবস্থা আর এই দেশটিকে এড়িয়ে যেতে পারে না। তিনি তার দেশকে ভবিষ্যৎ গড়ার এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আত্মপরিচয় দিয়েছেন।


লেখক: কিংস কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক। তিনি একই সাথে কিংস ইনস্টিটিউট অব মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের একজন ফেলো। বর্তমানে তিনি রয়্যাল কলেজ অব ডিফেন্স স্টাডিজে কর্মরত।