গার্ডিয়ানের কলাম/মানুষ আর প্রাণীর কাছে কি সময়ের ধারণা আলাদা, যা বলছে বিজ্ঞান

কল্পনা করুন, আপনি নিজের বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার মাথার ওপর দিয়ে একটি ভোমরা প্রচণ্ড গতিতে উড়ে গেল। এতটাই দ্রুত যে, চোখের পলকে সেটি অদৃশ্য হয়ে গেল। একটি চড়ুই পাখি বেড়া থেকে উড়ে গিয়ে গাছে বসল। আর একটি শামুক ধীরলয়ে পাথরের ওপর দিয়ে শরীর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ধরে নিন, এই প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব এক জগতের অভিজ্ঞতা আছে। তাদের কাছে সময় কীভাবে ধরা দেয়? সহজ করে বললে, তারা কি আমাদের মতোই সময়ের প্রবাহ অনুভব করে?
বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন যে মানুষ, মৌমাছি, চড়ুই বা শামুক—সবারই আলো বা শব্দ গ্রহণের ক্ষমতা আলাদা। অর্থাৎ, আমরা সবাই আলাদাভাবে দেখি এবং শুনি। কিন্তু আমাদের গবেষণা দল সম্প্রতি একটি পর্যালোচনা করেছে। আমরা জানতে চেয়েছি, সময়ের প্রবাহ বা অভিজ্ঞতার ধারা কি আমাদের মতো অন্য প্রাণীদের কাছেও একইভাবে ধরা দেয়?
বিভিন্ন প্রাণী তাদের ইন্দ্রিয় থেকে আসা তথ্যগুলো কীভাবে সাজায়, তা বুঝতে পারলে আমরা তাদের জগত সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারব। প্রতিটি প্রাণী সময়কে কীভাবে ভাগ করে নেয়, তা বোঝা তখন সহজ হবে। এই বিষয়টিকে আমরা বলছি ‘টাইমস্কেপ’ (Timescape)। অভিজ্ঞতার একটি ধারা কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে তা সময়ের সঙ্গে বদলে যায় এবং পূর্ণতা পায়—টাইমস্কেপ মূলত সেটাই। প্রাণীরা কি ভিন্ন ভিন্ন টাইমস্কেপে বাস করে? এটি জানার একটি উপায় হলো সময়ের বিভ্রম বা ‘টেমপোরাল ইলিউশন’ নিয়ে গবেষণা করা।
একটি গরু তার পিঠ চুলকানোর জন্য লাঠি ব্যবহার করতে পারে। আমরা মানুষরা যে আসলে খুব বেশি বিশেষ কিছু নই, তা আমরা আর কবে বুঝব?
সময়ের বিভ্রমের একটি উদাহরণ হলো শ্রুতি বিভ্রম (অডিটরি কন্টিনিউটি ইলিউশন)। ধরুন, আপনি একটি অডিও ক্লিপ শুনছেন। সেখানে একটি শব্দের কিছু অংশ মুছে ফেলে সেখানে শুধু স্থির যান্ত্রিক শব্দ (হোয়াইট নয়েজ) দেওয়া হয়েছে। ধরা যাক শব্দটি ছিল ‘হ্যাপি বার্থডে’। কিন্তু রেকর্ডিংয়ে শোনা যাচ্ছে ‘হ্যাপি ব... (যান্ত্রিক শব্দ)... ডে’। তবুও আপনার মনে হবে আপনি পুরো শব্দটিই শুনেছেন। আপনার মস্তিষ্ক সেই হারানো অংশটুকু নিজে থেকেই পূরণ করে নেয়।
তবে এটি তখনই ঘটে, যখন যান্ত্রিক শব্দটি মাত্র ১০০ মিলিসেকেন্ডের মতো স্থায়ী হয় এবং এর পরপরই শব্দের বাকি অংশটুকু আসে। এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংশোধনের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কাঠবিড়ালি এবং স্টার্লিং পাখির ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। এই প্রাণীরা যখন তাদের স্বজাতীয়দের ডাক শোনে এবং মাঝখানে যান্ত্রিক শব্দ থাকে, তখনও তারা পুরো ডাকটিই বুঝতে পারে। মনে হয় তারা হারানো শব্দটুকু পূরণ করে নিচ্ছে। তবে এই সংশোধনের সময়কাল মানুষের তুলনায় অনেক কম। স্টার্লিং পাখির ক্ষেত্রে এই সময় মানুষের প্রায় অর্ধেক। আর কাঠবিড়ালির ক্ষেত্রে তা মানুষের মাত্র এক-চতুর্থাংশ।
সময়ের আরেকটি বিভ্রমের নাম হলো ‘ফ্ল্যাশ-ল্যাগ’ (Flash-lag) ইলিউশন। এটি ঘটে যখন আমরা কোনো দৃশ্যপটের বিভিন্ন বিষয় যেমন গতি এবং হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলোর সমন্বয় করতে চাই। ধরুন, একটি চলমান বস্তুর ঠিক নিচে একটি আলো জ্বলে উঠল। বস্তু ও আলো একই সরলরেখায় থাকা সত্ত্বেও আমরা দেখব যে আলোটি চলমান বস্তুর চেয়ে কিছুটা পেছনে রয়েছে। এর একটি ব্যাখ্যা হলো, আমাদের মস্তিষ্ক হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলোর চেয়ে একটি চলমান বস্তুর অবস্থান দ্রুত বুঝতে পারে। সময়ের এই পার্থক্যের কারণেই আমাদের মনে হয় আলোটি বস্তুর পেছনে রয়ে গেছে। অথচ বাস্তবে দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটেছিল।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, বানরদের ক্ষেত্রেও এই বিভ্রম ঘটে। তবে তাদের এই সময়ের পার্থক্য মানুষের চেয়ে কম। সম্ভবত বানরের মস্তিষ্ক আলো এবং গতির মধ্যে পার্থক্য আরও দ্রুত বুঝতে পারে। বন্য পরিবেশে প্রাণীদের আচরণের ওপর এই পার্থক্যের প্রভাব কী হতে পারে?
কিছু প্রজাতি শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে এই ‘ফ্ল্যাশ-ল্যাগ’ প্রভাবকে কাজে লাগায়। প্রজাপতির কথাই ধরুন। তাদের ডানার ওপরের অংশ খুব উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙের হয়। কিন্তু নিচের অংশ বেশ মলিন। ওড়ার সময় এই রঙের পরিবর্তন চোখের সামনে আলোর ঝিলিকের মতো মনে হয়। শিকারি প্রাণীর পক্ষে এই ঝিলিকের সঙ্গে প্রজাপতির আসল অবস্থানের সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘মোশন ড্যাজল’। আত্মরক্ষার জন্য বেশ কিছু প্রাণী সময়ের এই কৌশলটি ব্যবহার করে।
প্রাণীদের বংশবিস্তার বা যৌন আচরণের ক্ষেত্রেও ‘টাইমস্কেপ’ দারুণ ধারণা দিতে পারে। যেমন ভারতীয় ময়ূরের কথা বলা যায়। আমাদের ধারণা, ময়ূর যখন নাচে এবং তার পেখমের পালকগুলো কাঁপাতে থাকে, তখন এক ধরণের বিভ্রম তৈরি হয়। এই কাঁপুনির ফলে পেখমের চোখগুলো যেন পালকের সামনে ভেসে উঠছে বলে মনে হয়। একে বলা হয় ‘ফ্লিকার-ইনডিউসড ডেপথ’। পালকের কাঁপুনির গতির কারণে এই গভীরতার বিভ্রম তৈরি হয়, যদিও বাস্তবে কোনো গভীরতা থাকে না।
প্রাণীদের এই সময়বোধ কেবল তাদের বোঝার জন্যই নয়, বরং আধুনিক অবকাঠামো তৈরির কাজেও লাগানো যেতে পারে। যেমন—উইন্ড টারবাইন বা বায়ুকলের সঙ্গে পাখিদের সংঘর্ষ কমানো। এ ছাড়া রেললাইন বা মহাসড়ক থেকে প্রাণীদের সরিয়ে রাখতে উন্নত সতর্ক সংকেত তৈরি করা যেতে পারে। আবার পশুপাখির আবাসে তাদের সময়বোধের উপযোগী বিশেষ আলোর ব্যবস্থাও করা সম্ভব। আমাদের আশা, সময়ের এই অভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে প্রাণীদের অভিজ্ঞতা বুঝতে পারলে বিবর্তন ও চেতনার একটি যোগসূত্র তৈরি হবে। এতে আমরা এই পৃথিবীতে বসবাসের প্রকৃত রূপটি আরও স্পষ্টভাবে চিনতে পারব।
লেখক: ইশান সিংহল। তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স-এর সেন্টার ফর কনশাসনেস সায়েন্সের একজন রিসার্চ ফেলো।




