‘কাজের পরিবেশ সুন্দর না হলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা অসম্ভব’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘কাজের পরিবেশ সুন্দর না হলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখা অসম্ভব’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের করপোরেট জগতের নেতৃত্ব ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করছেন সাউথ এশিয়ার অ্যাওয়ার্ড উইনিং ট্রেইনার ড. ইউসুফ ইফতি। ট্রেইনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং ফিউচার আইকনের সিইও ড. ইউসুফ ইফতি বর্তমানে বাংলাদেশে এআই ইন্টিগ্রেটেড সেলস ও লিডারশিপ ট্রেনিংয়ের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। করপোরেট প্রশিক্ষণকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে হাজারও পেশাজীবীর দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে যাওয়া এই গুণী ব্যক্তিত্ব সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ব্যবসাবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘বিয়ন্ড বিজনেস’-এ অতিথি হিসেবে সেলস ও লিডারশিপ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ নানা বিষয় তুলে ধরেন। সঞ্চালনা করেছেন রিয়াজুল করিম। সম্পাদনা করেছেন জায়েদ আল মাহবুব

এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পুত্রা ইউনিভার্সিটি থেকে আপনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কেমন ছিল এই অভিজ্ঞতা?

ড. ইউসুফ ইফতি: পুত্রা ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ার স্বনামধন্য পুত্রা বিজনেস স্কুল। এই বিজনেস স্কুল থেকে আমি পিএইচডি সম্পন্ন করেছি। ২০২১ সালে আমি ভর্তি হই এবং সম্প্রতি ১৯ জুন আমার ফাইনাল ডিফেন্স খুবই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমার পিএইচডির মূল ফোকাস ছিল ম্যানেজমেন্টের ওপরে। আমাদের দেশে অফিস ম্যানেজমেন্টের কারণে অনেকেই চাকরি ছেড়ে দেয়, যা বর্তমানে একটি কমন ঘটনা। বিশেষ করে ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের চাকরি ছাড়ার হার প্রায় ১৭ থেকে ৩৭ শতাংশ। আমি এই বিষয় নিয়ে কাজ করেছি, একজন কর্মচারীকে চাকরিতে ধরে রাখতে চাইলে অর্গানাইজেশন কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে যেন তার মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা না দেখা দেয়।

এশিয়া পোস্ট: প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে তাদের কর্মীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে, সে ব্যাপারে আমরা বিস্তারিত জানব। তার আগে আপনার শৈশব এবং স্কুলজীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

ড. ইউসুফ ইফতি: আমার বাড়ি ভোলার সদর থানার চসামাইয়া ইউনিয়নের চরসিপলি গ্রামে। ছোটবেলায় গ্রামের নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় যেতাম, যা আমার বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে ছিল। আমরা প্রতিনিয়ত হেঁটে যেতাম এবং প্রচুর খেলাধুলা করতাম। ক্রিকেট, ডাঙ্গুলি, মার্বেল খেলতাম। গ্রামের খালে সাঁতার কাটা বা বড় ব্রিজ থেকে লাফ দেওয়ার স্মৃতিগুলো এখনও মনে পড়ে। একবার ক্রিকেট খেলা নিয়ে আমাদের গ্রামের মাঠে চরম মারামারি হয়েছিল। আমি সেই খেলায় আমার দলের অধিনায়ক ছিলাম এবং মারামারি অপছন্দ করতাম। দেখা যেত আজকে মারামারি হলেও কালকে সকালে সবাই আবার সব ভুলে একসঙ্গে মিশে যেতাম। অন্যরকম এক বন্ধন ছিল সবার মাঝে।

