ডেভিড হার্স্টের কলাম/ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য কি তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্য এবার কী করবে

ডেভিড হার্স্ট
ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য কি তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্য এবার কী করবে
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষক ডেভিড হার্স্ট। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে মার্কিন প্রশাসন দুটি পরস্পরবিরোধী চুক্তি সই করেছে। ইরানের ওপর শান্তির শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার যে ক্ষমতা ইসরায়েল হারিয়েছে, তারা এখন সেটি লেবাননের মাধ্যমে ফিরে পেতে চাইছে।

এ ক্ষেত্রে লেবানন সরকার ইসরায়েলকে বড় ধরনের সহায়তা করেছে। তারা নিজেদের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের করা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়ার আইনি অধিকারও তারা ছেড়ে দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছে। এই চুক্তিতে ওয়াশিংটন ইরান ও লেবাননের মধ্যে একটি স্পষ্ট যোগসূত্র মেনে নিয়েছে। তারা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

যদি এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়, তবে গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে সই হওয়া দ্বিতীয় চুক্তিটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। লেবানন, ইসরায়েল ও মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে ওই চুক্তিটি সই হয়েছিল। এই ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ বা রূপরেখা চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের বিশাল এলাকা দখল করে রাখা ইসরায়েলি বাহিনীকে সেখানে অনির্দিষ্টকাল থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

প্রথম চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দ্বিতীয় চুক্তিতে মিত্র ইসরায়েলের ওপর লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ওয়াশিংটন থেকে পরিচালিত একটি ‘সামরিক সমন্বয় গোষ্ঠী’ লেবাননের এই সার্বভৌমত্বকে আরও দুর্বল করেছে।

ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের ভেটোর কারণে লেবাননের সেনাবাহিনী অস্ত্রের দিক থেকে সব সময়ই দুর্বল। এই চুক্তি সেই দুর্বল সেনাবাহিনীকেই একটি যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে (হিজবুল্লাহ) নিরস্ত্র করার নির্দেশ দিচ্ছে। অথচ অনেক লেবাননি মনে করেন, ইসরায়েলি হামলা ও বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহই একমাত্র কার্যকর রক্ষাকবচ।

এই রূপরেখা চুক্তি অনুযায়ী, লেবানন সরকার ইসরায়েলি সেনা ও জেনারেলদের করা যুদ্ধাপরাধের দায়মুক্তি দেবে। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তির ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী লেবানন আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার হারিয়েছে।

লেবাননে গৃহযুদ্ধের হুমকি

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লেবাননে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্তত ৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলি হামলায় পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক নাগরিক, সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

লেবাননের এমপি এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ হালিমা কাক্কুর বলেন, আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। অথচ এই প্রত্যাহার তাদের পাওনা অধিকার ছিল। এটি কোনো বাণিজ্যের বিষয় হতে পারে না।

এই চুক্তির ফলে বৈরুতের রাস্তায় ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম স্পিকার নাবিহ বেরিকে ধন্যবাদ জানাতে বাধ্য হয়েছেন। বেরি রাস্তা শান্ত করতে ভূমিকা রাখছেন। তবে তিনি গৃহযুদ্ধ এড়াতে এই চুক্তির বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। লেবাননের ইতিহাস বিবেচনায় নিলে বেরির এই সতর্কবার্তাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

নাবিহ বেরি বলেন, যারা এই চুক্তি তৈরি করেছে তারা লেবাননে ‘ফিতনা’ বা গৃহযুদ্ধ বাধাতে চায়। আমি সেই বিস্ফোরণ ঠেকাতে চাপ দিচ্ছি। এমনকি হিজবুল্লাহও পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা (চুক্তি প্রণেতারা) এমন এক চুক্তিতে জোর দিচ্ছে যা ১৯৮৩ সালের ‘১৭ মে’ চুক্তির চেয়েও ভয়াবহ।

বেরি আরও বলেন, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরের রশি টানাটানির খেসারত দিতে হতে পারে এই অঞ্চলকে।

