নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন/ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুবরাজ সালমান ও ট্রাম্পের সর্ম্পকে ফাটল ধরালো

এডওয়ার্ড ওং
ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুবরাজ সালমান ও ট্রাম্পের সর্ম্পকে ফাটল ধরালো
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সামরিক কমান্ডাররা বেশ বিপাকে পড়েছিলেন। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল। ওই প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সহায়তা করতে মার্কিন বাহিনী একটি নতুন অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিল। সামরিক কমান্ডাররা জানান, সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী সেখানে ইরানের যেকোনো হামলা প্রতিহত করবে।

কিন্তু মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হুট করে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে পড়ে। সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানান, মার্কিন বাহিনী এই অভিযানে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। পেন্টাগন এই অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’। আমেরিকানরা আগে থেকে সৌদিদের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো পরামর্শ করেনি।

এ ঘটনায় ওয়াশিংটন ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় একের পর এক জরুরি ফোনকল। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের প্রথম দিন ৪ মে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প যুবরাজের সঙ্গে কথা বলেন। পরের দুই দিনও তাদের মধ্যে কথা হয়।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও যুবরাজকে আলাদাভাবে ফোন করেন। একই ভাবে কথা বলেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও তার সৌদি সমকক্ষের সঙ্গে কথা বলেন।

তবে সৌদি যুবরাজ নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। তার আশঙ্কা ছিল, মার্কিন এই পরিকল্পনা যুদ্ধকে নতুন করে উসকে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বন্ধ করতে বাধ্য হয় ট্রাম্প প্রশাসন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে ৫ মার্চ হামলা চালায় ইরান। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় সৌদি আরবের রিয়াদে ৫ মার্চ হামলা চালায় ইরান। ছবি: সংগৃহীত

পেশাদার কূটনীতিক মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, ‘ইরান যখনই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল, অমনি উপসাগরীয় অঞ্চলের পুরো মনস্তত্ত্ব বদলে গেল।’ ওয়াশিংটনের ‘আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউট’-এর স্কলার হুসেইন ইবিশ এ বিষয়ে বলেন, ‘সৌদিরা মার্কিন প্রশাসনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিলে ইরান তাদের ওপর আরও ভয়াবহ হামলা চালাবে।’

যুবরাজকে মানাতে হোয়াইট হাউসের এই সর্বাত্মক চেষ্টার কথা আগে কখনও প্রকাশ পায়নি। যুদ্ধের এই কঠিন সময়গুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েল ইস্যুতে মার্কিন ও সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন চরম মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধে ট্রাম্পের বারবার মত পরিবর্তন দেখে সৌদিরা সন্দিহান হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতে আমেরিকা তাদের নিরাপত্তা দেবে কি না, তা নিয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারছে না। ট্রাম্পের প্রতি সৌদিদের এই অবিশ্বাস শুরু হয় ২০১৯ সালে। সে বছর সৌদি তেলক্ষেত্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলেও ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে অস্বীকার করেন।

হুসেইন ইবিশ আরও বলেন, ‘আমরা বড় কোনো লড়াই শুরু করি, এরপর একঘেয়েমি ধরলে মাঝপথে ছেড়ে চলে যাই।’ তিনি একে একটি জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, সৌদিরা এখন মাটিতে পড়ে থাকা অসহায় ‘চার্লি ব্রাউনের’ মতো বোধ করছে, যাকে বারবার ধোঁকা দেওয়া হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য দাবি করেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক চমৎকার। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব পক্ষ থেকে মতামত শোনেন। তবে দিনশেষে তিনি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি অংশীদারত্বের কিছু দিক এখনও বেশ শক্তিশালী। গত বছর হওয়া এক চুক্তির ভিত্তিতে সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প প্রশাসন শিগগিরই এ সংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা কংগ্রেসে পেশ করতে পারে। তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভয়, সৌদি যুবরাজ শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারেন।

ওয়াশিংটন ও রিয়াদ বর্তমানে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প স্থলপথ তৈরির বিষয়েও আলোচনা করছে। এছাড়া এখনও সৌদি আরবই হচ্ছে মার্কিন অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প তার দুই মেয়াদে প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে যুবরাজ মোহাম্মদের ব্যক্তিগত সখ্য দীর্ঘদিনের। সরকারি কোনো পদে না থাকলেও কুশনার নিয়মিত রিয়াদ সফর করেন। চার বছর আগে যুবরাজের নেতৃত্বাধীন একটি তহবিল থেকে কুশনার ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ পেয়েছিলেন।

এত সখ্য সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে যুবরাজকে নিয়ে উপহাস করেছেন। গত মার্চে মিয়ামিতে এক বিনিয়োগ সম্মেলনে ট্রাম্প কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যুবরাজ তাকে এবং তার প্রশাসনকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। ট্রাম্পের ভাষায়, যুবরাজ ভাবতেই পারেননি যে তাকে ট্রাম্পের তোষামোদ করতে হবে।

হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

উত্তেজনার আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায় গত সপ্তাহে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো সফর করলেও সৌদি আরব যাননি। তিনি বাহরাইন, কুয়েত ও আমিরাত সফর করেন। বাহরাইনের বৈঠকে তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন। সেখানে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলাদা কথা হয়।

বৈঠকে রুবিও দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জোটের কঠিন পরীক্ষা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যকার সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক পরীক্ষায় সগৌরবে উত্তীর্ণ হয়েছে।’

সৌদি আরব যুদ্ধবিরতিতে স্বস্তি পেলেও অনেক জটিল সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। প্রাথমিক চুক্তিতে কার্যত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে মেনে নেওয়া হয়েছে। ইরান ও ওমান এখন ঠিক করবে এই প্রণালি কীভাবে পরিচালিত হবে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে ইরান সেখানে জাহাজ চলাচলের ওপর চড়া শুল্ক বা ফি ধার্য করতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, ‘এখন ইরানের হাতে এমন এক অস্ত্র (হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ) এসেছে যা দিয়ে তারা বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করতে পারে।’

প্রাথমিক চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং মিলিশিয়াদের সমর্থনের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে কোনো পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা-ও অনিশ্চিত। ২০১৮ সালে ট্রাম্প ওবামা আমলের চুক্তি থেকে সরে আসার পর ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

সৌদি আরব প্রকাশ্যে ট্রাম্পের এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছে। গত ১৮ জুন ভিয়েনায় এক সভায় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, ‘এই সমঝোতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশা করছি এটি সংঘাতের অবসান ঘটাবে এবং পরমাণু ইস্যুসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানের পথ খুলে দেবে।’

তবে সৌদি কর্মকর্তারা আদতে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছেন। তারা দেখতে চান এই চুক্তির ফলাফল কী হয়। চুক্তিতে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অর্থ দেওয়ার কথা বলা হলেও রিয়াদ এখনও কোনো তহবিল ছাড়েনি।


নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত

লেখক: এডওয়ার্ড ওং দীর্ঘ সময় ধরে ওয়াশিংটন থেকে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন নীতি নিয়ে কাজ করছেন। টানা তিনটি মার্কিন প্রশাসনের সময়কাল কভার করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া তিনি সরাসরি ইরাকে থেকে সাড়ে তিন বছর ইরাক যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসে বিশ্ব পরিস্থিতি, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট নিয়ে কাজ করছেন।