এশিয়া পোস্ট: আপনার উচ্চশিক্ষা এবং পেশাজীবন শুরুর গল্প জানতে চাই।

ড. ইউসুফ ইফতি: ভোলার সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করার পর দৌলতখান আবু আব্দুল্লাহ কলেজ থেকে বিএসসি পাস কোর্স করি। এরপর ঢাকায় চলে আসি, জগন্নাথ কলেজে ম্যাথমেটিক্সে মাস্টার্সে ভর্তি হই। পড়াশোনা চলাকালীন আমি চাকরিতে ঢুকে যাই। পরে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে মার্কেটিংয়ে এমবিএ সম্পন্ন করি এবং সর্বশেষ মালয়েশিয়ার পুত্রা বিজনেস স্কুল থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করি। আমার প্রথম চাকরি ছিল জগন্নাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায়। আন্দালিভ রহমান পার্থ ভাইয়ের পরিবার মতিঝিলে একটি রেস্টুরেন্ট দিয়েছিলেন এশিয়া স্পাইসি ফুড কোর্ট নামে। সেখানে আমি প্লেট ধোয়া থেকে শুরু করে পরিবেশন করা, টাকা রিসিভ করা এবং প্রমোশনের কাজও করেছি। তবে প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৩ সালে ‘অপসোনিন ফার্মা’য় মেডিকেল প্রমোশন অফিসার হিসেবে জয়েন করার মাধ্যমে।

এশিয়া পোস্ট: আপনি পড়াশোনা করেছেন গণিতে, কিন্তু পেশা হিসেবে বেছে নিলেন সেলস ও মার্কেটিং। এই ফিল্ডে আসার কোনো বিশেষ কারণ ছিল?

ড. ইউসুফ ইফতি: গ্রাম থেকে উঠে আসার কারণে বর্তমান সময়ের মতো স্বপ্ন দেখার বা ক্যারিয়ারিস্টিক হওয়ার সুযোগ আমাদের ছিল না। তখন ফার্মাসিউটিক্যালস জবগুলো সাধারণত সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ছিল। আমি যেহেতু ম্যাথমেটিক্সে পড়াশোনা করেছি, তাই সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে অপসোনিনে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে জয়েন করি। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না, অনেকটা পরিস্থিতির খাতিরেই আসা।

এশিয়া পোস্ট: আপনি একজন ট্রেইনার হিসেবে অনেক মানুষকে অনুপ্রেরণা দেন। কিন্তু আপনার নিজেরই যখন উৎসাহ দরকার পড়ে, তখন আপনি কী করেন?

ড. ইউসুফ ইফতি: সবার লাইফেই ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি থাকে। পিএইচডি চলাকালীন আমার আন্ডারপিনিং থিওরি লিখে প্রফেসরের কাছে পাঠানোর পর তিনি বারবার তা বাতিল করে দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি আমাকে মিটিংয়ে ডেকে এমন কিছু কড়া কথা বললেন, যা আমার জন্য মেনে নেওয়া খুব কঠিন ছিল। আমি এক ঘণ্টা অফিসের ফ্লোরে লাইট অফ করে শুয়ে ছিলাম এবং পিএইচডি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। তখন আমার কোচ প্রফেসর আমের আমাকে জুম মিটিংয়ে ডেকে গাইডলাইন দেন এবং সাহস জোগান। জীবনে চলার পথে যখন আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই, তখন এমন কিছু মানুষের কাছে যাই, যারা আমাকে আবার উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারেন। এ ছাড়া আমি টনি রবিন্সের ভিডিও, ডেল কার্নেগির বই, ‘থ্রি ইডিয়টস’ মুভি কিংবা সন্দীপ মাহেশ্বরী ও বিকে শিবানীর স্পিরিচুয়াল ভিডিও দেখি।

এশিয়া পোস্ট: আপনার জীবনে কি কখনো এমন পরিস্থিতি এসেছে, যখন মনে হয়েছে আমাকে দিয়ে আর হবে না?

ড. ইউসুফ ইফতি: হ্যাঁ, হয়েছে। আমার দুটি বিজনেস ছিল, ফার্স্ট এইড হাসপাতাল এবং মেডিসিন পার্ক লিমিটেড। আমি সেই হাসপাতালের এমডি থাকাকালীন পরিচালকদের মধ্যে এক ধরনের ইন্টারনাল পলিটিক্স শুরু হয়। তখন আমি দায়িত্ব হস্তান্তর করে দিই। এরপর যখন আমার অন্য বিজনেসে পুরো সময় দিতে চাইলাম, সেখানেও পারিবারিক বা পার্টনারশিপের কিছু সমস্যার কারণে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। নিজের হাতে তৈরি প্রতিষ্ঠান থেকে এভাবে সরে আসাটা মেনে নেওয়া খুব কষ্টের ছিল। টানা তিন মাস আমি বাসায় একরকম বন্দি ছিলাম। সেটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম হতাশাজনক সময়। সেই সময়টা পার করা আমার জন্য বেশ কঠিন ছিল।

এশিয়া পোস্ট: প্রশিক্ষক হিসেবে আপনি ‘সেলস’ কেন বেছে নিলেন?

ড. ইউসুফ ইফতি: এর প্রধান কারণ হলো, আমি সরাসরি ১৫ বছর সেলসে কাজ করেছি। অপসোনিনে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে মাত্র তিন বছরে আমি এরিয়া ম্যানেজার হই। এরপর ঢাকা মেডিকেলের একটি বড় বেল্ট কাভার করেছি। হসপিটাল পরিচালনার সময় আমি ওপর থেকে সেলসটাকে দেখেছি। এমনকি লঞ্চের ব্যবসায় যুক্ত থেকেও আমি সেলস ও সার্ভিস নিয়ে কাজ করেছি। যেহেতু আমার কোর জায়গাটা সেলস, তাই এই সেগমেন্টেই আমি বেশি কন্ট্রিবিউট করতে পারছি।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেলস ক্যারিয়ারকে প্রথমে অনেকে ইতিবাচকভাবে নেয় না। এর কারণ কী মনে করেন?

ড. ইউসুফ ইফতি: এর বড় কারণ হলো, সেলসকে সবাই যার যার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে। জন গডফ্রে স্যাক্সের সেই হাতি ও অন্ধ মানুষের গল্পের মতো। বাংলাদেশে যারা সেলসে কাজ করে, তাদের ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ মানুষ কোনো ট্রেনিং ছাড়াই কাজ শুরু করে। কোম্পানিগুলো তাদের ট্রেনিং দিয়ে তৈরি না করে সরাসরি প্রোডাক্ট বিক্রির জন্য মার্কেটে পাঠিয়ে দেয়। রিজেকশন হ্যান্ডলিং, উইনিং মাইন্ডসেট, কমিউনিকেশন স্টাইল বা ডিল ক্লোজিংয়ের টেকনিক না জানার কারণে সেলস তাদের কাছে খুব কষ্টের কাজ মনে হয়।

এশিয়া পোস্ট: ২০ বছর ধরে যেহেতু আপনি সেলস নিয়ে কাজ করছেন, আপনার অভিজ্ঞতায় কোম্পানিগুলো ঠিক কোন জায়গায় ভুল করছে বলে মনে করেন?

ড. ইউসুফ ইফতি: মালিকপক্ষ মনে করে, সেলসের কর্মীদের রিসোর্স বা অ্যাসেট হিসেবে তৈরি করার পরিবর্তে শুধু মার্কেটে পাঠালেই টাকা আসবে। এটাই বড় ভুল। দ্বিতীয়ত, সেলসের মানুষদের ছুটির অভাব। অনেক সময় রাত ১১টায় বস ফোন করে প্রেশার দেন, টার্গেট ফিলআপ না হলে। এতে কর্মীদের পারিবারিক জীবন ব্যাহত হয় এবং প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়। অতিরিক্ত প্রেশার দিয়ে কাজ করানোর মান্ধাতা আমলের কনসেপ্ট এখনও ৮০ শতাংশ লিডারের মধ্যে রয়ে গেছে।

এশিয়া পোস্ট: বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সেলস লিডারদের তাদের অধস্তনদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত? সঠিক দিকনির্দেশনা এবং মানসিক সমর্থন কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়তা করে বলে মনে করেন কি?