লেবাননের প্রধান আক্রমণকারী হিসেবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিতে অত্যন্ত খুশি। লিতানি নদীর আশপাশের দুটি এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, নেতানিয়াহু তাকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ইরানের জন্য ‘বড় ধাক্কা’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ইরান আমাদের দক্ষিণ লেবানন থেকে জোর করে সরাতে চেয়েছিল। এখন ইসরায়েল, লেবানন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে তাদের বলছে—এটি তোমাদের বিষয় নয়।

মার্কিন প্রশাসনের দুজন ভিন্ন ব্যক্তির তৈরি করা দুটি আলাদা নীতির কারণে চুক্তি দুটি ভিন্ন রকম হয়েছে। বেরি মূলত এই রশি টানাটানির কথাই বুঝিয়েছেন।

ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। ভ্যান্স মনে করেন, বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানে হামলার সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন ভ্যান্স। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প যখন নেতানিয়াহু ও মোসাদ প্রধানের ব্রিফিং শুনে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন ভ্যান্স ‘সিচুয়েশন রুমে’ অনুপস্থিত ছিলেন।

‘সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে বাগাড়ম্বর

অন্যদিকে, ইসরায়েল ও লেবানন নিয়ে ওয়াশিংটনের রূপরেখা চুক্তিটি তৈরি করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি এখনো ইরান, ভেনেজুয়েলা ও কিউবায় সরকার পরিবর্তনের তত্ত্বে বিশ্বাসী।

রুবিও মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক সমাধানের আগে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা শান্তির শর্ত হওয়া উচিত। তিনি চান এই অঞ্চলে ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকুক।

জেডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে আকাশপথে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অনেক অসুবিধা দেখছেন। এই অঞ্চলে মার্কিন ২০টি সামরিক ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের একটি বড় মার্কিন নৌঘাঁটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া টমাহক মিসাইলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার দুশ্চিন্তাও আছে।

অন্যদিকে রুবিও এখনো একটি কাল্পনিক ধারণায় বিশ্বাস করেন। তিনি মনে করেন, হিজবুল্লাহ লেবাননের বাইরের কিছু এবং তারা কেবলই ইরানের হাতের পুতুল।

ইসরায়েলের আঞ্চলিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ ছিল একটি বড় ধাক্কা। তবে তেহরানে সরকার পরিবর্তন হলেও এই যুদ্ধ থামত না। এখন তেল আবিবের রাজনৈতিক মহল তাদের পূর্ণ মনোযোগ তুরস্কের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

দিন শেষে রাত যেমন আসে, তুরস্কও তেমনি ইসরায়েলের জন্য নতুন ‘অস্তিত্বের সংকট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলি রাজনীতিবিদরা এখন সমস্বরে একটি নতুন ‘সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, এই অক্ষে রয়েছে তুরস্ক, সিরিয়া ও কাতার।

তবে ট্রাম্প এই বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। তিনি এরদোগানকে নিজের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক বন্ধু মনে করেন। নেতানিয়াহু এরদোগানকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ ও ‘কুর্দিদের ওপর গণহত্যাকারী’ বলে দাবি করেন। ট্রাম্প এই দাবি হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, এরদোগান একজন মহান ও শক্তিশালী নেতা। তিনি বলেন, ‘আমি তার কাছে যা চেয়েছি, তিনি তাই করেছেন।’

নেতানিয়াহু যখন ইসরায়েলের নতুন নিরাপত্তা নীতি হিসেবে ‘আগে হত্যা করো’ কৌশলের কথা বলেন, তখন জেডি ভ্যান্স আরও কড়া জবাব দেন। তিনি সরাসরি ইসরায়েলি মন্ত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। কেবল মানুষ হত্যা করে আপনারা সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করতে পারেন না।’

ভিত্তি তৈরি

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল যতটা গুরুত্ব দিয়ে নেমেছিল, তুরস্কের বিরুদ্ধেও তারা ততটাই সিরিয়াস। প্রথমত, তুরস্কবিরোধী এই অবস্থান ইসরায়েলের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নাফতালি বেনেট মনে করেন, তুরস্ক থেকে এক নতুন হুমকি আসছে।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘তুরস্ক হলো নতুন ইরান।’ তার মতে, তুরস্ক ও কাতার সিরিয়াসহ পুরো অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে।

