সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা: স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি

রাষ্ট্র, সমাজ ও তথ্য এই তিনটি একটি ত্রিভুজের মতো পরস্পর নির্ভরশীল। এদের কোনো একটি দিক দুর্বল হলে পুরো কাঠামোই ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই রাষ্ট্র কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও নাগরিকমুখী, তার ওপরই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে। এ কারণেই একবিংশ শতাব্দীতে সুশাসন উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয়েছে।
সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, অংশগ্রহণমূলক শাসন এবং দক্ষতা। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম তথ্যের আলো ছড়িয়ে অস্বচ্ছতা দূর করে, ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং নাগরিকদের সচেতন করে তোলে। যেখানে তথ্য উন্মুক্ত থাকে, সেখানে দুর্নীতি ও অপব্যবহারের সুযোগ কমে যায়। আবার যেখানে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে, সেখানে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা দুর্বল হয়।
গণমাধ্যমকে প্রায়ই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কারণ এটি শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না; বরং রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে জবাবদিহিতার সেতুবন্ধন তৈরি করে। সংবাদপত্রকে ইতিহাসের প্রথম খসড়া বলা হয়, কারণ তা সময়ের ঘটনা, সংকট, অর্জন ও বিচ্যুতির প্রামাণ্য দলিল হয়ে ওঠে। একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম দুর্নীতি উন্মোচন করে, নীতি-আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে এবং নাগরিকদের তথ্যভিত্তিক মতামত গঠনে সহায়তা করে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম সুশাসনের অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মতো স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোতে তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সুইডেনে সরকারি নথিপত্র নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত থাকার ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছে, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে।
গণমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো ক্ষমতার ওপর নজরদারি করা। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যখন আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করার চেষ্টা করে, তখন গণমাধ্যম সেই বিচ্যুতি জনসমক্ষে তুলে ধরে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি, পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারস ও প্যান্ডোরা পেপারসের মতো আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো প্রমাণ করেছে যে সাহসী সাংবাদিকতা ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও গোপন আর্থিক কর্মকাণ্ড উন্মোচনে কতটা কার্যকর হতে পারে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, সত্যকে দীর্ঘদিন গোপন রাখা গেলেও শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিতার দাবিই ইতিহাসকে এগিয়ে নেয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গণমাধ্যমের অবদান অনস্বীকার্য। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাক্স্বাধীনতা অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সাংবিধানিক ভিত্তি। এই স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের অধিকার নয়; এটি নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকারও নিশ্চিত করে।
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীলতাও অপরিহার্য। হলুদ সাংবাদিকতা, অপতথ্য, গুজব ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে মিথ্যা তথ্য খুব দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যা আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বড় হুমকি। তাই তথ্য যাচাই, পেশাগত মান বজায় রাখা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা আধুনিক সাংবাদিকতার প্রধান শর্ত।
ডিজিটাল যুগ গণমাধ্যমের জন্য যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নতুন সংকটও তৈরি করেছে। তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা, উন্মুক্ত সরকারি তথ্য এবং নাগরিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনসাধারণের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভুয়া সংবাদ, কৃত্রিমভাবে তৈরি বিভ্রান্তিকর ভিডিও, ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক বিভাজন সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম শিক্ষার গুরুত্বও বেড়েছে, যাতে নাগরিকেরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম হন।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সরকারের সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম, তথ্যের উন্মুক্ততা এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ। গণমাধ্যম এই সমীকরণের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে কাজ করে। এটি রাষ্ট্রের আয়নার মতো সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। রাষ্ট্র চাইলে আয়না ভাঙতে পারে, কিন্তু নিজের মুখের বাস্তবতা বদলাতে পারে না। তাই গণমাধ্যমকে দমিয়ে রাখা মানে সমাজের চোখ ও কণ্ঠস্বরকে সীমাবদ্ধ করা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য সুশাসনকে কেবল বক্তৃতার বিষয় না বানিয়ে জাতীয় সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে হবে। একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও পেশাদার গণমাধ্যম সেই পথকে শক্তিশালী করতে পারে। যখন সাংবাদিকরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন, সরকার সমালোচনাকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে এবং নাগরিকেরা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তখনই প্রকৃত অর্থে সুশাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় হবে।
পরিশেষে বলা যায়, গণমাধ্যম শুধু সমাজের দর্পণ নয়; এটি গণতন্ত্রের প্রহরী, রাষ্ট্রের বিবেক এবং নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর ভূমিকা অপরিহার্য। সুশাসিত, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনের জন্য তাই মুক্ত, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের বিকাশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
(লেখক: কবি, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক)।





