ডেভিড হার্স্টের কলাম/ইসরায়েলের ‘পরম বন্ধু’ থেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’, ট্রাম্পই কি আমেরিকার শেষ জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট?

ডেভিড হার্স্ট
ইসরায়েলের ‘পরম বন্ধু’ থেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’, ট্রাম্পই কি আমেরিকার শেষ জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট?
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফ্লোরিডায় মার-এ-লাগো ক্লাবে প্রবেশের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডানে) ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বামে)। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের রোষানল থেকে কারও নিস্তার নেই। তারা যখন ক্ষুব্ধ হয়, তখন তাদের সেই ক্রোধের কোনো সীমা থাকে না। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের দীর্ঘ ইতিহাসে কয়েক সপ্তাহ সময় আসলে চোখের পলক মাত্র। কিন্তু এই কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান আকাশ থেকে মাটিতে আছড়ে পড়েছে।

এক সময় তিনি ইসরায়েলে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, রসিকতা করে নিজেকে দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য দাবি করতেন। অথচ এখন তিনি সেখানে চরম ঘৃণার পাত্র। ইসরায়েলিরা এখন তাকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় শত্রু বা ‘আমালেক’ হিসেবে গণ্য করছে।

ইসরায়েলের সরকার সমর্থক বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের সমালোচনায় কোনো ছাড় দিচ্ছেন না। ট্রাম্পের প্রতি তাদের ঘৃণা কতটা তীব্র, তার কিছু নমুনা দেওয়া যাক। ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল ১৪-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ইনন মাগাল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি ‘লুজার’ বা ব্যর্থ মানুষ বলে গালি দিয়েছেন। এমনকি তিনি ট্রাম্পের ইহুদি জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিভ উইটকফকে ‘ছোটলোক ইহুদি’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াকভ বারদুগো আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। তিনি ট্রাম্প ও তার রানিং মেট জেডি ভ্যান্সকে বর্তমান সময়ের ‘চেম্বারলেন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন ১৯৩৮ সালে হিটলারকে তোষণ করার জন্য কুখ্যাত হয়ে আছেন। বারদুগোর মতে, ট্রাম্পও এখন শত্রু তোষণের নীতি নিয়েছেন।

ধনকুবের মরিয়ম অ্যাডেলসনের মালিকানাধীন পত্রিকা ‘ইসরায়েল হায়োম’ ও চ্যানেল ১২-এর প্রধান বিশ্লেষক অমিত সেগালও ট্রাম্পকে আক্রমণ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দিয়ে ট্রাম্প আসলে তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। অন্যদিকে, ডানপন্থি চ্যানেল ১৪-এর সঞ্চালক শিমন রিকলিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আমেরিকা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, এখন আর কেউ আমেরিকার মিত্র হতে চাইবে না।

এই সমালোচকদের সবাই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তাদের অনেককেই নেতানিয়াহুর ‘মুখপত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারা সবাই মিলে ট্রাম্পের ব্যাপারে এখন ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন। অথচ এই ট্রাম্পই তার প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলকে দুহাত ভরে দিয়েছেন। তিনি অধিকৃত গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করেছিলেন। আমেরিকার পূর্ববর্তী কোনো প্রেসিডেন্টই এমন সাহস দেখাননি।

ট্রাম্পই ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ডেভিড ফ্রাইডম্যানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ফ্রাইডম্যান ছিলেন অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের কট্টর সমর্থক। তিনি নিরপেক্ষতার কোনো তোয়াক্কা করতেন না। অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি এলাকা সিলওয়ানে একটি সুড়ঙ্গ উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভেঙেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার বিদ্বেষী অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনেও ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা হলেন মরিয়ম অ্যাডেলসন। তিনি ট্রাম্পের নির্বাচনী তহবিলের তৃতীয় বৃহত্তম দাতা। এমনকি হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নেতানিয়াহুকে কখনও বেগ পেতে হতো না। কারণ ট্রাম্পের কানে কানে পরামর্শ দেওয়ার জন্য জ্যারেড কুশনারের মতো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সবসময় প্রস্তুত থাকতেন।

অনুগত থেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’

গাজায় ইসরায়েল যে গণহত্যা চালাচ্ছে, ট্রাম্প তার শুরু থেকেই পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। আজও তিনি সেই অবস্থানেই অনড় আছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্পের জামাতা কুশনার ছিলেন ‘বোর্ড অব পিস’-এর মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি গাজাকে নিয়ে এক অদ্ভুত ও অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল গাজাকে উচ্ছেদ করে সেখানে ভূমধ্যসাগরীয় সৈকত সংলগ্ন বিলাসবহুল রিসোর্ট বা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা। এত কিছুর পরও ইসরায়েলিরা এখন ট্রাম্পকে তাদের শত্রুর তালিকায় ঠাঁই দিচ্ছে।

এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তটি ট্রাম্প একরকম হুট করেই নিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং মোসাদের তৎকালীন পরিচালক ডেভিড বার্নিয়ার ব্রিফিং শোনার পরই তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। কোনো বিদেশি নেতার মার্কিন সিচুয়েশন রুমে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে এটাই প্রথম ছিল।

এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কোনো বিদেশি নেতার মাধ্যমে এত সহজে প্রভাবিত করা যায়নি। আবার ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রীও আগে কখনো মার্কিন প্রশাসনের এত গভীরে পৌঁছাতে পারেননি। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আজ সেই ট্রাম্পকেই তারা ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে গালি দিচ্ছে।

এখন আসল প্রশ্ন হলো, এই ফাটল আসলে কতটা গভীর? এটি কি স্থায়ী কোনো পরিবর্তন? ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যিনি ইসরায়েলকে তাদের চিরস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সব রসদ দিয়েছেন। এমনকি ইসরায়েল যা চেয়েছে, ট্রাম্প তার চেয়েও বেশি দিয়েছেন। তবে কি ইতিহাসের পাতায় ট্রাম্পই আমেরিকার শেষ জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নাম লেখাতে যাচ্ছেন?

জায়নবাদের ইতিহাসে এ ধরনের ফাটল অবশ্য নতুন কিছু নয়। জায়নবাদীরা যে পরাশক্তির ওপর নির্ভর করে বড় হয়, পরে তাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরে—এমন উদাহরণ ইতিহাসে ভুরি ভুরি আছে।

ঐতিহাসিক সেই পুরনো ধরন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রায় আড়াই লাখ ইহুদি শরণার্থী আটকা পড়েছিল। ব্রিটিশ সরকার তখন ফিলিস্তিনে ১ লাখ ইহুদির প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর প্রতিবাদে ইহুদি আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপগুলো একজোট হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে তারা ফিলিস্তিনে ৭৮০ জনের বেশি ব্রিটিশ সৈন্য, পুলিশ ও বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডগুলো চালিয়েছিল মূলত ‘ইরগুন’ এবং ‘স্টার্ন’ (লেহি) নামের দুটি সন্ত্রাসী গ্যাং।

অথচ এই ব্রিটেনই ১৯১৭ সালে বালফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে ব্রিটেন আরব নেতাদের দেওয়া নিজেদের পুরোনো প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করেছিল।

ইহুদি সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ছিল ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই। তারা জেরুজালেমে ব্রিটিশ প্রশাসনের সদর দপ্তর ‘কিং ডেভিড হোটেল’ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। এই হামলায় ৯১ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। ইসরায়েল আজও এই নিহত ব্রিটিশদের কবরের কোনো সম্মান দেয় না। অথচ যারা এই বোমা হামলা চালিয়েছিল, ইসরায়েল তাদের জাতীয় বীর হিসেবে পুজো করে।

২০০৬ সালে ‘মেনাখেম বেগিন হেরিটেজ সেন্টার’ এই হামলার স্মরণে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মেনাখেম বেগিন ছিলেন ইরগুন সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের নেতা এবং এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। পরে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। ওই হামলায় নিহত সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্রিটিশ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার পিটার স্মিথ-ডরিয়েনের কবরটি আজও নামফলকহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

ইহুদি সন্ত্রাসীদের হাত থেকে সেই ব্যক্তিও রেহাই পাননি, যিনি হলোকাস্টের সময় ইহুদিদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। লেহি বা স্টার্ন গ্যাং সুইডিশ কূটনীতিক কাউন্ট ফোক বার্নাডোটকে হত্যা করে। এই ব্যক্তি যুদ্ধের শেষ মাসগুলোতে নাৎসিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে ৪ হাজারেরও বেশি ইহুদিকে মুক্ত করেছিলেন। যুদ্ধের পর তিনি জাতিসংঘ মনোনীত প্রথম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। তার বড় ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব করেছিলেন এবং ত্রাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

ইসরায়েলের ইতিহাসে এই অকৃতজ্ঞতার চিত্র বারবার ফিরে আসে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিদায় নেওয়ার আগে ইসরায়েলকে ১০ বছরের জন্য ৩৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল সামরিক সহায়তা দিয়ে যান। এটি ছিল আমেরিকার ইতিহাসে কোনো দেশকে দেওয়া সবচেয়ে বড় সহায়তা।

ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লাইম সে সময় গার্ডিয়ানে লিখেছিলেন, “নেতানিয়াহু ওবামার এই বদান্যতার প্রতিদান দিয়েছেন চরম অকৃতজ্ঞতা ও গালিগালাজ দিয়ে। তিনি ওবামাকে আক্রমণ করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেননি। ২০১২ সালের মার্কিন নির্বাচনে তিনি সরাসরি রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের অবমাননা করেছিলেন। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি ভেস্তে দিতে তিনি সব ধরনের কূটচাল চালিয়েছিলেন। যে হাত আপনাকে খাবার দেয়, সেই হাতে কামড় দেওয়ার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর হয় না। নেতানিয়াহুর আচরণ তাকে একজন ‘ভয়ংকর মিত্র’ হিসেবে প্রমাণ করেছে।”

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একইভাবে নেতানিয়াহুর রোষানলে পড়েছেন। বাইডেন ব্যক্তিগতভাবে একজন কট্টর জায়নবাদী হওয়া সত্ত্বেও তাকে অপমানিত হতে হয়েছে। ইসরায়েলি জেনারেল আমোস গিলাদ লিখেছেন, বাইডেনের প্রতি নেতানিয়াহুর এই নজিরবিহীন তিরস্কার আসলে চরম অকৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ এবং এটি ইসরায়েলের জন্য একটি বড় কৌশলগত পরাজয়।

যুক্তরাষ্ট্র হলো ইসরায়েলের একমাত্র প্রকৃত মিত্র। আর জো বাইডেন ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন প্রেসিডেন্ট। বাইডেন কিংবা সিনেটে ডেমোক্র্যাটিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমারকে গালি দেওয়ার পেছনে কোনো কৌশলগত যুক্তি নেই। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলের বদলে এখানে সস্তা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

জায়নবাদের আসল চেহারা

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, জায়নবাদ এখন তার আসল উগ্রবাদী চেহারা দেখাচ্ছে। এমনকি নেতানিয়াহুর অধীনে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মোশে ইয়ালোনও একই কথা বলছেন। ওয়াইনেট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ালোন বলেন, ধর্মীয় জায়নবাদী আন্দোলনের একাংশ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই গোষ্ঠীগুলো মূলত ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ আদর্শ ধারণ করে।

ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের বর্তমান বিরোধের মূলে রয়েছে এক মানসিক ধাক্কা। একটি বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ বা ‘সেটলার কলোনি’ যখন বুঝতে পারে যে তারা তাদের ‘অভিভাবক’ রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে, তখন তারা এমনই ধাক্কা খায়। ইয়ালোন প্রশ্ন তুলেছেন, “ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদ আসলে কী? হলোকাস্টের ৮০ বছর পর এটি হলো নাৎসিদের লেখা ‘মাইন কাম্ফ’-এর উল্টো সংস্করণ। তারা মনে করে যে আমরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি।”

ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী এই ধারণা এখন ইসরায়েলের মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নাফতালি বেনেট যখন ইরান বা ফিলিস্তিনিদের নিয়ে কথা বলেন, তখন এই উগ্র মানসিকতা স্পষ্ট বোঝা যায়। অথবা সাধারণ ইসরায়েলি ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের নিয়ে যে ভাষায় কথা বলে, তা থেকেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়।

ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের এই বিরোধের পেছনে কাজ করছে নতুন এক পরিস্থিতির ধাক্কা। এই ধাক্কাটি মূলত একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি ইসরায়েলকে যুদ্ধ থামাতে বলছেন। এটি সেই ধরনের ধাক্কা, যা কোনো উপনিবেশ তখনই অনুভব করে, যখন সে দেখে যে অভিভাবক রাষ্ট্রের ওপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

একই ধরনের ধাক্কা খেয়েছিলেন ১৯৫৮ সালে আলজেরিয়ার ফরাসি বসতি স্থাপনকারীরা (পিয়েড-নোয়ার)। তারা চার্লস দ্য গলকে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ফরাসি এই প্রেসিডেন্ট যখন আলজেরিয়ার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিলেন, তখন তারা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলেন।

অথবা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইউনিয়নানপন্থিদের ক্ষোভের কথাই ধরুন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ছিলেন তাদের সবচেয়ে বড় আদর্শ। কিন্তু থ্যাচার যখন অ্যাংলো-আয়ারিশ চুক্তিতে সই করলেন, তখন তারা প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়ায় ডাবলিনকে (আয়ারল্যান্ড) কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

বিষাক্ত সুনামি

ইসরায়েলের ভেতরে যা-ই ঘটুক না কেন, আটলান্টিক মহাসাগরের অপর পারে মার্কিন জনমতের ওপর এর এক মারাত্মক বিষাক্ত প্রভাব পড়ছে। গাজায় গণহত্যা, ইরানের ওপর ব্যর্থ যুদ্ধ এবং সিরিয়া, দক্ষিণ লেবানন ও গাজা থেকে ইসরায়েলের সরে না আসার একগুঁয়েমি আমেরিকার একটি আস্ত প্রজন্মের সমর্থনকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এটি কোনো বাড়িয়ে বলা কথা নয়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক—উভয় দলের ৫০ বছরের কম বয়সী অধিকাংশ মানুষ এখন ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। বর্তমানে ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশই ইসরায়েলের ওপর অসন্তুষ্ট। গত বছর এই হার ছিল ৫০ শতাংশ।

সামগ্রিকভাবে ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান এখন ইসরায়েলকে নেতিবাচক চোখে দেখেন। গত বছর এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। আর ৫৯ শতাংশ মানুষ এখন নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা হারিয়েছেন। তারা মনে করেন না যে বিশ্ব পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি সঠিক কাজ করবেন। গত বছর এই হার ছিল ৫২ শতাংশ। জনমতের এই পরিবর্তনের দিকটি এখন অত্যন্ত স্পষ্ট।

তবে এই পরিবর্তন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ঠিক কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনো সবার মধ্যে ঐকমত্য নেই। এই পরিবর্তন কবে নাগাদ মার্কিন নীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে, তা-ও অনিশ্চিত।

নিউইয়র্ক শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি বসতি। সেখানে সম্প্রতি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বর্তমান তিনজন কংগ্রেস সদস্য নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। এ ছাড়া স্থানীয় পাঁচটি আসনে এমন প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন যাদের মেয়র জোহরান মামদানী সমর্থন দিয়েছিলেন।

এর পরপরই এক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দীর্ঘদিনের আধিপত্য চুরমার করে দিলেন আইনজীবী ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মেলাত কিরোস। কলোরাডোর প্রথম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে তিনি জয়ী হয়েছেন। এই এলাকাটিতেই রাজ্যের রাজধানী ডেনভার অবস্থিত। কিরোস হারিয়েছেন ডায়ানা ডিগেটারকে। ডিগেটার প্রায় তিন দশক ধরে ক্যাপিটল হিলে রাজনীতি করছেন। তিনি ইসরায়েলপন্থি লবি ‘আইপ্যাক’ থেকে ১৬ লাখ ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনপন্থি সংগঠন ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস-অ্যাকশন’ বলছে, এই ফল প্রমাণ করেছে যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে আইপ্যাক এখন একটি ‘বিষাক্ত ব্র্যান্ড’ বা নাম। ডেমোক্র্যাট ভোটাররা এখন আর সেই সব আইনপ্রণেতাদের দেখতে চান না যারা গণহত্যাকে সমর্থন বা রক্ষা করেন। এটি নিশ্চিতভাবে আইপ্যাকের জন্য একটি বড় পরাজয়। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের কড়া সমালোচক তিনজন প্রার্থী আইপ্যাকের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের হারিয়ে দিয়েছেন।

তবে এই ফল কি সত্যিই ফিলিস্তিনপন্থি কোনো বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত? নাকি আইপ্যাকের ছাপ ছাড়াই ‘লিবারেল জায়নবাদী’রা নতুন করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে জায়গা করে নিচ্ছে? দলটি কি কেবল নেতানিয়াহু-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে? সেই সময়ে কি ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আবারও আগের মতো ব্যবস্থার মধ্যে গেঁথে যাবে?

বিজয়ীদের মধ্যে একজন হলেন ব্র্যাড ল্যান্ডার। তিনি নিউইয়র্কের ১০ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন। ল্যান্ডার আগে ইসরায়েলবিরোধী ‘বিডিএস’ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি নিউইয়র্ক সিটির কম্পট্রোলার থাকাকালীন ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস’-এ বিনিয়োগ বাড়িয়েছিলেন। তিনি নিজেকে একজন ‘লিবারেল জায়নবাদী’ হিসেবে পরিচয় দেন।

স্টকটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাজিয়া কাজী এই বিজয়ের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, একদিকে ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীরা এলবিটের কার্যক্রম ব্যাহত করার কারণে জেল-জুলুম খাটছেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিন আন্দোলনের কর্মীরাই ল্যান্ডারের বিজয় উদ্যাপন করছেন। এটি একটি বড় ধাক্কা।

কিরোসের জয়ের পর ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। আমেরিকার মানুষ এখন আর পুরনো ধাঁচের রাজনীতি পছন্দ করছে না।’ জোহরান মামদানী নিজেও একে শ্রমজীবী মানুষের জয় হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ভোটাররা মূলত অর্থনীতি, আবাসন সমস্যা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে জয়ী প্রার্থীরা তাদের বক্তৃতায় ঘরোয়া সমস্যা এবং গাজা গণহত্যা বন্ধের দাবিকে এক সুতায় বেঁধেছেন। তারা উভয় ক্ষেত্রেই প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।

এক দীর্ঘ যাত্রা

মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল লেভি মনে করেন, এই পরিবর্তন মাত্র শুরু। আমেরিকা ইসরায়েলকে তার সমর্থনের মাত্রা নতুন করে নির্ধারণ করার এক দীর্ঘ যাত্রার শুরুতে আছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর এই আন্দোলন কতটুকু ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে, তা এখনো দেখার বিষয়।

নীতি পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া হয়তো প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ধীর হবে। সামনে বড় সুযোগ আছে। তবে প্রভাবশালী লবি ও নিজেদের ভুলের কারণে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। সবচেয়ে বড় অভাব হলো একটি শক্তিশালী ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের অনুপস্থিতি, যা এই পরিবর্তনকে এগিয়ে নেবে।

তা সত্ত্বেও মার্কিন জনমতে এক বাস্তব পরিবর্তন এসেছে। ফিলিস্তিন ইস্যু এখন রাজনীতির এক কোণ থেকে উঠে এসে মূলধারায় জায়গা করে নিয়েছে। আগে একে কেবল বামপন্থীদের বিশেষ মাথাব্যথা বা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে দেখা হতো। এখন এটি সব রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়।

এমনকি আমেরিকার ডানপন্থীদের একাংশও এখন ইসরায়েলকে সম্পদ নয়, বরং ‘বোঝা’ হিসেবে দেখছে। শিশুসহ হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ হত্যা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরায়েলের তোয়াক্কা না করা আমেরিকার নিজস্ব ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। তাই ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রাখা এখন অনেকের কাছে আমেরিকার নিজস্ব ইমেজ পুনরুদ্ধারের পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ফিলিস্তিন নিয়ে আলোচনার কিছু নতুন সীমারেখা তৈরি হয়েছে। আলোচনার পরিধি বাড়লেও তা এখনো খুব নিয়ন্ত্রিত। আইপ্যাক বা লবির প্রভাব নিয়ে কথা বলা এখন অনেকটা সহজ হয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে আমেরিকার রাজনীতির ভেতরের সমস্যার দিকে আঙুল তোলা যায়। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার বা তাদের সংগ্রামের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাগুলো নিয়ে এখনো মূলধারায় খোলামেলা আলোচনা হয় না।

আমেরিকা হয়তো ধাপে ধাপে এক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। প্রথমে ফিলিস্তিনিদের কষ্টের প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়বে। এরপর স্থায়ী যুদ্ধের নেশায় মত্ত ইসরায়েলের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হবে। এর মাধ্যমেই আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রতি যে ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়ার চল ছিল, তার অবসান ঘটবে। এবং সবশেষে ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ অধিকারের স্বীকৃতি আসবে। এই লক্ষ্য অর্জনে হয়তো আরও কয়েকটি নির্বাচন পার করতে হবে।

নেতানিয়াহু বা তার উত্তরসূরিদের জন্য আমেরিকার ডানপন্থীদের কাছে ইসরায়েলকে ফের প্রাসঙ্গিক করা সহজ হবে না। ইরানের ব্যাপারে সুবিধা করতে না পেরে নেতানিয়াহু হয়তো লেবানন ও সিরিয়ায় দখল করা জমি ধরে রাখতে চাইবেন।

আর নিজের উগ্র ডানপন্থী জোট টিকিয়ে রাখতে এবং নির্বাচনে জিততে তিনি আবারও গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করবেন। তার সামনে আর কোনো পথ নেই। কিন্তু গাজায় নতুন করে হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে ইসরায়েলের প্রতি ঘৃণা আরও তীব্র হবে। উভয় দলের ভোটারদের মধ্যেই এই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।

গাজা যুদ্ধকে ইসরায়েলের ‘নাইন-ইলেভেন’ হিসেবে প্রচার করার কৌশলটি ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি টাকার কার্লসনের মতো রিপাবলিকান নেতারাও এখন ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ’ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। তারা এখন মনে করেন, পুরো ইসলাম ধর্মকে একটি অস্তিত্বগত শত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর সেই চেষ্টাটি ছিল ভুল।

আপাতত এই সংকট থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ নেই। ইসরায়েলপন্থী লবিগুলো সহজে হাল ছাড়বে না। মার্কিন রাজনীতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তারা শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে। কিন্তু ইসরায়েলকে সমর্থন করা যদি কেবলই গায়ের জোর বা ক্ষমতার বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায় এবং এর পেছনের আদর্শিক বিশ্বাস যদি কমতে থাকে, তবে জায়নবাদ বড় ধরনের বিপদে পড়বে।


লেখক পরিচিতি

ডেভিড হার্স্ট ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরব বিষয়ক একজন খ্যাতিমান ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। এর আগে তিনি ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর ফরেন লিডার রাইটার ছিলেন।

এ ছাড়া তিনি রাশিয়া, ইউরোপ ও বেলফাস্টে সংবাদ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। গার্ডিয়ানে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ‘দ্য স্কটসম্যান’ পত্রিকায় শিক্ষা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।