ড. ইউসুফ ইফতি: গালিগালাজ দিয়ে কাজ করানোর দিন শেষ। এখন লিডারদের উচিত কর্মীদের ইন্সপায়ার করা এবং প্রতিদিনের কাজকে ছোট ছোট চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে শেখানো। কর্মীদের স্বাধীনতা দিতে হবে। লিডারকে নিজের জ্ঞান টিমের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বসের সঙ্গে টিম মেম্বাররা ডিবেট করতে পারবেন। বর্তমান লিডাররা ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কেবল মেসেঞ্জারের কাজ করছেন। অথচ তাদের হওয়া উচিত ট্রান্সফরমেশনাল লিডার।

এশিয়া পোস্ট: বিক্রয় প্রতিনিধিদের বেতন বা জীবনযাত্রার মান নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ড. ইউসুফ ইফতি: বাংলাদেশে কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকিদের বেতন মানসম্মত নয়। একজন বিক্রয়কর্মীর জীবনযাপন করতে অন্তত ২৫-৩০ হাজার টাকা দরকার। প্রতিষ্ঠানের উচিত বেতন বা প্রণোদনার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা। আমি মনে করি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে একটি স্তরভিত্তিক পদ্ধতি করা যেতে পারে যাতে, সবার জন্য একটি মানসম্মত বেতন বজায় থাকে।

এশিয়া পোস্ট: শোনা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান ডিভাইস ট্র্যাকিং বা সফটওয়্যারের মাধ্যমে কর্মীদের তদারকি করে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ড. ইউসুফ ইফতি: এক বাক্যে বললে এটি নেতিবাচক। গবেষণায় দেখা গেছে, হাই পারফরমেন্স টিমের মূল ভিত্তি হলো ট্রাস্ট বা বিশ্বাস। যখন আপনি কাউকে ডিভাইস দিয়ে ট্র্যাক করবেন, সে তখন চোর-পুলিশ খেলা শুরু করবে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে সাধারণত এই কালচার নেই। আমাদের উচিত ট্র্যাকিং করার পরিবর্তে একটি জবাবদিহিতার কালচার ডেভেলপ করা। যারা ফাঁকি দেয়, তাদের ক্ষেত্রে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা দরকার- কেন সে কাজে অমনযোগী। মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা সমাধান নয়, বরং কেন ব্যথা হচ্ছে তা খুঁজে বের করে চিকিৎসা করা দরকার। ডিভাইস ট্র্যাক করে কারো কাছ থেকে বেস্ট আউটপুট পাওয়া সম্ভব নয়।

এশিয়া পোস্ট: বিক্রয় কি শুধু পণ্যের গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে?

ড. ইউসুফ ইফতি: পণ্যের গুণগত মান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র বিষয় নয়। কোয়ালিটি ভালো হলে সেটা বাড়তি সুবিধা দেয়। কিন্তু বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হলো বিহেভিয়ার, সার্ভিস এবং বিক্রেতার মানসিকতা। সঠিক মানসিকতা ও এগ্রেসিভনেস থাকলে যে কোনো কিছুই বিক্রি করা সম্ভব।

এশিয়া পোস্ট: B2B (ব্যবসা থেকে ব্যবসা) এবং B2C (ব্যবসা থেকে ভোক্তা) বিক্রয় প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কি কৌশলগত কোনো পার্থক্য রয়েছে?

ড. ইউসুফ ইফতি: বিক্রয়ের মৌলিক বিষয়গুলো ৮০-৮৫ শতাংশ একই থাকে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে ১৫-২০ শতাংশ পরিমার্জন প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে B2B-এর ক্ষেত্রে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লাভ এবং তাদের ভোক্তার সুবিধা—এই উভয় দিকই গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হয়। এই খাতে সফল হতে হলে সূক্ষ্ম চিন্তন দক্ষতা এবং বিশ্লেষণধর্মী হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আপনাকে পণ্য, প্রতিযোগী এবং সেবা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। এ ছাড়া কার্যকর উপস্থাপন দক্ষতা এবং চাহিদার ব্যবধান মেটানো পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্রেতার সমস্যার যথাযথ সমাধান দেওয়ার মাধ্যমেই চুক্তি সম্পন্ন করতে হয়।

এশিয়া পোস্ট: বিক্রয়ের সাফল্যে কি পণ্যের গুণমান সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে, নাকি ক্রেতার সঙ্গে গড়ে ওঠা সুসম্পর্ক ও আস্থাও জরুরি?

