আলজাজিরার কলাম/ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল: বহুমাত্রিক চাপের নীলনকশা

ফারহাদ পাশাভান্দ
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল: বহুমাত্রিক চাপের নীলনকশা
তুর্কিয়ের আঙ্কারায় আয়োজিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে মিত্র জোটের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে (বাঁয়ে), যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (মাঝে) এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিতি কি শুধুমাত্র ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে একটি কূটনৈতিক সভায় অংশগ্রহণ ছিল, নাকি এর পেছনে ক্রমবর্ধমান ইরানবিরোধী বাগাড়ম্বর ও ইরান আক্রমণের নির্দেশের মতো কোনো প্রেক্ষাপট ছিল? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকে শুধুমাত্র উপরিভাগ দিয়ে বিচার করলে প্রকৃত সত্য বোঝা যাবে না।

গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ট্রাম্পের এই উপস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও ‘অক্ষ শক্তি’ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশের নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। এই বিন্যাসের মূল ভিত্তি হলো সরাসরি সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ সত্ত্বেও ইরান তার আচরণ, ক্ষমতার বিন্যাস বা কৌশলগত অবস্থানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনেনি।

সেই অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে ‘সরাসরি চাপ’ প্রয়োগের নীতি থেকে সরে এসে একটি বহুমুখী ও হাইব্রিড মডেলে প্রবেশ করছে। এই নতুন কৌশলে অভ্যন্তরীণ চাপ, ইরানের সীমান্তসংলগ্ন পরিবেশের পরিবর্তন, আঞ্চলিক জোট গঠন এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলোকে পুনর্গঠন করার মতো অনুষঙ্গগুলো একটি একক কৌশলগত কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করছে।

এই কৌশলগত পরিবর্তনের মূল যুক্তি হলো, ইরানকে কোনো একটি একক চূড়ান্ত আঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং বিভিন্ন স্তরে ধারাবাহিক ও সমন্বিত চাপের মাধ্যমে কাবু করতে হবে। উদ্দেশ্য কেবল ইরানের ওপর বাহ্যিক ব্যয় বৃদ্ধি করা নয়; বরং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যাতে দেশটির নীতিনির্ধারকরা তাদের সক্ষমতার বড় একটি অংশ অভ্যন্তরীণ, সীমান্ত ও আঞ্চলিক চাপ সামলাতেই ব্যয় করতে বাধ্য হয়। সহজ কথায়, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল হলো ইরানের অভ্যন্তরে, তার ভূ-রাজনৈতিক পরিধিতে এবং আঞ্চলিক সংযোগ নেটওয়ার্কজুড়ে একই সঙ্গে বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করা।

অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে, এই কৌশলটি সামাজিক চাপ তীব্রতর করার এবং জনগণের সহনশীলতা ধীরে ধীরে ক্ষয় করার ওপর নির্ভর করে। এর উদ্দেশ্য কেবল সাময়িক অসন্তোষ বা সংকট তৈরি করা নয়, বরং জ্বালানি, পানি, পরিবহনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং জনসেবামূলক ব্যবস্থা ব্যাহত করে শাসন পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে তোলা। নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি এই ধরনের চাপ ইরানের নীতিনির্ধারণী সক্ষমতাকে ব্যাপক কৌশলগত অগ্রাধিকার থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সংকট ব্যবস্থাপনায় মনোনিবেশ করতে বাধ্য করতে পারে।

তবে ইরানের সীমান্তসংলগ্ন পরিবেশকে পরিবর্তন না করলে এই কৌশলের পূর্ণ কার্যকারিতা পাওয়া সম্ভব নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে চাইছে, যাতে তেহরান একই সঙ্গে কয়েকটি সীমান্ত মোর্চায় জড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ব্যাপক সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযান সত্ত্বেও হিজবুল্লাহকে ক্ষমতার সমীকরণ থেকে মুছে ফেলা যায়নি, তেমনি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকেও দমন করা সম্ভব হয়নি।

আনসারুল্লাহ (হুথি আন্দোলন) তাদের আঞ্চলিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি এবং ইরাকে প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত শক্তিগুলোকেও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্র থেকে অপসারিত করা যায়নি। এসব ব্যর্থতার কারণে ওয়াশিংটন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ইরানের সীমান্তসংলগ্ন পরিবেশকে পুনর্গঠন না করা পর্যন্ত দেশটিকে দুর্বল করা সম্ভব নয়।

এই কাঠামোর মধ্যে তিনটি পরিপূরক পথ চিহ্নিত করা যেতে পারে:

প্রথমত: পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পূর্বে অস্থিতিশীলতার ক্ষেত্রগুলো সক্রিয় করে ইরানকে তার সীমানা বেষ্টনীর মধ্যে ব্যস্ত রাখা।