ইসরায়েলের প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি বলেছেন, ইরানের ‘শিয়া সাম্রাজ্যের’ যুগ শেষ হয়েছে। এখন তার জায়গায় আসছে এরদোগানের তুরস্ক, সিরিয়া ও কাতারের ‘মুসলিম ব্রাদারহুড অক্ষ’। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই এই অক্ষের বিষয়ে চোখ খোলা রাখা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল এই অভিযানের ভিত্তি তৈরি করেছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতনের এক মাস আগেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার একটি কৌশল বাতলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কুর্দি ও দ্রুজদের মতো ‘স্বাভাবিক মিত্রদের’ সঙ্গে ইসরায়েলের যোগাযোগ বাড়ানো উচিত।

আসাদের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার নৌ ও বিমানবাহিনীকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। তারা গাজার চেয়েও বড় এক বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে। তেল আবিব এখন প্রকাশ্যে সিরিয়াকে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করার দাবি তুলছে। তারা চায় সিরিয়া একটি ফেডারেল রাষ্ট্রে পরিণত হোক।

নেতানিয়াহু এখন লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় দখল করা এলাকাগুলোকে ‘সিকিউরিটি বেল্ট’ বা নিরাপত্তা বলয় হিসেবে অভিহিত করছেন। সেখান থেকে তার বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার কোনো ইচ্ছা বা পরিকল্পনা তার নেই।

এই কৌশলের মাধ্যমে ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো দামেস্কে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা’র নেতৃত্বাধীন জাতীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করা। একই সাথে আসাদ পরবর্তী সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককেও চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় তেল আবিব।

ইসরায়েল সচেতনভাবে সাইপ্রাস এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর নিয়ে গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে পুরনো উত্তেজনা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা সাইপ্রাসকে ‘বারাক এমএক্স’ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। সাইপ্রাসের পাফোস বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে সাইপ্রাস এখন ভারত থেকে সুপারসনিক মিসাইল এবং ড্রোন কেনার বিষয়েও আলাপ-আলোচনা করছে। এই সব পদক্ষেপের পেছনে একটিই সাধারণ লক্ষ্য কাজ করছে। আর তা হলো তুরস্কের ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানো।

সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘মারিভ’-এর একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কৌশলগত মহলে তুরস্ককে এখন ইরানের চেয়েও বড় দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর কারণ শুধু তাদের তৈরি বিমানবাহী রণতরী বা উন্নত ড্রোন, রাডার এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ক্ষমতা নয়। বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগর, ককেশাস, আফ্রিকা, বলকান এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাবই ইসরায়েলকে বড় দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

ইসরায়েলের আরেক মন্ত্রী গিলা গামলিয়েল সরাসরি বলেছেন যে, ইসরায়েল এখন ‘অটোমান সাম্রাজ্য’ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সুর পরিবর্তন

ইসরায়েলের এসব কর্মকাণ্ডের বিপরীতে তুরস্কের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত বেশ সতর্ক। কেউ কেউ বলছেন, আঙ্কারা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সতর্কতা দেখাচ্ছে। এরদোয়ানের বাগাড়ম্বর একপাশে সরিয়ে রেখে বাস্তব চিত্রটি দেখা দরকার। ইসরায়েল যখন সিরিয়ায় বিমান ও নৌবাহিনী ধ্বংস করছিল, তখন তুরস্ক আসলে কী করেছিল?