ড. ইউসুফ ইফতি: বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের মান ও সুসম্পর্ক-উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, মানুষের আস্থাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ফার্মাসিউটিক্যালসের উদাহরণটি দিয়ে বলি, বাজারে একই মানের অনেক কোম্পানির ওষুধ থাকতে পারে, কিন্তু একজন চিকিৎসক সাধারণত সেই বিক্রয় প্রতিনিধির ওষুধই বেশি লিখে থাকেন যার সঙ্গে তার পেশাদারত্বের বাইরেও একটি গভীর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ও বিশ্বস্ততা তৈরি হয়েছে। কারণ, সমান মানের পণ্যের ভিড়ে ক্রেতা শেষ পর্যন্ত সেই কোম্পানির পণ্যই বেছে নেন যেটা তিনি পছন্দ এবং ভরসা করেন।

এশিয়া পোস্ট: ডাক্তারদের উপহার দিয়ে কোম্পানির প্রমোশন করা কি ইতিবাচক প্র্যাকটিস?

ড. ইউসুফ ইফতি: আদর্শগতভাবে এটি সঠিক নয়। উন্নত বিশ্বে কোম্পানিগুলো ডাক্তারদের উচ্চতর পড়াশোনা বা সাইন্টিফিক সিম্পোজিয়ামে স্পনসর করে, যা নৈতিক। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক অনৈতিক প্র্যাকটিস চলে আসছে। এটি বন্ধ করতে হলে ড্রাগ কন্ট্রোল অথরিটিকে (DGDA) যথাযথ আইন ও মনিটরিং ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কোম্পানি, ডাক্তার এবং সাধারণ মানুষ সবাই উপকৃত হবে।

এশিয়া পোস্ট: অনেক সময় একটা কোম্পানির দক্ষ কর্মীকে অন্য কোম্পানি বেশি বেতনে নিতে চায়। সেক্ষেত্রে বর্তমান কোম্পানি ওই কর্মীকে ধরে রাখার উপায় কী?

ড. ইউসুফ ইফতি: আমার পিএইচডি গবেষণায় দেখেছি অনেকেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাজে ব্যবহারের কারণে চাকরি ছাড়ে। কর্মীদের প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখার জন্য যথাযথ মূল্যায়ন, স্বচ্ছ পদোন্নতি নীতিমালা এবং ছুটির মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। শুধু স্যালারির জন্য চাকরি ছাড়ার সংখ্যা কম, পরিবেশের কারণেই মানুষ বেশি শিফট করে।

এশিয়া পোস্ট: ‘ট্রেইনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ কী নিয়ে কাজ করছে?

ড. ইউসুফ ইফতি: আমরা ২০২৪ সালে এটি শুরু করি। আমাদের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে কোয়ালিটি সম্পন্ন ট্রেইনার তৈরি করা। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০ এক্রিডেটেড ট্রেইনার তৈরি করতে চাই। এ ছাড়া ট্রেইনারদের ইনকাম জেনারেশন এবং তাদের জন্য একটি কনটেন্ট হাব তৈরি নিয়ে আমরা কাজ করছি।

এশিয়া পোস্ট: মোটিভেশনাল স্পিকার, ট্রেইনার এবং ইনফ্লুয়েন্সারের মধ্যে পার্থক্য কী?

ড. ইউসুফ ইফতি: বর্তমানে অনেকেই ইনফ্লুয়েন্সার নয়, বরং ব্র্যান্ড প্রমোটার। ইনফ্লুয়েন্সার হচ্ছেন তিনি যার প্রভাবে মানুষের জীবনে পজিটিভ পরিবর্তন আসে। ট্রেইনার হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি ভ্যালিডেট কোনো মেথড ফ্যাসিলেটেশনের মাধ্যমে অন্যের মধ্যে ট্রান্সফর্ম করেন। আর মোটিভেশনাল স্পিকার মূলত গল্প বলে মানুষকে সাময়িকভাবে কানেক্ট করেন। একজন ট্রেইনার মোটিভেশনাল স্পিকার হতে পারেন, কিন্তু একজন মোটিভেশনাল স্পিকার সরাসরি ট্রেইনার নাও হতে পারেন।

এশিয়া পোস্ট: আপনি এআই ইন্টিগ্রেটেড সেলস ও লিডারশিপ ট্রেনিং নিয়ে কাজ করছেন। এটি কীভাবে কাজ করে?

ড. ইউসুফ ইফতি: আমি ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। বর্তমানে আমি বিক্রয় নেতাদের শেখাই কীভাবে চ্যাটজিপিটি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করে তাদের কাজগুলোকে আরও বিশেষায়িত এবং সহজ করা যায়। যেমন, একেকজন মানুষের ব্যক্তিত্ব একেক রকম হয় (যাকে ডিআইএসসি বা DISC পদ্ধতি বলা হয়)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আমরা এখন খুব দ্রুত বুঝতে পারি কোন ধরনের ক্রেতার সঙ্গে ঠিক কীভাবে কথা বললে বিক্রয় সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এ ছাড়া, বিশাল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একদম সুনির্দিষ্ট ফলাফল বের করা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই সম্ভব, যা আগে অনেক সময়সাপেক্ষ ছিল।

এশিয়া পোস্ট: এআই কি সত্যিই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে?

ড. ইউসুফ ইফতি: এআই সরাসরি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে না। বরং যারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখবে না, তারাই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং একসময় কর্মসংস্থান হারাবে। একজন সেলস লিডারের জন্য অন্তত লেভেল ৪ পর্যন্ত এআই দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। এই দক্ষতা থাকলে তথ্য বিশ্লেষণ, জটিল ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি কিংবা প্রতিদিনের দাপ্তরিক কাজের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অনেক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে করা সম্ভব। সহজ কথায়, এআই আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং কাজের গতি ও মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে বর্তমানে অনলাইন কোর্সের নামে অনেক স্ক্যাম হচ্ছে বলে শোনা যায়। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

ড. ইউসুফ ইফতি: এই বিষয়গুলো তদারকির মূল দায়িত্ব জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (NSDA)। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণিত বা সুনির্দিষ্ট তদারকি পদ্ধতি না থাকায় এই ধরনের প্রতারণা সহজে শনাক্ত করা বা ধরা সম্ভব হয় না। ভবিষ্যতে ট্রেইনারস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা একটি বিশেষ শাখা বা বিভাগ চালুর কথা ভাবছি, যেখানে ভুক্তভোগীরা সরাসরি তাদের অভিযোগ জানাতে পারবেন। আমরা সেই অভিযোগগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব, যাতে শিক্ষার নামে এই ধরনের প্রতারণা বন্ধ হয়।

এশিয়া পোস্ট: নতুন প্রজন্মের যারা সেলসে আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ড. ইউসুফ ইফতি: পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনোভাবে সেলস পারসন। নতুনদের জন্য প্রথম পরামর্শ হলো কমিউনিকেশন স্কিল আয়ত্ত করা। ইউটিউব থেকে প্রেজেন্টেশন, লিসেনিং এবং পাবলিক স্পিকিং শিখতে হবে। পাশাপাশি ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স, টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং নেগোসিয়েশন স্কিলসেও দক্ষ হতে হবে। ধৈর্য ও কনসিস্টেন্সি বজায় রাখতে হবে। আগামী দিনে অলরাউন্ডারের চেয়ে স্পেশালিস্ট বা সুপার স্পেশালিস্টদের মূল্য অনেক বেশি হবে। তাই যে কোনো একটি বিষয়ে মাস্টার হতে হবে।