দ্বিতীয়ত: লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে ইরাক ও ইয়েমেন পর্যন্ত ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানো।

তৃতীয়ত: মাঠ পর্যায়ে এমন কোনো সীমিত কিন্তু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা, যা ইরানকে পিছু হটিয়ে তার আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

এই যুক্তিতে, সীমিত অভিযান বা ইরানের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কেন্দ্রের ওপর চাপকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর কৌশলগত নকশার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

এই প্রেক্ষাপটে, তুরস্কের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনটি কেবল একটি রুটিন বৈঠক নয়, বরং এর গুরুত্ব অনেক বেশি। এটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার ফোরামই শুধু নয়, এটি ইরান ইস্যুকে পশ্চিমা নিরাপত্তার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্র ইরান ইস্যুকে দ্বিপাক্ষিক বিরোধের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে পশ্চিমা জোটের একটি অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত করতে চাইছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, ন্যাটো কেবল একটি সামরিক জোট নয়, বরং ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও বয়ানভিত্তিক সমকক্ষতা তৈরির একটি মাধ্যম।

এই সম্মেলনে ট্রাম্পের উপস্থিতিকে চারটি পারস্পরিক সংযুক্ত লক্ষ্যের আলোকে বোঝা যেতে পারে:

প্রথম লক্ষ্য—ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধতাকে শক্তিশালী করা: যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত বাণিজ্য ও জ্বালানি রুট রক্ষার মতো বিষয়গুলোকে ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের বড় ধরনের ঐক্য নিশ্চিত করতে চাইছে। হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এবং পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিতিশীলতার ফলে ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় প্রভাবের বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটন ইউরোপের উদ্বেগকে তার নিজস্ব ইরানবিরোধী অগ্রাধিকারের সাথে যুক্ত করতে চাইছে। তবে কিছু ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে, এই ঐকমত্য এখনো অসম্পূর্ণ এবং ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের প্রচারণায় ইউরোপকে পূর্ণ অংশীদার হিসেবে পাওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এখনো সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন।

দ্বিতীয় লক্ষ্য—ভবিষ্যৎ পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া: ওয়াশিংটন ভালোভাবেই অবগত যে, ইরানের বিরুদ্ধে একক কোনো পদক্ষেপ বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি ব্যয় বহন করে। তাই তারা বহুজাতিক ঐক্যের মাধ্যমে পরবর্তী যেকোনো পদক্ষেপকে একটি সম্মিলিত ও আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য বয়ানের কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করতে চাইছে। এই অর্থে, জোট গঠন কেবল শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যম নয়, বরং চাপের পরবর্তী ধাপগুলোর জন্য বৈধতা তৈরির একটি হাতিয়ার।

তৃতীয় লক্ষ্য—তুরস্কের সঙ্গে সমন্বয় এবং এর সীমান্তবর্তী সক্ষমতাকে কাজে লাগানো: আঙ্কারাকে দেওয়া যেকোনো ছাড়কে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক পরিকল্পনার সঙ্গে তুরস্ককে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বুঝতে হবে। ইরানকে ঘিরে থাকা সীমান্ত, জাতিগত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গতিপ্রকৃতি বিশেষ করে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এই কৌশলে একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শগুলোকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো মূলত ইরানের সীমান্তের পরিধিজুড়ে চাপের উৎসগুলোকে সক্রিয় করার একটি অংশ।

চতুর্থ লক্ষ্য—লেবাননের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং হিজবুল্লাহর ওপর চাপ তীব্র করার জন্য সিরিয়ার সক্ষমতাকে ব্যবহার করা: এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সিরিয়ার ঘটনাপ্রবাহ কেবল ওই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি লেবাননের সমীকরণকে নতুন করে সাজাতে এবং প্রতিরোধ শক্তির ওপর অধিকতর চাপ প্রয়োগের একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। যদি আমরা এই ধারণাকে মেনে নিই যে, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া, লেবানন ও তুরস্কের বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করছে, তবে এই চারটি লক্ষ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত একই শিকলের বিভিন্ন কড়ি, যা ইরান এবং ‘অক্ষ শক্তি’র ওপর রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মাঠপর্যায়ের চাপ বাড়াতে তৈরি করা হয়েছে।

এই মাত্রাগুলোর পাশাপাশি, একই কৌশলগত স্থাপত্যের সেবায় আরও বেশ কিছু বিষয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। গাজায়, জায়নবাদী (ইসরায়েলি) শাসকগোষ্ঠী হামাসের রাজনৈতিক প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে বলে মনে হয়।

তথাকথিত ‘ইয়েলো জোন’ বা নিরাপত্তা বাফার জোনের বাইরের এলাকাগুলোতে পুনর্গঠন বিরোধিতার মাধ্যমে তারা এখন একটি নতুন জনতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক বিন্যাস স্থায়ী করতে চাইছে। বিষয়টি কেবল গাজার রাজনৈতিক শাসন নয়, বরং ভূখণ্ডটিকে একটি অবরুদ্ধ, ক্লান্ত ও সীমাবদ্ধ পরিবেশে রূপান্তর করা, যাতে ইসরায়েল তার মনোযোগ পশ্চিম তীরের দিকে সরিয়ে নিতে পারে। সেখানে তাদের লক্ষ্য হলো নিরাপত্তা স্থিতিশীল করা, প্রতিরোধ শক্তিকে দমন করা এবং পশ্চিম তীরকে যেন কোনো সক্রিয় ও টেকসই সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হতে না দেওয়া। তাই, গাজা ও পশ্চিম তীর আলাদা কোনো বিষয় নয়, বরং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে দমনের একক কৌশলের দুটি পার্শ্বদেশ।

ইয়েমেনের ক্ষেত্রেও আনসারুল্লাহ বিষয়ক কর্মকাণ্ড নতুন পর্যায়ে প্রবেশের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এই মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইসরায়েল প্রায় আট মাস আগে মোসাদের ভেতরে একটি ‘ইয়েমেন ডেস্ক’ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা জায়নবাদী শাসকদের গোয়েন্দা ও সামরিক হিসাব-নিকাশে এই বিষয়টির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে নির্দেশ করে। এখন হয়তো এই ডেস্কের কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় এসেছে, যার ফলে অদূর ভবিষ্যতে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যভেদী পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি এই ধারা সক্রিয় হয়, তবে ইয়েমেন ‘অক্ষ শক্তি’র বিরুদ্ধে চলমান বহুমাত্রিক চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।

ইরাকেও প্রতিরোধ শক্তির সাথে যুক্ত শক্তিগুলোকে দমন বা দুর্বল করা যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ডার একটি স্থায়ী অংশ, যা অন্যান্য আঞ্চলিক ঘটনার প্রেক্ষাপটের কারণে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিণামে, আমরা কেবল বিক্ষিপ্ত কিছু সংকটের মুখোমুখি নই; বরং পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে বহুমুখী নকশায় পরিচালিত পরস্পর সংযুক্ত একটি জটিল বলয়ের মুখোমুখি হচ্ছি।

সামগ্রিকভাবে, এসব ঘটনাপ্রবাহ নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র একক কোনো যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আন্তঃসংযুক্ত চাপের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করছে। অভ্যন্তরীণ চাপ, ইরানের সীমান্ত বরাবর চাপ, আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে পরিচালিত চাপ সবই এই অভিন্ন স্থাপত্যের অংশ। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যকে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসকদের অনুকূলে পুনর্নির্ধারণ করা এবং ইরানকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে একই সঙ্গে উদ্ভূত সংকট সামলাতে বাধ্য করা।

যাইহোক, এই কৌশল নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হতে বাধ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলো দেখিয়েছে যে, অনেক মার্কিন ও জায়নবাদী পরিকল্পনা সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক সমর্থন এবং জটিল নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও মাটির বাস্তবতাকে যখন মোকাবিলা করতে হয়েছে, তখন সেগুলো ক্ষয়, বিশৃঙ্খলা এবং ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

এ ছাড়া ইরান ও ইরাকে শহীদ কমান্ডারের জানাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণ আবারও প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিম এশিয়ায় কোনো প্রকৃত ও টেকসই ব্যবস্থা আমেরিকান কোনো প্রকৌশলের মাধ্যমে তৈরি হবে না; বরং তা গড়ে উঠবে জাতিসমূহের সামাজিক ইচ্ছা, প্রতিরোধের ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং আধিপত্যের বিরোধিতার মাধ্যমে গড়ে ওঠা গভীর বন্ধনের ওপর।

সুতরাং, ওয়াশিংটন যদিও আরও জটিল ও বহুমুখী নকশার মাধ্যমে ইরান ও ‘অক্ষ শক্তি’র ওপর চাপ পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করছে, কিন্তু এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে, পূর্ববর্তী অন্যান্য ধারার মতোই এই প্রকল্পটিও তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা, ক্লান্তি এবং চূড়ান্ত পরাজয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। তাই পশ্চিম এশিয়ার উদীয়মান ব্যবস্থাকে মার্কিন ইচ্ছার ফসল হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটি আরোপিত ও কৃত্রিম প্রকল্পগুলোর ওপর জনপ্রিয় এবং গভীরভাবে প্রোথিত একটি স্বাধীন ব্যবস্থার ক্রমান্বয়ে জয়লাভের ফসল।


বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং তা আল জাজিরার সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।


লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক