logo
Advertisement

দ্য গার্ডিয়ানের কলাম/ফোন করে লাল কার্ড বাতিল করালেন ট্রাম্প, তবু হারল যুক্তরাষ্ট্র!

মেরিনা হাইড
ফোন করে লাল কার্ড বাতিল করালেন ট্রাম্প, তবু হারল যুক্তরাষ্ট্র!
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

হায় রে কপাল! যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল দলের হার দেখাটা সত্যিই লজ্জার। বিশেষ করে যখন তাদের চরম বিব্রতকর প্রেসিডেন্ট খোদ দলটির হয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেন। তবুও এই হার পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় গেঁথেছে। এর আগে বেলজিয়ামের কোনো প্রতিরোধ নিয়ে এত মানুষ একসঙ্গে উল্লাস করেছিল ১৯১৪ সালে। সেবার জার্মানরা মাত্রই মিউজ নদী পার হয়েছিল।

Advertisement

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, সোমবার রাতে নিজেদের বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে থাকা বেলজিয়াম তাদের বিদায় করেছে। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় গলায় দাবি করেছিলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে তিনি তিনবার ফোন করেন। উদ্দেশ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড বাতিল করানো। হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলেও প্রতারণা করে। কথাটা চারদিকে ছড়িয়ে দিন।

এই টুর্নামেন্টে আপনারা ‘শিটহাউসারি’ (মাঠে নোংরা কৌশল বা প্রতারণা) শব্দটি অনেকবার শুনেছেন। এমনকি কয়েকজন মার্কিন ধারাভাষ্যকারকেও শব্দটি ব্যবহারের চেষ্টা করতে দেখেছি। এটা রীতিমতো পীড়াদায়ক ছিল।

ভাই, দয়া করে থামুন। এসব আপনাদের মানায় না। আপনাদের ঝুলিতে ‘আ কাপল থিংস’ বা ‘আ ওয়েজ টু গো’-এর মতো শব্দবন্ধ আছে। সেগুলোই ব্যবহার করুন। তবে গত কয়েক দিনে যা ঘটেছে, বিশ্বের সব ভাষায় তার একটি যোগ্য নাম দেওয়া উচিত। আর তা হলো ‘হোয়াইটহাউসারি’ (হোয়াইট হাউসের নোংরামি)।

আমরা পুরোপুরি ‘হোয়াইটহাউসারি’র এক প্রদর্শনী দেখেছি। এসব ভুলে যেতে গোটা বিশ্বের আরও বেশ কিছুটা সময় লাগবে। ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। বালোগুনের নিষেধাজ্ঞায় তিনি রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন।

সোমবার সারা দিন তিনি সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে অনর্গল বকে গেছেন। তিনি বারবার বলেছেন, সপ্তাহান্তে হস্তক্ষেপ করে তিনি চরম অনুচিত কাজ করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘আমি এসব কাজে বেশ পটু।’ ঠিক আছে, বুঝলাম।

ট্রাম্প সত্যিই ভেবেছিলেন, তিনি জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমে ছক্কা হাঁকাচ্ছেন। তবে এর একমাত্র মানবিক ক্রীড়াসুলভ উত্তর হতে পারে এমন—‘হায় খোদা, তাকে ব্যাট করতে দিয়ো না! তার অবস্থার দিকে একটু তাকাও! সে তো ব্যাট ধরে নিজের প্রাণটাও বাঁচাতে পারবে না!’

ব্যাপারটা অদ্ভুত। ট্রাম্প নাকি খেলাধুলা নিয়ে অনেক কিছু বোঝেন। অথচ তিনি এটাই বোঝেন না যে, আপনি যদি চরম কোনো অন্যায় করেন, প্রতিপক্ষ সেই অবিচারকেই হাতিয়ার বানাবে। তারা আরও ক্ষিপ্র হয়ে উঠবে এবং আপনাকে হারিয়ে দেবে।

তবে লিন্ডসে গ্রাহাম ট্রাম্পকে যেসব মরা গলফ খেলায় প্রতারণা করার সুযোগ দেন, সেগুলোর সমীকরণ হয়তো ভিন্ন। ২০২২ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের মামলায় গ্র্যান্ড জুরির সামনে গ্রাহাম বলেছিলেন, ‘অনেকেই বলেন, আপনি হয়তো তাকে (ট্রাম্প) টপকে যেতে পারবেন, কিন্তু তার ক্যাডিকে টপকাতে পারবেন না। বিষয়টা এমনই।’

অনেকেই ফোলারিন বালোগুনের জন্য ঠিকই করুণা অনুভব করছেন। প্রেসিডেন্টের এমন কদর্য উপস্থিতি তিনি নিজের পক্ষে কখনোই চাননি। বিশেষ করে লন্ডনে বেড়ে ওঠা বালোগুন তো চাইবেনই না।

কারণ, বালোগুন ঠিক সেই ধরনের মানুষ, যাদের জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্ব সীমিত করতে ট্রাম্প যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন।

গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের সেই চেষ্টা চূড়ান্তভাবে নস্যাৎ করেছেন। তবে, ওই যে কথায় আছে—যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে।

তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য কেউ বিন্দুমাত্র করুণা দেখাচ্ছে না। এখন পুরো মনোযোগটা তার দিকেই দেওয়া উচিত। ফিফার স্বাধীন বিচারিক সংস্থাগুলো কেন অস্বচ্ছ ‘অনুচ্ছেদ ২৭’ প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞাটি প্রত্যাহার করল, ইনফান্তিনো তার এক চরম আজেবাজে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রকাশনায় আমি এর শিরোনাম দেখেছি। সেখানে লেখা ছিল, ‘ফিফার অখণ্ডতা রক্ষা করেছেন ইনফান্তিনো’। মাফ করবেন, ফিফার কী রক্ষা করেছেন?

পরিস্থিতি যে এই পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। আমরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্লাটারকে ফিরিয়ে আনো’ যুগে প্রবেশ করেছি। ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটারকে সর্বশেষ যখন দেখা গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল তিনি গাড়িতে ঘুমাচ্ছেন।

গত বছর আপিলে তিনি কোনোমতে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি পান। গতকাল তিনি এই পুরো ঘটনা নিয়ে তার উত্তরসূরির ওপর সরাসরি আক্রমণ চালিয়েছেন।

ব্লাটার বলেছেন, ‘রাজনৈতিক ফোন কলে লাল কার্ড বাতিল হয় না।’ তাহলে কীভাবে হয়? টাকার বস্তা আর বিলাসবহুল ঘড়ির বিনিময়ে? দৃশ্যত তা নয়। ব্লাটার রীতিমতো গর্জে উঠে বললেন, ‘নিয়ম, প্রমাণ এবং স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমেই এগুলো বাতিল করা হয়।’ বাহ! কে জানত এই কথা!

আপনার যদি মনে হয় উয়েফা ইনফান্তিনোকে এর চেয়ে বেশি ঘৃণা করতে পারে না, তবে আপনি ভুল ভাবছেন। তারা আসলেই তা পারে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই ফোনালাপ নিয়ে দীর্ঘ এক বিবৃতি দিয়েছে।

তারা বলেছে, ‘নিয়মের রক্ষকেরাই যখন নিয়মের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন খেলার অখণ্ডতা হুমকিতে পড়ে। আর এতে প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।’

উয়েফা আরও বলেছে, ‘এমন নজিরবিহীন, বোধগম্য নয় এবং অযৌক্তিক একটি সিদ্ধান্তে আমরা আমাদের অবিশ্বাস প্রকাশ করছি।’ সংস্থাটির ঘোষণা অনুযায়ী, এই ঘটনা ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেছে। রেড লাইন? রেড লাইন?! আপনারা আমাকে মানচিত্রের পোকা বলতে পারেন। তবে আমার মনে হয়, কয়েক আলোকবর্ষ আগেই আমরা নৈতিকতার সেই সীমা পার করে এসেছি। হয়তো সেই সময় পার করেছি, যখন ইনফান্তিনো ট্রাম্পের ‘গাজা পিস সামিট ফর ঘুলিশলি রাপাসিয়াস বিজনেসম্যান’ (অবশ্য এটি সরকারি নাম নয়)-এ বুক ফুলিয়ে ছবি তুলছিলেন।

অথবা নিশ্চিতভাবে তখন পার করেছি, যখন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজে ব্যঙ্গাত্মক ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করেন। আর সেটা ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। এর ঠিক দুই মাস পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই পুরস্কারের মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন!

যাই হোক, এবার নতুন খবরের কথায় আসি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনেক সদস্য এখন একজোট হয়েছেন। তারা বালোগুন কাণ্ডের জেরে ফিফার বিরুদ্ধে নৈতিকতা তদন্তের দাবি তুলেছেন। পরিস্থিতি একবার ভাবুন! ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নৈতিকতা তদন্তের দাবি জানাচ্ছে, আর সেপ ব্লাটার বলছেন, আপনি দুর্নীতিগ্রস্ত। পরিহাসের যদি মানুষ খুনের ক্ষমতা থাকত, তবে আমরা এতক্ষণে রীতিমতো এক রক্তগঙ্গা দেখতাম।

দুর্ভাগ্যবশত, পরিহাসের সেই ক্ষমতা নেই। ফিফায় ইনফান্তিনোর সভাপতির আসনটা যতটা সুরক্ষিত, ফুটবলের কোনো পাতানো ম্যাচও ততটা নিশ্চিত হয় না। এমনকি ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র যদি ১৯৯৩ সালের ঘুষখোর মার্শেই দলের বিপক্ষেও খেলত, আর সেই ম্যাচের রেফারি হতেন জার্মানির দুর্নীতিগ্রস্ত রবার্ট হয়জার—তবুও এতটা নিশ্চিত হওয়া যেত না।

নিজের নেতৃত্বাধীন সংস্থায় ইনফান্তিনো আপাতত অজেয়। ইউরোপের বাইরের সদস্য দেশগুলোকে তিনি যেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নয়নের টাকা দিয়ে বশ করে রেখেছেন, তাতে তাকে টলানো কঠিন।

অবশ্য একদিন এ পরিস্থিতির বদল হবে। ফিফায় সব সময়ই আরও ভয়ংকর ও ক্ষুধার্ত কেউ না কেউ শেষমেশ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।

তবে আপাতত, নিজেদের টুর্নামেন্টে বিষ ছড়াতে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো সম্পূর্ণ মুক্ত। আমরা শুধু আশা করতে পারি, চূড়ান্ত চ্যাম্পিয়নরা একটি বিষয়ে ঠিকই বুঝতে পারবে। আর তা হলো, নিজেদের সব কৌশল কাজে লাগিয়ে এই দুই খলনায়ককে তারা বিজয়ের স্বাদ ভাগ বসানো থেকে দূরে রাখবে।


লেখক পরিচয়: কলামিস্ট, দ্য গার্ডিয়ান।