সোশ্যাল মিডিয়া: আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ মিথস্ক্রিয়া

তাইফুর রহমান
সোশ্যাল মিডিয়া: আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ মিথস্ক্রিয়া
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, এটি মানবীয় মনস্তত্ত্ব ও আচরণের এক বিশাল আয়না। ড্যানিয়েল গোলম্যান তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'Emotional Intelligence: Why It Can Matter More Than IQ'—এ দেখিয়েছেন যে, মানুষের জীবনে সফলতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিমত্তা (IQ)-র চেয়ে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (EQ) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে—সোশ্যাল মিডিয়ার চটকদার দুনিয়ায় আমাদের এই আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ঠিক কতটুকু টিকে আছে? 'Journal of Computer-Mediated Communication'—এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ফেস-টু-ফেস যোগাযোগের অভাব মানুষকে সামাজিক মাধ্যমে অনেক বেশি আবেগতাড়িত ও বেপরোয়া করে তোলে। আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অন্যের আবেগকে বোঝার এই অভাবই মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের অবক্ষয়ের প্রধান কারণ।

একটি সাধারণ পোস্ট বা সামান্য একটি কমেন্টের মাধ্যমেই আজ একজন মানুষের ভেতরের অজ্ঞতা ও নেতিবাচক দিকগুলো নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালজুড়ে আজ কুৎসিত ও কুরুচিপূর্ণ ভাষার ছড়াছড়ি। সামান্য বানান ভুলের মতো অসচেতনতা থেকে শুরু করে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে হীন প্রতিপন্ন করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। কোনো ধরনের সত্যতা যাচাই না করে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো এবং উদ্দেশ্যমূলক রিপোর্টগুলো শেয়ার করে সেই মিথ্যার অংশীদার হওয়া আজ নিত্যদিনের ঘটনা। মানুষের চরিত্রে কালিমা লেপন, শারীরিক গঠন নিয়ে ট্রোল বা বডি শেমিং এবং অন্যের ব্যক্তিগত ও গোপন বিষয় নিয়ে অনধিকার চর্চা করা যেন অনেকের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, গভীর জ্ঞানহীন "ভাসা ভাসা" বিদ্যা নিয়ে পণ্ডিতের ভাব ধরা এবং সেই যৎসামান্য জ্ঞান দিয়ে অন্যকে বিচার করা। রাজনৈতিক বা আদর্শিক অন্ধত্বের কারণে 'নিজের দল বা মতই সঠিক, বাকি সব বাতিল'—এমন চরমপন্থী মানসিকতা আজ স্পষ্ট। ধর্মীয় ক্ষেত্রে এই অজ্ঞতা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না রেখে কুরআন ও হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া, অন্য কোনো চিন্তাশীলের মন্তব্যের গভীরতা না বুঝে তাকে হুট করে 'ইসলামের শত্রু' বানিয়ে দেওয়া আজ অতি সাধারণ বিষয়। এরা ভুলে যায় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ধরে ইসলাম কায়েম হয়েছিল সুদীর্ঘ ২৩ বছরের পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ায়। অথচ আজ এক শ্রেণির মানুষ মনে করে এক দিনেই সব কায়েম করে ফেলবে! এই অবাস্তব ও উগ্র উপলব্ধির কারণে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কাজ করা প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের নামে প্রতিনিয়ত গীবত ও কুৎসা রটনা করছে। এমনকি নিজ দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থকে আগে চিন্তা করার মতো বিকৃত দেশপ্রেমও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এই সব ক্ষেত্রে ন্যূনতম বুদ্ধিমত্তা বজায় না রাখার কারণে মানুষের ভেতরের সব মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা ও ব্যক্তিত্বহীনতা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে, যা দেখে সমাজ তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

বাস্তব জীবনে আমরা যেভাবে ভদ্রতা, শালীনতা ও আইনের তোয়াক্কা করি, ঠিক একইভাবে মিডিয়ার জগতেও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা 'Emotional Intelligence' (EI)-এর সঠিক প্রয়োগ আজ সময়ের দাবি। নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা, কোনো মন্তব্য করার আগে তার সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব চিন্তা করা এবং অন্যের মতামতের প্রতি সহনশীল হওয়াই হলো ডিজিটাল দুনিয়ায় আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। বাস্তব জীবনের মতো ভার্চুয়াল জগতেও আমাদের প্রতিটি আচরণকে একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ফ্রেমে বাঁধতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সতর্ক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের ব্যাপারে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই পবিত্র কুরআনে শাশ্বত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা সূরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন: "হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে, যাতে অজ্ঞাতসারে তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন না করো এবং পরবর্তীতে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হতে না হয়।" একই সাথে মানুষের গীবত ও চরিত্র হননের ব্যাপারে সূরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) করো না।"

অতএব, আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি শেয়ার এবং প্রতিটি মন্তব্য যেন আমাদের বিবেকহীনতার প্রমাণ না হয়, বরং তা যেন আমাদের পরিপক্ব মনন ও উচ্চ আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। ডিজিটাল যুগের এই প্রযুক্তিকে ধ্বংসের হাতিয়ার না বানিয়ে আত্মশুদ্ধি ও মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: তাইফুর রহমান, ব্যাংকার ও কলামিস্ট।