আল-জাজিরার কলাম/গোল করলে ‘দেশের ছেলে’, মিস করলেই ‘ভিনদেশি’!

বিশ্বকাপ ফুটবল সব সময়ই জাতীয় পরিচয়ের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। অনেকেই এই পরিচয়কে নিখাদ ও সরল মনে করেন। তবে ২০২৬ সালের আসর আমাদের অন্য কিছু দেখাল। আধুনিক জাতীয় পরিচয় বেশ জটিল ও বিতর্কমূলক। এটি মোটেও সরল কিছু নয়। যেকোনো বৈশ্বিক আসরের মতোই এই বিশ্বকাপ বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে।
মরক্কোর বিশ্বকাপ দলের দিকে তাকালেই চমৎকার একটি উদাহরণ মেলে। তাদের দলের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৯ জনই মরক্কোর বাইরে জন্মেছেন। এদের অনেকেই স্পেন বা ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। একসময় এই দুই ইউরোপীয় পরাশক্তি মরক্কোয় উপনিবেশ গড়েছিল।
দলটির এমন গঠনকাঠামো বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্ব, আনুগত্য, জাতীয় পরিচয় ও প্রবাসীদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামনে এসেছে উপনিবেশবাদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের বিষয়টিও।
পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই এমন জটিলতা চোখে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড় অভিবাসী পরিবার থেকে এসেছেন।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে এখন বর্জনশীল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যুগ চলছে। ওই দেশগুলোর অনেকেই জাতীয় পরিচয় নিয়ে তীব্র বিতর্কে মেতে আছে। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে বহু সংস্কৃতির দলগুলো।
এখানকার ঐতিহাসিক স্ববিরোধিতাগুলোও সহজে এড়ানোর উপায় নেই। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করা অনেক খেলোয়াড়ই প্রবাসী সম্প্রদায় থেকে এসেছেন। তাদের শেকড় এমন সব দেশে, যেখানে একসময় এই ইউরোপীয় দেশগুলোই উপনিবেশ গড়েছিল।
দলগুলোর গঠনকাঠামো আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কার জানিয়ে দেয়। আধুনিক জাতীয় পরিচয়কে আমরা উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও অভিবাসন থেকে সহজেই আলাদা করতে পারি না।
শুধু তা-ই নয়। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় দলের অভিবাসী পরিবারের খেলোয়াড়দের বেশির ভাগই জাতিগত সংখ্যালঘু। তারা শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে বসবাস করেন। জাতীয় ও জাতিগত পরিচয়ের এই সংযোগস্থলেই উত্তেজনা ও স্ববিরোধিতা সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে।
গত ২৯ জুন পেনাল্টি শুটআউটে মরক্কোর কাছে হেরে যায় নেদারল্যান্ডস। টুর্নামেন্ট থেকে তারা বাদ পড়ে যায়। এরপর পেনাল্টি মিস করা তিন কৃষ্ণাঙ্গ ডাচ খেলোয়াড় অনলাইনে বর্ণবাদী গালিগালাজের শিকার হন। ঘটনাটি আধুনিক জাতীয় পরিচয়ের মূলে থাকা এক পুরোনো স্ববিরোধিতাকেই উন্মোচিত করেছে। সংখ্যালঘু খেলোয়াড়েরা সফল হলে সমাজ তাদের আপন করে নেয়। কিন্তু ব্যর্থ হলেই মানুষ তাদের বাইরের লোক ভাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ববিরোধিতা
যুক্তরাষ্ট্র এবারের আসরের অন্যতম আয়োজক। কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে মিলে তারা বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। তাদের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃষ্টান্তমূলক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোকে রূপ দিয়েছে শ্বেতাঙ্গদের ক্ষোভ ও অভিবাসনবিরোধী অবস্থান। অন্তত আংশিকভাবে হলেও কথাটি সত্যি। ট্রাম্প বারবার শ্বেতাঙ্গদের বঞ্চনার কথা বলে মানুষের কাছে ভোট চেয়েছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ নেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, এসব পদক্ষেপ শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের মূল ধারণাকেই শক্তিশালী করে। ধারণাটি হলো, ‘শ্বেতাঙ্গরাই মার্কিন পরিচয়ের সমার্থক’।
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শরণার্থী কর্মসূচি স্থগিত করেন। এরপর তিনি একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
সম্প্রতি তার প্রশাসন এই কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়িয়েছে।এর মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের জন্য আরও ১০ হাজার অতিরিক্ত শরণার্থী কোটা তৈরি করেছে তারা। অথচ অশ্বেতাঙ্গ শরণার্থীদের তারা পুরোপুরি বাদ দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বেশির ভাগ অশ্বেতাঙ্গ অভিবাসীর ওপর নজিরবিহীন দমনপীড়ন চালিয়েছে।
২০২৫ সালে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) প্রায় ৪ লাখ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বেশির ভাগকেই ফেরত পাঠানো হয়। সম্প্রতি আইসিই এই তৎপরতা আরও বাড়িয়েছে। গত জুনের শেষের দিকে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে তারা ১০ হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করে।
ব্যাপক এই দমনপীড়ন নতুন শঙ্কা জাগিয়ে তোলে। অনেকেরই আশঙ্কা ছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো অন্তর্ভুক্তির চেয়ে বর্জনের জন্যই বেশি পরিচিতি পাবে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগের কয়েক সপ্তাহে ১২০টির বেশি মানবাধিকার গোষ্ঠী যৌথভাবে একটি ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এনএএসিপি এবং আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নও (এসিএলইউ) ছিল।
ওই আশঙ্কাগুলো অন্তত আংশিকভাবে হলেও সত্যি প্রমাণ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন পুরস্কারজয়ী সোমালি রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। তারা ইরান দলের ওপর কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ ছাড়া ইরাকের স্ট্রাইকার আয়মান হুসেইনকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর সাত ঘণ্টা আটকে রাখে তারা।
এমন এক বিশৃঙ্খল প্রেক্ষাপটকে সঙ্গী করেই যুক্তরাষ্ট্র শেষ ষোলোতে পৌঁছেছিল। অবশ্য এরপর বেলজিয়ামের কাছে হেরে তারা বিদায় নেয়। যুক্তরাষ্ট্র দলের ছয় সদস্যের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে। আর দলটির অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড়ের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে।
বোস্টন, ডালাস, আটলান্টা, হিউস্টন, লস অ্যাঞ্জেলেস, সিয়াটলসহ অন্যান্য মার্কিন শহরের স্টেডিয়ামগুলোতে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সমর্থকেরা ভিড় জমিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্পের সমর্থকেরাও ছিলেন। শ্বেতাঙ্গদের ক্ষোভের রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সদস্য তারা।
অথচ তারাই স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে ‘ইউএসএ’ বলে চিৎকার করেছেন। গলা ফাটিয়েছেন এমন একটি জাতীয় দলের জন্য, যেখানে ফোলারিন বালোগুন, আলেসান্দ্রো জেনদেজাস, হাজি রাইটের মতো অভিবাসী পরিবারের খেলোয়াড়েরা রয়েছেন। একে চরম পরিহাস ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।
প্রধান আয়োজক দেশের চেয়ে এই স্ববিরোধিতা আর কোথাও এত বেশি চোখে পড়ে না। আধুনিক জাতীয়তাবাদের অস্থিতিশীলতা ও স্ববিরোধিতাকে এবারের বিশ্বকাপ সবচেয়ে বেশি নগ্নভাবে দেখিয়েছে। আগের কোনো আসরে হয়তো এমনটা ঘটেনি।
রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো হয়তো জাতিকে জাতিগতভাবে সুসংহত হিসেবে কল্পনা করে। অথবা দেশগুলোকে তারা সাংস্কৃতিকভাবে অপরিবর্তনশীল ভাবতে পারে। কিন্তু ওই সব দেশের প্রতিনিধিত্ব করা দলগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প শোনায়। জাতীয় ফুটবল দলগুলো মূলত অভিবাসন, প্রবাসী ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসেরই ফসল। পাশাপাশি ‘আমরা’ ও ‘তারা’—এমন বিতর্কিত ধারণার প্রভাবও এই দলগুলোর ওপর রয়েছে।
দিন শেষে হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার সঙ্গে ফুটবলের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। ফুটবলের প্রতিভা, খেলার ধরন বা কোচের কৌশল—এসব ছাপিয়ে যাবে অন্য একটি বিষয়। এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষাটি হয়তো জাতীয় পরিচয় নিয়েই। অনেক জাতীয়তাবাদী জাতীয় পরিচয়কে যতটা অপরিবর্তনশীল বা সরল মনে করেন, বিষয়টি আসলে মোটেও তেমন নয়।
লেখক পরিচয়: অধ্যাপক, মিডিয়া স্টাডিজ প্রোগ্রাম, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ





