টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন যশোর শহর

টানা ১০ ঘণ্টাযর বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে যশোর শহর। শুক্রবার (১০ জুলাই) ভোর থেকে শুরু হওয়া টানা মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা ও নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে, ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল এবং স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন।
যশোর বিমানবাহিনীর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে রাত ২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত চার ঘণ্টায় ১১০ মিলিমিটার এবং সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির কারণে শহরের নিচু এলাকাগুলো দ্রুত পানিতে তলিয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের টিবি ক্লিনিক এলাকা, খড়কির শাহ আবদুল করিম সড়ক, ধর্মতলা রোড, আপন মোড়, চারখাম্বা মোড়, মুজিব সড়কের রেলগেট এলাকা, নাজির শংকরপুর, রূপকথা মোড়, বেজপাড়া চিরুনিকল মোড়, মিশনপাড়া, আরবপুর, বিমানবন্দর সড়ক, শংকরপুর চোপদারপাড়া এবং স্টেডিয়ামপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমেছে। কোথাও কোথাও রাস্তা, ড্রেন ও খাল একাকার হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। পুকুর, মাঠ ও পতিত জমিও পানিতে ডুবে গেছে। কয়েকটি এলাকায় জমে থাকা পানিতে স্থানীয়দের মাছ ধরতেও দেখা যায়।
টিবি ক্লিনিক এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবার বর্ষা এলেই আমরা একই দুর্ভোগে পড়ি। জনপ্রতিনিধিরা বারবার আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখি না। সামান্য ভারী বৃষ্টি হলেই আমাদের বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে।
খড়কি এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল রহমানের ভাষ্য, পৌরসভার ড্রেন নির্মাণে পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি শহরের মধ্যেই আটকে থাকে। ড্রেনগুলো ঠিকভাবে নির্মাণ করা হলে এত বড় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না।
স্টেডিয়ামপাড়া এলাকার আব্দুল মজিদ বলেন, আগেও এখানে জলাবদ্ধতা হতো, কিন্তু এবার পরিস্থিতি অনেক ভয়াবহ। স্টেডিয়ামের প্রধান ফটক থেকে পৌর হকার্স মার্কেট পর্যন্ত পুরো এলাকা পানির নিচে চলে গেছে।
খড়কি এলাকার আরেক বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না, নিয়মিত পরিষ্কারও করতে হবে। অনেকেই ড্রেনে ময়লা ফেলছেন। ফলে ড্রেনের পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য বছরের পর বছর ধরে সরাসরি ড্রেনে ফেলা হচ্ছে। এতে ড্রেনে পলি ও আবর্জনা জমে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক স্থানে ড্রেনের বড় অংশ ময়লায় ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ড্রেনের সংযোগও অপর্যাপ্ত। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নদী বা খালে যেতে না পেরে সড়ক ও আবাসিক এলাকায় জমে কৃত্রিম বন্যার পরিস্থিতি তৈরি করছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান ড্রেনগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ দখল ও বর্জ্য অপসারণ এবং শহরের সামগ্রিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। অন্যথায় অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেও যশোরবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী বিএম কামাল আহম্মেদ বলেন, পৌর প্রশাসকের নেতৃত্বে প্লাবিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। মেডিকেল কলেজের পাশের একটি সরু ড্রেন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু স্থানীয় কিছু বাসিন্দার আপত্তির কারণে সেটি করা সম্ভব হয়নি। ওই ড্রেনটি প্রশস্ত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।