ইসরায়েল সিরিয়ার হামা এবং তিয়াস বিমানঘাঁটির মতো সামরিক স্থাপনায় হামলা করার পর দুই দেশ একটি ‘ডিকনফ্লিকশন লাইন’ বা সংঘর্ষ এড়ানোর পথ নিয়ে আলোচনা করেছিল। অথচ এই ঘাঁটিগুলো তুরস্ক ব্যবহারের পরিকল্পনা করছিল।

গাজায় হামলার পুরোটা সময় জেইহান বন্দরের মাধ্যমে আজারবাইজান থেকে ইসরায়েলে তেল সরবরাহ সচল রেখেছিল তুরস্ক। সম্ভবত ট্রাম্পের অনুরোধেই এরদোগান এটি করেছিলেন। ‘স্টপ ফুয়েলিং জেনোসাইড’ ক্যাম্পেইনের কর্মীরা তথ্য প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, তুরস্ক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরও ‘সিভিগার’ নামক ট্যাংকারটি অন্তত আটবার জেইহান বন্দর থেকে ইসরায়েলের আশকেলন পাইপলাইনে তেল পৌঁছে দিয়েছে।

তুর্কি কর্মকর্তারাও নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক বক্তব্যগুলোকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কৌশল বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাথে তুর্কি সামরিক বাহিনীর হটলাইনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এমনকি তুর্কি জেনারেলরা সিরিয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্মুখ সংঘাতের বিপক্ষে ছিলেন। তুরস্ক ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যেও যোগাযোগ ছিল।

২০২২ সালে হাকান ফিদান যখন গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন, তখন তুর্কি গোয়েন্দারা ইহুদি লক্ষ্যবস্তুর ওপর ইরানের ১০টি পৃথক হত্যা পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছিল।

২০২৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনে গাজা ইস্যুতে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল একেপি বড় ধাক্কা খাওয়ার পর এই নমনীয় নীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। এরপর তুরস্ক কিছু পদক্ষেপ নিলেও সেগুলো ছিল মূলত কূটনৈতিক। তারা সিরিয়া ইস্যুতে ট্রাম্প এবং তার দূত টম ব্যারাককে নিজেদের পক্ষে রাখতে চেয়েছিল।

তবে বর্তমানে আঙ্কারার সুর বদলেছে। তুরস্ক এখন মেনে নিয়েছে যে ইসরায়েলের সাথে আসন্ন সংঘাতের বিষয়টি বাস্তব। তুরস্ক এখন নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং ড্রোনের মাধ্যমে নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন তুরস্ককে তাদের নতুন প্রজন্মের ‘কান’ স্টিলথ ফাইটারের জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন সরবরাহ করছেন। অন্যদিকে আঙ্কারা ৬০ হাজার টনের একটি বিমানবাহী রণতরী এবং আরও ৩০টি যুদ্ধজাহাজ তৈরির কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি তারা মিশরীয় নৌবাহিনীর সাথে যৌথ মহড়াও চালিয়েছে।

এতকিছুর পরও তুরস্ক মূলত সময়ক্ষেপণ করছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে আঙ্কারার আরও ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে।

গাজা ইস্যুতে তুরস্কের প্রধান পদক্ষেপ ছিল সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের সাথে একটি প্রতিরক্ষা জোট গড়ার চেষ্টা করা। এই দেশগুলোই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছিল। ইসরায়েল মূলত এই ঐক্যকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায় এবং এটি ধ্বংস করতেই এখন লড়াই করছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যা-ই ঘটুক না কেন, ইসরায়েলের সাথে এই অঞ্চলের মূল যুদ্ধের লাইনটি এখন লেবানন এবং সিরিয়ায় টানা হবে।

এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা হলো, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যখন মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা বদলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন, তখন তিনি আসলেই তা বোঝেন। এই উন্মাদনা থামানোর জন্য এখন কেবল আলোচনার টেবিল নয়, বরং কঠোর সামরিক শক্তি প্রয়োজন।

আরব দেশগুলো যদি প্রতিক্রিয়া জানাতে আরও দেরি করে বা কেবল ওয়াশিংটনের ওপর ভরসা করে বসে থাকে, তবে ইসরায়েলের ‘আগে মারো’ কৌশলের ফল তাদের জন্য অনেক বড় ধাক্কা হয়ে আসবে।


লেখক পরিচিতি

ডেভিড হার্স্ট ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও বিশেষ করে সৌদি আরব বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষক। এর আগে তিনি ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর ফরেন লিডার রাইটার ছিলেন এবং রাশিয়া ও ইউরোপে সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে কাজ করেছেন।